ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫
বিজ্ঞপ্তি :
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’য় প্রাতিষ্ঠানিক কাজের জন্য কিছু কর্মী প্রয়োজন। বিস্তারিত জানতে আমাদের ফেসবুক পেইজ ভিজিট করুন, ধন্যবাদ।
কার্যকর আইন গঠন-প্রণয়ণ ও তদারকি না থাকায় বাড়ছে অনলাইন ও ইউটিউবভিত্তিক সাংবাদিকতা

এক সময়ের চালেঞ্জিং পেশা কি আজ হুমকির মুখে?

শেখ রিফান আহমেদ
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:০১:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
  • / ৩৮৩ বার পঠিত

⇒ শিক্ষার ঘাটতি ও আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে সাংবাদিকতায় বাড়ছে কপি করার প্রবণতা

সাংবাদিকতা, এক মহান পেশা, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে দাঁড়ায়, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পৌঁছে দেয়। এই পেশাটি গণতন্ত্রের অন্যতম একটি প্রধান ভিত্তি, যা সরকার, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। এই পেশাটি আবার চ্যালেঞ্জিং-ও বটে, কারণ এটি সত্য ও তথ্যের পাহারাদার, এটি বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, এটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে, এটি সমাজকে সচেতন, সংবেদনশীল ও সক্রিয় করে তোলে। একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিক শুধু খবরই লেখেন না, তিনি সমাজ বদলের অনুপ্রেরণাও হয়ে ওঠেন। যার কারণে অপরাধীদের কাছে সাংবাদিকতা এক বিষময় কাটার অপর নাম। এক সময় সন্তানকে এই পেশায় যোগ দিতেও পিতা মাতার থাকতো নানা বাধা। তবে সাংবাদিকতা একটি পেশা হলেও আমার মতে এটি একটি মারাত্মক নেশা। কারণ আমার দেখা চোখে যারা এই নেশায় একবার বুদ হয়ে যায়, কখনোই আর এই পেশা থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারে না।
অতীতের সেই সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে, নেই সেই সুখ্যাতি-জৌলুস। আর এর জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই বলে আমার ব্যক্তিগত মত। কারণ সাংবাদিক তৈরির কারিগর, সম্পাদক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোই আজ সাংবাদিকতাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে বলে আমি মনে করি। চারিদিকে এখন সাংবাদিকের ছড়াছড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ভাইরাল হওয়ায় সাংবাদিকদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা আজ নিজেকেও খুব পীড়া দেয়। মূলত কার্যকর আইন গঠন না হওয়ায় ও প্রণীত আইন সঠিকভাবে প্রণয়ন না করা এবং প্রয়োজনীয় তদারকি না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো চারিদিকে গড়ে উঠছে অনলাইন ও ইউটিউবভিত্তিক গণমাধ্যম, যারা শিক্ষাগত মান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচয়পত্র দেওয়ার নামে চালাচ্ছে কার্ড বাণিজ্য, জন্ম দিচ্ছে সাংবাদিকের নামে সাংঘাতিক। এরাই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে কানাচে, করছে চাঁদাবাজি, ঘুষ বাণিজ্য, কলংকিত করছে মহান এই পেশাকে।
এদিকে, বর্তমান সময়ে খবর মানেই শুধু তথ্য নয়, তা হয়ে উঠেছে সময়ের দাবিতে দ্রুত, নির্ভুল ও আকর্ষণীয় প্রকাশের লড়াই। পাশাপাশি প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আর এই যুদ্ধে সাংবাদিকদের হাতে এসেছে প্রযুক্তির এক নতুন সহায়ক, যার নাম চ্যাটজিপিটি। প্রযুক্তির দুর্দান্ত উপহার এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-র কল্যাণে আজ অনেক কিছুই খুব সহজে আমাদের হাতে ধরা দিয়েছে। এখন আর দীর্ঘসময় কম্পিউটারে বসে মেধা খাটিয়ে শ্রম দিয়ে কোন ছবির কাজ করা লাগে না, লাগে না কোন বিষয় নিয়ে ভেবে চিন্তে ঐ বিষয়ের ওপর বিস্তারিত লেখা। খুব সহজেই ভিডিও বানিয়ে ফেলা হচ্ছে মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই। আর সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা নতুন-রা-তো এই সুযোগটির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে। অন্য সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ কপি করে সাংবাদিকতার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। কপি রাইট বা কপি করা সাংবাদিকের ভিড়ে প্রকৃত প্রতিবেদক বা সাংবাদিক হারিয়ে যাচ্ছে। কপি করা সাংবাদিকের প্রচার, প্রচারণা ও গলার স্বর সব সময় উঁচু। এসব কপি সাংবাদিকদের দৌরান্ত্যের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা। সংবাদ কপি করা মানে হল, অন্য কোনো উৎস থেকে প্রকাশিত সংবাদ হুবহু বা সামান্য পরিবর্তন করে নিজের নামে প্রকাশ করা। এটি সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থি এবং এর ফলে সাংবাদিকতার মান ক্ষুণ্ন হয়। সংবাদ কপি করা একটি গুরুতর অপরাধ। সংবাদ কপি করা সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘন করা, সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, যেমন সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থি। কপি করা সংবাদে তথ্যের সঠিকতা বা গভীরতা নাও থাকতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার মান কমিয়ে দেয়। অন্যের লেখা সংবাদ কপি করা হলে পাঠকরা সাংবাদিকদের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারে না। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতায় নিজের বুদ্ধিমত্তা, মেধা খাটিয়ে শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও তার ব্যবহার, পাঠক হারাচ্ছে আগ্রহ, জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে সংবাদপত্র। তাহলে প্রযুক্তির আগ্রাসনে কি প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে?
এদিকে, এক শ্রেণীর সাংবাদিকদের মধ্যে চলছে এখন কপি পোস্ট প্রতিযোগিতা। মূলত সাংবাদিকতার জগতে কপি পোস্ট করা মানে চুরি করা সাংবাদিকতা। একজন দক্ষ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনলাইন পোর্টালে কোন বিশেষ প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সংবাদ আপলোড করলে সেই সংবাদ কপি করে তাদের মিডিয়ায় প্রচার করে নিজেকে দক্ষ সাংবাদিকের পরিচিতি তৈরি করছেন। কপি পেস্ট করা এ সংবাদটি ঘুরছে সব মিডিয়ায়। সাংবাদিকতার মধ্যে এখন চরম ধরনের পাইরেসি চলছে। দেশের হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে রিপোর্ট আপলোড হয়েছে, ব্যাস এখন কপি করে শুধু ডেট লাইন আর হেড লাইন পরিবর্তন করে নিজের নামের ফাইল পাঠাতে পারলেই হলো। ওই রিপোর্টটি পাঠানোর পর তাদের অনলাইনে আপলোড হলেই বিশিষ্ট সাংবাদিক হয়ে গেলেন। তিনি ফেসবুক বা পেজে শেয়ার দিয়ে নিজের নাম নিজে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানাতে থাকেন। সমাজে নিজেকে বড় মানের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা চর্চায় ব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট সম্প্রচার নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন, ভিডিও, ডিজিটাল রেডিও, ইন্টারনেট, ওয়্যারলেস যোগাযোগ পদ্ধতি যেমন, মোবাইল ফোন, ভিডিও, ডিজিটাল ভিডিও, সিডি ডিস্ক, ভি -রম এবং ভিডিও-ভয়েজ মেইল ইত্যাদি। এখন স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরের সাংবাদিকরা তথ্যের আদান প্রদানে এসব নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। মফস্বল সাংবাদিকরা জেলা প্রতিনিধিদের কাছে আবার জেলা প্রতিনিধিরা জাতীয় মাধ্যম-প্রতিষ্ঠানে সংবাদ প্রেরণ করছে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেই। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি আসার আগে একটি সংবাদ জাতীয় পত্রিকা অফিসে প্রেরণ করতে কয়েকদিন লেগে যেত, বর্তমানে সাংবাদিকরা তা মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করছে। তবে তথ্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল যুগে বেকায়দায় পড়েছেন প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকরা। পেশাদার সাংবাদিকদের লেখা প্রকাশিত রিপোর্টটি কপি করে অনলাইন বা পেইজে আপলোড করে নিজের নামে প্রচার করছে। এতে পাঠক, সাধারণ মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পেশাদার সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সচেতন নাগরিকগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী অনলাইনগুলোর প্রতিটি সংবাদকর্মী বা প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়তার বিষয় ও তাদের বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে থাকেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডেইলি রিপোর্ট তৈরি করে তা পত্রিকা অফিসে পাঠাতে হয়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ফিচার, কলাম ও প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। সংবাদের ক্ষেত্রে উৎস ও তথ্যদাতার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। কিন্তু এখানে ওই সকল সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক বিষয়টি তুচ্ছ মনে করে একই রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন তাদের অনলাইন পোর্টালে বা পত্রিকায়। এবিষয় কপি করা সাংবাদিকরা কোন নিতি নৈতিকতা মানছে না। এসব অনলাইনে যারা কাজ করেন তারা আবার ফেসবুকেও রিপোর্টটি পোস্ট করতে অভ্যস্ত। অনলাইনের পাঠক ও ফেসবুকের বন্ধুরাও ওই রিপোর্টটি পড়ে বুঝে নিতে বাধ্য হন যে, সাংবাদিক কত ভালো না রিপোর্ট করেছেন। আবার আপলোড হওয়া রিপোর্টটি দেখার জন্য অন্য সংবাদকর্মীদের ফোন করে আনন্দের সঙ্গে জানান, আজকে আমার অনলাইন দেখেন আমার পাঠানো রিপোর্টটি প্রথম পাতায় আপলোড করেছে। ওই সকল সংবাদকর্মীরা কি ভেবে দেখেছেন, যিনি প্রথম রিপোর্টটি তৈরি করেছেন তার কেমন সময় লেগেছে, একটি লাইন লিখতে কতবার ভুল হয়েছিলো, কতবার তাকে লাইনের শব্দ পরিবর্তন বা সংযোজন করতে হয়েছে। আর কতবার সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত ও বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোবাইলে কল করতে হয়েছে। সংবাদ তৈরির পেছনে ঘটনার কেহ খোঁজ রাখে না। এছাড়া অনেক সময় একটি ঘটে যাওয়া ঘটনার রিপোর্ট তৈরিতে তথ্য পাওয়া কষ্টকর হয়, স্থানীয় বা সংশ্লিষ্টদের কাছে ফোন করেও তেমন কোনো তথ্য বা বিষয়টির পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। এরকম রিপোর্ট তৈরি করতে পরিবর্তন ও সংযোজন করা লাগে।
বর্তমান সময়ে দেখা ও পরিচিত অনেক সংবাদকর্মী আছেন, যারা শুধু নাম মাত্র প্রিন্ট মিডিয়া বা অনলাইনের প্রতিনিধি হয়েছেন। তাদের অনেকেই সারাদিন ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি বা নিজ ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিকেলে জেলা বা উপজেলার প্রকৃত সংবাদকর্মী আছে তাদের কাছে ফোন দিয়ে তার পত্রিকায় নিউজ পাঠাতে বলেন। এধরণের কপি করা সাংবাদিকদের নিউজ পাঠাতে কোনো চিন্তা ও সমস্যা নেই। কারণ তারা জানে অনলাইন নিউজ পেপারে নিউজ আপলোড হবে। তাহলে আর চিন্তা কি! ওখানে নিউজ আপলোড হলেই কপি করে তার অনলাইনে পাঠালেই তার কাজ শেষ। তিনি মস্ত বড় সাংবাদিক বনে গেলেন। আবার জেলা ও উপজেলার বেশ কিছু সংবাদকর্মী রয়েছেন যারা মাসিক ভাড়ায় নিউজ লেখা ও পত্রিকায় পাঠানোর জন্য কম্পিউটারের দোকানদার বা লোক নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। আবার অনেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপ খুলে বসে আছেন, কে কখন কোন অনলাইন পোর্টালে নিউজ করল, মেইল চেয়ে নিলেন না হয় অনলাইন থেকে কপি করলেন। আর এসব কপি সাংবাদিকরা নিজ মিডিয়া বা বিভিন্ন সংগঠন থেকে সেরা সাংবাদিকতায় ক্রেস্ট বা পুরস্কার গ্রহণ করছেন বুক চেতিয়ে।
তবে, সকল সাংবাদিক ভালো নিউজ লিখতে পারবে এমনটা ভাবা ঠিক না। তবে যারা নিউজ তৈরিতে দুর্বলতার লেখার চেষ্টা তো করবে। কিন্তু না, কপি করা সাংবাদিকরা সংবাদ লেখায় তাদের কোনো মনোযোগ নেই। এছাড়া অনেক সংবাদকর্মী আছেন যারা একটি লাইন রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন না। তাদের গল্প আর হাবভাব দেখলে মনে হয় তিনি না জানি কত বড় সাংবাদিক। সকালে উঠে হকারের কাছে ২-৩টা পত্রিকা নিয়ে প্যান্টের পকেটে গুঁজে বা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, এনজিও পাড়ায়। সারাদিন এসব অফিস চষে বেড়িয়ে যার কাছে যা পান হাতিয়ে নিয়ে দিন শেষে বাড়ি ফেরেন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির আবিষ্কার চ্যাটজিপিটি কখনোই একজন সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। বরং এটি হচ্ছে সাংবাদিকের ডিজিটাল সহকর্মী- যে থামে না, ঘুমায় না, বিরক্ত হয় না। আপনি চাইলেই এটি থেকে পেতে পারেন, (ক) প্রতিবেদন লেখার খসড়া, (খ) জটিল বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, (গ) বানান ও ভাষা সংশোধন, (ঘ) আইডিয়া বা শিরোনাম নিয়ে পরামর্শ। এমনকি এক ক্লিকেই পেয়ে যেতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য পোস্টের খসড়াও! অনেক সময় বড় কোনো রিপোর্ট বা নথি পড়ার সময় থাকে না, তখন চ্যাটজিপিটি পারে সেটাকে সারমর্মে পরিণত করে দিতে। তবে খেয়াল রাখবেন, এটি সবসময় শতভাগ নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয় না। তাই সাংবাদিককে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে প্রতিটি তথ্য। কারণ মনে রাখতে হবে, চ্যাটজিপিটি আমাদের সহায়ক, কিন্তু সত্যের পথপ্রদর্শক আমরা সাংবাদিকরা নিজেই। একটা রিপোর্ট লিখতে বসে হঠাৎ মাথায় কিছুই আসছে না, এটা খুব সাধারণ। তখন চ্যাটজিপিটি হতে পারে আপনার “ক্রিয়েটিভ স্পার্ক”। চাইলে আপনি তাকে বলতে পারেন, “একটা প্রবন্ধের ভূমিকা লেখো” অথবা, “তিন লাইনে উপসংহার দাও” অথবা, “এই হেডলাইনটা একটু ঘষেমেজে দাও”। এই সহযোগিতা অনেক সময় আপনাকে সময় বাঁচিয়ে দেয়, মানোন্নয়নও করে। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আসলে চ্যাটজিপিটি জানে অনেক কিছু, কিন্তু বুঝে না কিছুই। অর্থাৎ কোন শব্দ কার অনুভূতিকে আঘাত করতে পারে, কোন তথ্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। তাই একজন সাংবাদিককেই হতে হয় বিবেচক, নীতিবান, এবং মানবিক। সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ যন্ত্রের হাতে নয়, বরং যন্ত্রের সাথে হাতে হাত রেখে চলাতেই। একজন সাংবাদিকের কলমে থাকে বিবেক, অনুভব আর বাস্তব অভিজ্ঞতা। চ্যাটজিপিটির আছে গতিশীলতা, তথ্য বিশ্লেষণ আর লেখা সাজানোর ক্ষমতা।
সর্বশেষ, আমার মতে, সাংবাদিকতা কোনো টাইপিং খেলা নয়। এটা সাহসের, সততার, ও সময়ের পরীক্ষার মাঠ। প্রযুক্তি বা চ্যাটজিপিটি হতে পারে আমাদের সহযোদ্ধা। তবে আমি, আপনি ও সকল সাংবাদিকেরাই হচ্ছেন গল্পের আসল নায়ক। তাই কলম ধরুন, প্রযুক্তিকে সঙ্গী করুন, আর সমাজকে দিন সত্যের সেরা প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তিকে সাংবাদিকতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং পেশাগত কাজে প্রযুক্তির সহায়তা নেই, তাহলেই টিকে থাকবে সাংবাদিকতা। আসুন, আমরা কায়মনে প্রার্থনা করি, সাংবাদিকতা হউক ‘সংবাদ + সাংবাদিক + প্রযুক্তি’। এই তিনের সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে নতুন যুগের সাংবাদিকতা, যেখানে সত্য হবে আরো বেশি দৃঢ়, তথ্য হবে আরো বেশি প্রাঞ্জল।

-লেখক : শেখ রিফান আহমেদ, সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দৈনিক নাগরিক ভাবনা

প্রকাশ ঘোষ বিধান, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

প্রবন্ধ কলাম

কার্যকর আইন গঠন-প্রণয়ণ ও তদারকি না থাকায় বাড়ছে অনলাইন ও ইউটিউবভিত্তিক সাংবাদিকতা

এক সময়ের চালেঞ্জিং পেশা কি আজ হুমকির মুখে?

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:০১:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫

⇒ শিক্ষার ঘাটতি ও আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে সাংবাদিকতায় বাড়ছে কপি করার প্রবণতা

সাংবাদিকতা, এক মহান পেশা, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে দাঁড়ায়, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পৌঁছে দেয়। এই পেশাটি গণতন্ত্রের অন্যতম একটি প্রধান ভিত্তি, যা সরকার, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। এই পেশাটি আবার চ্যালেঞ্জিং-ও বটে, কারণ এটি সত্য ও তথ্যের পাহারাদার, এটি বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, এটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে, এটি সমাজকে সচেতন, সংবেদনশীল ও সক্রিয় করে তোলে। একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিক শুধু খবরই লেখেন না, তিনি সমাজ বদলের অনুপ্রেরণাও হয়ে ওঠেন। যার কারণে অপরাধীদের কাছে সাংবাদিকতা এক বিষময় কাটার অপর নাম। এক সময় সন্তানকে এই পেশায় যোগ দিতেও পিতা মাতার থাকতো নানা বাধা। তবে সাংবাদিকতা একটি পেশা হলেও আমার মতে এটি একটি মারাত্মক নেশা। কারণ আমার দেখা চোখে যারা এই নেশায় একবার বুদ হয়ে যায়, কখনোই আর এই পেশা থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারে না।
অতীতের সেই সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে, নেই সেই সুখ্যাতি-জৌলুস। আর এর জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই বলে আমার ব্যক্তিগত মত। কারণ সাংবাদিক তৈরির কারিগর, সম্পাদক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোই আজ সাংবাদিকতাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে বলে আমি মনে করি। চারিদিকে এখন সাংবাদিকের ছড়াছড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ভাইরাল হওয়ায় সাংবাদিকদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা আজ নিজেকেও খুব পীড়া দেয়। মূলত কার্যকর আইন গঠন না হওয়ায় ও প্রণীত আইন সঠিকভাবে প্রণয়ন না করা এবং প্রয়োজনীয় তদারকি না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো চারিদিকে গড়ে উঠছে অনলাইন ও ইউটিউবভিত্তিক গণমাধ্যম, যারা শিক্ষাগত মান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচয়পত্র দেওয়ার নামে চালাচ্ছে কার্ড বাণিজ্য, জন্ম দিচ্ছে সাংবাদিকের নামে সাংঘাতিক। এরাই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে কানাচে, করছে চাঁদাবাজি, ঘুষ বাণিজ্য, কলংকিত করছে মহান এই পেশাকে।
এদিকে, বর্তমান সময়ে খবর মানেই শুধু তথ্য নয়, তা হয়ে উঠেছে সময়ের দাবিতে দ্রুত, নির্ভুল ও আকর্ষণীয় প্রকাশের লড়াই। পাশাপাশি প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আর এই যুদ্ধে সাংবাদিকদের হাতে এসেছে প্রযুক্তির এক নতুন সহায়ক, যার নাম চ্যাটজিপিটি। প্রযুক্তির দুর্দান্ত উপহার এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-র কল্যাণে আজ অনেক কিছুই খুব সহজে আমাদের হাতে ধরা দিয়েছে। এখন আর দীর্ঘসময় কম্পিউটারে বসে মেধা খাটিয়ে শ্রম দিয়ে কোন ছবির কাজ করা লাগে না, লাগে না কোন বিষয় নিয়ে ভেবে চিন্তে ঐ বিষয়ের ওপর বিস্তারিত লেখা। খুব সহজেই ভিডিও বানিয়ে ফেলা হচ্ছে মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই। আর সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা নতুন-রা-তো এই সুযোগটির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে। অন্য সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ কপি করে সাংবাদিকতার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। কপি রাইট বা কপি করা সাংবাদিকের ভিড়ে প্রকৃত প্রতিবেদক বা সাংবাদিক হারিয়ে যাচ্ছে। কপি করা সাংবাদিকের প্রচার, প্রচারণা ও গলার স্বর সব সময় উঁচু। এসব কপি সাংবাদিকদের দৌরান্ত্যের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা। সংবাদ কপি করা মানে হল, অন্য কোনো উৎস থেকে প্রকাশিত সংবাদ হুবহু বা সামান্য পরিবর্তন করে নিজের নামে প্রকাশ করা। এটি সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থি এবং এর ফলে সাংবাদিকতার মান ক্ষুণ্ন হয়। সংবাদ কপি করা একটি গুরুতর অপরাধ। সংবাদ কপি করা সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘন করা, সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, যেমন সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থি। কপি করা সংবাদে তথ্যের সঠিকতা বা গভীরতা নাও থাকতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার মান কমিয়ে দেয়। অন্যের লেখা সংবাদ কপি করা হলে পাঠকরা সাংবাদিকদের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারে না। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতায় নিজের বুদ্ধিমত্তা, মেধা খাটিয়ে শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও তার ব্যবহার, পাঠক হারাচ্ছে আগ্রহ, জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে সংবাদপত্র। তাহলে প্রযুক্তির আগ্রাসনে কি প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে?
এদিকে, এক শ্রেণীর সাংবাদিকদের মধ্যে চলছে এখন কপি পোস্ট প্রতিযোগিতা। মূলত সাংবাদিকতার জগতে কপি পোস্ট করা মানে চুরি করা সাংবাদিকতা। একজন দক্ষ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনলাইন পোর্টালে কোন বিশেষ প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সংবাদ আপলোড করলে সেই সংবাদ কপি করে তাদের মিডিয়ায় প্রচার করে নিজেকে দক্ষ সাংবাদিকের পরিচিতি তৈরি করছেন। কপি পেস্ট করা এ সংবাদটি ঘুরছে সব মিডিয়ায়। সাংবাদিকতার মধ্যে এখন চরম ধরনের পাইরেসি চলছে। দেশের হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে রিপোর্ট আপলোড হয়েছে, ব্যাস এখন কপি করে শুধু ডেট লাইন আর হেড লাইন পরিবর্তন করে নিজের নামের ফাইল পাঠাতে পারলেই হলো। ওই রিপোর্টটি পাঠানোর পর তাদের অনলাইনে আপলোড হলেই বিশিষ্ট সাংবাদিক হয়ে গেলেন। তিনি ফেসবুক বা পেজে শেয়ার দিয়ে নিজের নাম নিজে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানাতে থাকেন। সমাজে নিজেকে বড় মানের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা চর্চায় ব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট সম্প্রচার নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন, ভিডিও, ডিজিটাল রেডিও, ইন্টারনেট, ওয়্যারলেস যোগাযোগ পদ্ধতি যেমন, মোবাইল ফোন, ভিডিও, ডিজিটাল ভিডিও, সিডি ডিস্ক, ভি -রম এবং ভিডিও-ভয়েজ মেইল ইত্যাদি। এখন স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরের সাংবাদিকরা তথ্যের আদান প্রদানে এসব নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। মফস্বল সাংবাদিকরা জেলা প্রতিনিধিদের কাছে আবার জেলা প্রতিনিধিরা জাতীয় মাধ্যম-প্রতিষ্ঠানে সংবাদ প্রেরণ করছে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেই। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি আসার আগে একটি সংবাদ জাতীয় পত্রিকা অফিসে প্রেরণ করতে কয়েকদিন লেগে যেত, বর্তমানে সাংবাদিকরা তা মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করছে। তবে তথ্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল যুগে বেকায়দায় পড়েছেন প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকরা। পেশাদার সাংবাদিকদের লেখা প্রকাশিত রিপোর্টটি কপি করে অনলাইন বা পেইজে আপলোড করে নিজের নামে প্রচার করছে। এতে পাঠক, সাধারণ মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পেশাদার সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সচেতন নাগরিকগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী অনলাইনগুলোর প্রতিটি সংবাদকর্মী বা প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়তার বিষয় ও তাদের বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে থাকেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডেইলি রিপোর্ট তৈরি করে তা পত্রিকা অফিসে পাঠাতে হয়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ফিচার, কলাম ও প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। সংবাদের ক্ষেত্রে উৎস ও তথ্যদাতার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। কিন্তু এখানে ওই সকল সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক বিষয়টি তুচ্ছ মনে করে একই রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন তাদের অনলাইন পোর্টালে বা পত্রিকায়। এবিষয় কপি করা সাংবাদিকরা কোন নিতি নৈতিকতা মানছে না। এসব অনলাইনে যারা কাজ করেন তারা আবার ফেসবুকেও রিপোর্টটি পোস্ট করতে অভ্যস্ত। অনলাইনের পাঠক ও ফেসবুকের বন্ধুরাও ওই রিপোর্টটি পড়ে বুঝে নিতে বাধ্য হন যে, সাংবাদিক কত ভালো না রিপোর্ট করেছেন। আবার আপলোড হওয়া রিপোর্টটি দেখার জন্য অন্য সংবাদকর্মীদের ফোন করে আনন্দের সঙ্গে জানান, আজকে আমার অনলাইন দেখেন আমার পাঠানো রিপোর্টটি প্রথম পাতায় আপলোড করেছে। ওই সকল সংবাদকর্মীরা কি ভেবে দেখেছেন, যিনি প্রথম রিপোর্টটি তৈরি করেছেন তার কেমন সময় লেগেছে, একটি লাইন লিখতে কতবার ভুল হয়েছিলো, কতবার তাকে লাইনের শব্দ পরিবর্তন বা সংযোজন করতে হয়েছে। আর কতবার সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত ও বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোবাইলে কল করতে হয়েছে। সংবাদ তৈরির পেছনে ঘটনার কেহ খোঁজ রাখে না। এছাড়া অনেক সময় একটি ঘটে যাওয়া ঘটনার রিপোর্ট তৈরিতে তথ্য পাওয়া কষ্টকর হয়, স্থানীয় বা সংশ্লিষ্টদের কাছে ফোন করেও তেমন কোনো তথ্য বা বিষয়টির পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। এরকম রিপোর্ট তৈরি করতে পরিবর্তন ও সংযোজন করা লাগে।
বর্তমান সময়ে দেখা ও পরিচিত অনেক সংবাদকর্মী আছেন, যারা শুধু নাম মাত্র প্রিন্ট মিডিয়া বা অনলাইনের প্রতিনিধি হয়েছেন। তাদের অনেকেই সারাদিন ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি বা নিজ ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিকেলে জেলা বা উপজেলার প্রকৃত সংবাদকর্মী আছে তাদের কাছে ফোন দিয়ে তার পত্রিকায় নিউজ পাঠাতে বলেন। এধরণের কপি করা সাংবাদিকদের নিউজ পাঠাতে কোনো চিন্তা ও সমস্যা নেই। কারণ তারা জানে অনলাইন নিউজ পেপারে নিউজ আপলোড হবে। তাহলে আর চিন্তা কি! ওখানে নিউজ আপলোড হলেই কপি করে তার অনলাইনে পাঠালেই তার কাজ শেষ। তিনি মস্ত বড় সাংবাদিক বনে গেলেন। আবার জেলা ও উপজেলার বেশ কিছু সংবাদকর্মী রয়েছেন যারা মাসিক ভাড়ায় নিউজ লেখা ও পত্রিকায় পাঠানোর জন্য কম্পিউটারের দোকানদার বা লোক নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। আবার অনেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপ খুলে বসে আছেন, কে কখন কোন অনলাইন পোর্টালে নিউজ করল, মেইল চেয়ে নিলেন না হয় অনলাইন থেকে কপি করলেন। আর এসব কপি সাংবাদিকরা নিজ মিডিয়া বা বিভিন্ন সংগঠন থেকে সেরা সাংবাদিকতায় ক্রেস্ট বা পুরস্কার গ্রহণ করছেন বুক চেতিয়ে।
তবে, সকল সাংবাদিক ভালো নিউজ লিখতে পারবে এমনটা ভাবা ঠিক না। তবে যারা নিউজ তৈরিতে দুর্বলতার লেখার চেষ্টা তো করবে। কিন্তু না, কপি করা সাংবাদিকরা সংবাদ লেখায় তাদের কোনো মনোযোগ নেই। এছাড়া অনেক সংবাদকর্মী আছেন যারা একটি লাইন রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন না। তাদের গল্প আর হাবভাব দেখলে মনে হয় তিনি না জানি কত বড় সাংবাদিক। সকালে উঠে হকারের কাছে ২-৩টা পত্রিকা নিয়ে প্যান্টের পকেটে গুঁজে বা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, এনজিও পাড়ায়। সারাদিন এসব অফিস চষে বেড়িয়ে যার কাছে যা পান হাতিয়ে নিয়ে দিন শেষে বাড়ি ফেরেন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির আবিষ্কার চ্যাটজিপিটি কখনোই একজন সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। বরং এটি হচ্ছে সাংবাদিকের ডিজিটাল সহকর্মী- যে থামে না, ঘুমায় না, বিরক্ত হয় না। আপনি চাইলেই এটি থেকে পেতে পারেন, (ক) প্রতিবেদন লেখার খসড়া, (খ) জটিল বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, (গ) বানান ও ভাষা সংশোধন, (ঘ) আইডিয়া বা শিরোনাম নিয়ে পরামর্শ। এমনকি এক ক্লিকেই পেয়ে যেতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য পোস্টের খসড়াও! অনেক সময় বড় কোনো রিপোর্ট বা নথি পড়ার সময় থাকে না, তখন চ্যাটজিপিটি পারে সেটাকে সারমর্মে পরিণত করে দিতে। তবে খেয়াল রাখবেন, এটি সবসময় শতভাগ নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয় না। তাই সাংবাদিককে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে প্রতিটি তথ্য। কারণ মনে রাখতে হবে, চ্যাটজিপিটি আমাদের সহায়ক, কিন্তু সত্যের পথপ্রদর্শক আমরা সাংবাদিকরা নিজেই। একটা রিপোর্ট লিখতে বসে হঠাৎ মাথায় কিছুই আসছে না, এটা খুব সাধারণ। তখন চ্যাটজিপিটি হতে পারে আপনার “ক্রিয়েটিভ স্পার্ক”। চাইলে আপনি তাকে বলতে পারেন, “একটা প্রবন্ধের ভূমিকা লেখো” অথবা, “তিন লাইনে উপসংহার দাও” অথবা, “এই হেডলাইনটা একটু ঘষেমেজে দাও”। এই সহযোগিতা অনেক সময় আপনাকে সময় বাঁচিয়ে দেয়, মানোন্নয়নও করে। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আসলে চ্যাটজিপিটি জানে অনেক কিছু, কিন্তু বুঝে না কিছুই। অর্থাৎ কোন শব্দ কার অনুভূতিকে আঘাত করতে পারে, কোন তথ্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। তাই একজন সাংবাদিককেই হতে হয় বিবেচক, নীতিবান, এবং মানবিক। সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ যন্ত্রের হাতে নয়, বরং যন্ত্রের সাথে হাতে হাত রেখে চলাতেই। একজন সাংবাদিকের কলমে থাকে বিবেক, অনুভব আর বাস্তব অভিজ্ঞতা। চ্যাটজিপিটির আছে গতিশীলতা, তথ্য বিশ্লেষণ আর লেখা সাজানোর ক্ষমতা।
সর্বশেষ, আমার মতে, সাংবাদিকতা কোনো টাইপিং খেলা নয়। এটা সাহসের, সততার, ও সময়ের পরীক্ষার মাঠ। প্রযুক্তি বা চ্যাটজিপিটি হতে পারে আমাদের সহযোদ্ধা। তবে আমি, আপনি ও সকল সাংবাদিকেরাই হচ্ছেন গল্পের আসল নায়ক। তাই কলম ধরুন, প্রযুক্তিকে সঙ্গী করুন, আর সমাজকে দিন সত্যের সেরা প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তিকে সাংবাদিকতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং পেশাগত কাজে প্রযুক্তির সহায়তা নেই, তাহলেই টিকে থাকবে সাংবাদিকতা। আসুন, আমরা কায়মনে প্রার্থনা করি, সাংবাদিকতা হউক ‘সংবাদ + সাংবাদিক + প্রযুক্তি’। এই তিনের সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে নতুন যুগের সাংবাদিকতা, যেখানে সত্য হবে আরো বেশি দৃঢ়, তথ্য হবে আরো বেশি প্রাঞ্জল।

-লেখক : শেখ রিফান আহমেদ, সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দৈনিক নাগরিক ভাবনা

প্রকাশ ঘোষ বিধান, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট