ভোটের সময় মানুষ দরকার, পরে শুধু সংখ্যা

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:০১:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এখন এক পুনরাবৃত্ত নাটকের মতো—চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাহিনি থেকে যায় একই। প্রতিবার নির্বাচন এলেই রাজপথে কর্মব্যস্ততা, প্রতিশ্রুতির বন্যা, পোস্টারে মুখভরা হাসি—সব মিলিয়ে যেন এক উৎসব। কিন্তু ভোটের দিন পেরিয়ে গেলে সেই উৎসবের আলো নিভে যায়, মানুষ ফিরে যায় বাস্তবতার আঁধারে। রাজনীতি তখন জনগণের কাছ থেকে সরে গিয়ে আবার ফিরে যায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রশ্ন একটাই—জনবান্ধব রাজনীতি কবে হবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল সুর? জনবান্ধব রাজনীতি মানে কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে নাগরিকের বাস্তব প্রয়োজন। যেখানে রাজনীতি হবে মানবকল্যাণের রূপরেখা, কৌশলের চাল নয়। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতি এখন একরকম ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়েছে। দলগুলো যেন একেকটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো, যার মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় টিকে থাকা, জনগণের সেবা নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে—“প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ।” কিন্তু বাস্তবে সেই জনগণ আজ যেন শুধু ভোটের দিনের নাগরিক। ভোট দিতে পারে, কিন্তু ভোটের পরে তার মতামত, তার ক্ষোভ, তার চাওয়া—সবকিছুই হারিয়ে যায় রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার প্রাচীরে। আজকের রাজনীতিতে জনগণ দর্শক, রাজনীতিকরা অভিনেতা; আর রাষ্ট্রের মঞ্চে চলছে এক নিরন্তর ক্ষমতার নাটক। দলীয় রাজনীতির ভেতর যে গণতন্ত্র থাকা উচিত, তা এখন প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। দলীয় সিদ্ধান্ত হয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের টেবিলে, মাঠের কর্মী বা সাধারণ সদস্যের মতামতের তেমন মূল্য থাকে না। প্রার্থী নির্বাচনে যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ক, কর্মদক্ষতার চেয়ে আনুগত্যই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় বলা হতো, রাজনীতি হচ্ছে জনগণের সেবার পবিত্র দায়িত্ব; এখন তা হয়ে গেছে স্বার্থরক্ষার নিরাপদ আশ্রয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্মবস্তু হলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব। সংসদ এমন একটি স্থান, যেখানে জনগণের কথা বলা হয়, জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়, এবং জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সংসদ এখন অনেক সময়ই ‘আনুষ্ঠানিকতা’ রক্ষার জায়গা মাত্র। বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় দলীয় ঘরে, সংসদ কেবল তা অনুমোদন করে। বিরোধীদলগুলোও অনেক সময় জনস্বার্থের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে পড়ে একমুখী, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার, যা গণতন্ত্রের মূল শেকড় বলে বিবেচিত, তার অবস্থাও দুর্বল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়েছে, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা চলে গেছে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। এতে জনগণ থেকে রাষ্ট্র আরও দূরে সরে যাচ্ছে। আর এই দূরত্বই জনবান্ধব রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাধা। প্রতিবার নির্বাচন আসলে রাজনৈতিক দলগুলো যেন হঠাৎ করেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রচারণার সময় মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়া হয়, হাসিমুখে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—চাকরি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব কিছুর। কিন্তু ভোটের দিন পেরিয়ে গেলে সেই জনগণই হয়ে পড়ে অবহেলিত। তখন ক্ষমতাসীনরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশলে, বিরোধীরা ব্যস্ত হয় আন্দোলনের কৌশলে, আর জনগণ পড়ে থাকে অবহেলার বোঝা বইয়ে। এ যেন এক দুষ্টচক্র—ভোটের সময় জনগণ গুরুত্বপূর্ণ, ভোটের পর অপ্রাসঙ্গিক। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ তো এর বিপরীত—জনগণ সারাবছরই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্র তাদেরই জন্য। এই মানসিক পরিবর্তন না এলে জনবান্ধব রাজনীতি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। রাজনীতির এই বিচ্ছিন্নতা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলছে। মানুষ রাজনীতিতে আস্থা হারাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমেই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে দেখছে সন্দেহের চোখে—তারা মনে করে রাজনীতি মানেই দূর্নীতি, ক্ষমতার লড়াই, স্বার্থের হিসাব। অথচ তারাই হতে পারত ভবিষ্যতের পরিবর্তনের শক্তি। এই অবিশ্বাসের প্রাচীর ভাঙতে হলে রাজনীতিকে ফিরে যেতে হবে তার নৈতিক ভিত্তিতে—সেবা, সততা ও অংশগ্রহণের রাজনীতিতে। বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন রাজনীতির নতুন ভাষা—যে ভাষায় প্রতিশ্রুতি নয়, কর্মফল কথা বলে। রাজনীতিকে হতে হবে এমন এক চলমান প্রক্রিয়া, যা ভোটের পরও নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে—অনলাইন পোর্টাল, জরিপ, খোলা সভা, পাবলিক কনসালটেশন—এসব হতে পারে নতুন পথ। নাগরিক সমাজ, সাংবাদিকতা ও একাডেমিয়া রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে জবাবদিহিতা বাড়বে। এছাড়া দলীয় গণতন্ত্র পুনর্গঠন ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। দলগুলোকে বুঝতে হবে, ক্ষমতায় টিকে থাকার চেয়ে আস্থা টিকিয়ে রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ ও দক্ষ নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে, যাতে রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তি আসে। রাজনীতিকে হতে হবে অংশগ্রহণমূলক—যেখানে বিরোধী মত দমন নয়, শ্রদ্ধা পাবে।
রাজনীতি কেবল নীতির বিষয় নয়, এটা মানসিকতারও বিষয়। নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব। জনবান্ধব রাজনীতি মানে হলো মানুষের কথায় কান দেওয়া, তার সমস্যায় পাশে থাকা, তার আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দেওয়া। আমাদের নেতারা কি সেই মানসিকতা ধারণ করতে পেরেছেন? তারা কি জনগণকে অংশীদার মনে করেন, নাকি কেবল ভোটদাতা হিসেবে দেখেন?
আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘সংযোগের অভাব’। নেতা ও জনগণের মাঝে যে সম্পর্ক থাকা উচিত ছিল, তা হারিয়ে গেছে। যখনই জনগণ মনে করে তাদের কথা কেউ শোনে না, তখন তারা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়। এই দূরত্বের ফলেই সমাজে জন্ম নেয় হতাশা, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন।
কিন্তু সবকিছু হারিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে এখনো অসংখ্য তরুণ আছে যারা রাজনীতিকে আবার নতুন করে ভাবতে চায়। তাদের জন্য দরকার একটি খোলা দরজা—একটি সিস্টেম, যেখানে যোগ্যতা ও নৈতিকতা পুরস্কৃত হয়, আর আনুগত্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সেই সুযোগ দিতে পারে, তাহলে রাজনীতি আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো মর্যাদা। জনবান্ধব রাজনীতি কোনো আদর্শিক কল্পনা নয়, এটি বাস্তব প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। কারণ রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন জনগণ তার অংশীদার বোধ করে। জনগণকে উপেক্ষা করে কোনো শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না—ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই এখন সময় এসেছে রাজনীতিকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত, রাজনীতি আসলে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার এক শিল্প। কিন্তু যখন সেই শিল্প আত্মরক্ষার অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র ভিতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। আমাদের দরকার সেই শিল্পকে আবার মানবিকতার রঙে রাঙানো—যেখানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই হবে নেতৃত্বের পরিচয়।
জনবান্ধব রাজনীতি গড়ে তোলা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। শুধু প্রয়োজন সৎ ইচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাহসিকতার। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সেই আহ্বান শুনতে পারে, তবে হয়তো একদিন আমরা এমন বাংলাদেশ দেখতে পাব—যেখানে মানুষ কেবল ভোটদাতা নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার।
রাফায়েল আহমেদ শামীম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
rflashamim@gmail.com




























