মানবতার আইসিইউ, সরকারি হাসপাতালে টলি সেবার নামে চাঁদাবাজি

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:১৮:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
- / ৩৮ বার পঠিত

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল ছিল একসময় গরিব মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। যেখানে চিকিৎসা পাওয়া মানে ছিল সরকারের মানবিক স্পর্শ, সমাজের সহমর্মিতা আর রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের বাস্তব রূপ। কিন্তু এখন সেই হাসপাতালের করিডোরে ঘুরে বেড়ায় অন্য এক দৃশ্য—দালাল, কমিশনখোর আর “টলি সেবা” নামে এক অদৃশ্য চাঁদাবাজ চক্র। হাসপাতালের দরজায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই রোগী ও তার স্বজনদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় কিছু মুখ, যারা চিকিৎসার চেয়ে টাকার ঘ্রাণে বেশি সাড়া দেয়। এদের ভাষায়, “টলি লাগবে, স্যার? একটু সেবা দিই?”—এই কথাটিই যেন এখন সরকারি হাসপাতালের নতুন প্রবেশ টিকিট। অথচ এই সেবা জনগণের টাকায় পরিচালিত, যা পুরোপুরি বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই বিনামূল্যের সেবাই এখন পণ্য হয়ে গেছে, আর তার দাম নির্ধারণ করে সেই অসাধু চক্র। এই “টলি সেবা” মূলত রোগী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত একটি মৌলিক সহায়ক ব্যবস্থা। রোগীকে ওয়ার্ডে তোলা, পরীক্ষা কক্ষে নেওয়া কিংবা মৃতদেহ মর্গে নেওয়ার জন্য এই টলি ব্যবহার হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এখন এই টলি চালাতে হলে রোগীর স্বজনদের পকেট থেকে টাকা বের করতে হয়। সরকারি সম্পদ, সরকারি কর্মচারী, কিন্তু কাজ করাতে হলে বেসরকারি ফি দিতে হয়! এটি যেন হাসপাতালের ভেতরে এক প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষের ব্যবস্থা, যার কোনো আইন নেই, কিন্তু প্রয়োগ শতভাগ নিশ্চিত। কেউ দিতে চায় না, কিন্তু সবাই দিতে বাধ্য হয়। টলি সেবা এখন এমনভাবে সংগঠিত যে মনে হয় এটি হাসপাতালের অফিশিয়াল সেবা তালিকার অংশ। রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন লোক ছুটে আসে—তারা রোগীর অবস্থা দেখে সহানুভূতি দেখায়, তারপর বলে, “টলি লাগবে? হাসপাতালের টলি নাই, আমাদেরটা আছে।” এর পরেই শুরু হয় দরদাম—দুইশ, তিনশ, কখনো পাঁচশ টাকা পর্যন্ত। কেউ টাকা না দিলে রোগীকে স্ট্রেচার দেওয়া হয় না, বিলম্ব করানো হয়, অথবা চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। এভাবে অসহায় মানুষদের বাধ্য করা হয় ঘুষ দিতে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই চাঁদাবাজি সবচেয়ে বেশি আঘাত করে গরিব মানুষদের ওপর। তারা যারা প্রতিদিন দিনমজুরির টাকায় বাঁচে, যারা সরকারি হাসপাতালে আসে কারণ বেসরকারি ক্লিনিকে একদিনও চিকিৎসা নেওয়া তাদের সাধ্যের বাইরে। এখন সেই সরকারি হাসপাতালে এসে যদি টলি সেবার নামে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবে? একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে দারিদ্র্য—তার ওপরে এই অনৈতিক লুটপাট। এটি গরিব মানুষের ওপর এক বাড়তি চাপ, এক মানসিক যন্ত্রণা, যা কেবল টাকায় নয়, মর্যাদায়ও আঘাত করে।
প্রশ্ন হলো, কেন এই চাঁদাবাজি চলছে? কারণ, এখানে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। হাসপাতালের কিছু কর্মচারী, দালাল ও বাইরের চক্র মিলে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। প্রশাসন জানে, কিন্তু নীরব থাকে। কেউ কেউ অংশ নেয়, কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে। কোনো রোগী বা স্বজন প্রতিবাদ করলে তার চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, পরীক্ষা আটকে দেওয়া হয়, এমনকি হাসপাতালের ভেতরে অপমানের শিকার হতে হয়। ফলে মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। এই ভয়ই তাদের সবচেয়ে বড় বন্দিশালা। অন্যদিকে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থাও কার্যত অচল। অভিযোগ বক্স আছে, কিন্তু কেউ অভিযোগ করে না। কারণ, মানুষ জানে অভিযোগ করলেও ফল হবে না। কিছুদিন সংবাদে বিষয়টা আসে, তারপর আবার আগের মতো সব চলতে থাকে। কেউ কেউ বলে, “এটা তো বহু দিনের নিয়ম।” কিন্তু এ কেমন নিয়ম, যেখানে মানবতার নামে গরিবের রক্ত শোষণ করা হয়? প্রশাসনিক ব্যর্থতা যেমন এখানে দায়ী, তেমনি সামাজিক নৈতিকতারও পতন ঘটেছে। হাসপাতালের ভেতরে যে ব্যক্তি টলি সেবা দিয়ে ঘুষ নেয়, সে হয়তো জানেই না, সে আসলে কেবল টাকা নিচ্ছে না, বরং একজন অসহায় মানুষের ওপর অন্যায় করছে। তার এই কাজ শুধু বেআইনি নয়, অমানবিকও বটে। যখন কারো মা, বাবা বা সন্তান মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, তখন তাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা মানে মানবতার গায়ে আঘাত করা। সরকার প্রতিনিয়ত বলে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ছে, হাসপাতাল উন্নত হচ্ছে, নতুন যন্ত্রপাতি আসছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই যন্ত্রগুলো চালাবে কে, আর সেগুলো ব্যবহার করবে কীভাবে, যদি হাসপাতালের ভিতরেই দুর্নীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত থাকে? যত উন্নয়নই হোক, যদি একজন গরিব মানুষ চিকিৎসার আগে টলি ভাড়ার নামে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন। একটি রাষ্ট্র তখনই মানবিক, যখন সে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দুর্বল মানুষ শোষণের শিকার হচ্ছে। হাসপাতাল হওয়া উচিত সহানুভূতির স্থান, অথচ এখন তা হয়ে উঠেছে এক প্রকার বাণিজ্য কেন্দ্র। চিকিৎসা সেবা আর মানবসেবার সীমারেখা ঘুচে গেছে, জায়গা নিয়েছে টাকার লেনদেন। এই অবস্থাকে যদি রোধ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। সমস্যাটির মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়—এটি শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। হাসপাতালের তদারকি কমিটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া কাগজে সীমাবদ্ধ। স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশও অনেক সময় বিষয়টি “তেমন বড় কিছু নয়” ভেবে এড়িয়ে যায়। ফলে চক্রটি আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতা পাল্টাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একটি “দালালমুক্ত সেবা জোন” ঘোষণা করতে হবে। হাসপাতালের গেট থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি সেবার ফি তালিকা জনসমক্ষে প্রদর্শন করতে হবে। বড় করে লেখা থাকতে হবে—“টলি, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।” রোগী বা স্বজনদের জন্য ২৪ ঘণ্টার অভিযোগ হটলাইন চালু করতে হবে, যেখানে ফোন বা অনলাইনে অভিযোগ জানানো যাবে। এছাড়া হাসপাতালের টলি ও স্ট্রেচারের ব্যবহারের জন্য রেজিস্টার রাখতে হবে—কখন, কোন রোগীর জন্য, কার তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত হলো, সবকিছু লিখে রাখতে হবে। এতে অনিয়ম কমবে। হাসপাতালে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে প্রশাসনকে নিয়মিত ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো কর্মচারী বা দালাল চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হলে তার চাকরি বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা করতে হবে।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা। মানুষকে জানতে হবে—টলি সেবা, স্ট্রেচার, হুইলচেয়ার কিংবা ওয়ার্ডে তোলার জন্য কোনো ফি নেওয়া আইনত অপরাধ। এটি তাদের অধিকার, কোনো অনুগ্রহ নয়। টলি সেবা জনগণের টাকায় কেনা, তাই জনগণেরই সম্পদ। কেউ টাকা দাবি করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতে হবে, অথবা মিডিয়া ও প্রশাসনে জানাতে হবে। এখানে সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। তাদের নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রশাসন লজ্জিত হয়, বাধ্য হয় ব্যবস্থা নিতে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও নৈতিক দায়িত্ব আছে। তারা যদি চান, এক মুহূর্তেই এই চক্র ভেঙে দিতে পারেন। কিন্তু তাদের অনেকেই নিরব থাকেন, হয়তো সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য। কিন্তু নিরবতা মানে সম্মতি নয়; এই নিরবতাই অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে। গরিব মানুষের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ যদি লাভবান হয়, সেটি সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। একদিন হয়তো আমাদের হাসপাতালগুলো হবে আধুনিক, ভবন হবে আরও উঁচু, যন্ত্রপাতি আরও উন্নত; কিন্তু যদি মানবিকতা না থাকে, তবে সেই হাসপাতাল হবে এক নিঃসঙ্গ শবাগার—যেখানে চিকিৎসা নয়, বিক্রি হবে সহানুভূতি। আমরা ভুলে গেছি, চিকিৎসা সেবা পবিত্র দায়িত্ব। এটি ব্যবসা নয়, মানবতার প্রকাশ। “টলি সেবা” নামের এই চাঁদাবাজি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক অপরাধ। এটি সেই অপরাধ, যা সমাজের বিবেককে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
আজ যখন একজন দরিদ্র কৃষক তার অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে এনে টলি ভাড়ার নামে ঘুষ দেয়, তখন সে শুধু টাকা হারায় না—হারায় রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস। সে ভাবে, “এই রাষ্ট্র কি আমার?” আর যখন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই চাঁদাবাজি দেখে চুপ থাকেন, তখন তিনিও হারান নিজের নৈতিকতা। এভাবে ধীরে ধীরে আমরা সবাই এক অমানবিক সমাজের অংশ হয়ে যাচ্ছি—যেখানে হাসপাতালের দরজায় মৃত্যু ও দুর্নীতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। তবু এখনো সময় আছে। রাষ্ট্র চাইলে পারে এই অন্যায় বন্ধ করতে। প্রশাসন চাইলে পারে হাসপাতালগুলোকে দালালমুক্ত করতে। সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও চিকিৎসকরা একসঙ্গে চাইলে পারে “টলি সেবা” নামের এই লজ্জার অধ্যায় মুছে ফেলতে। শুধু প্রয়োজন আন্তরিকতা, সাহস আর মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা। সরকার যদি সত্যিই “সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা” নীতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত এই চাঁদাবাজি দমন করা। হাসপাতালের প্রতিটি দরজায় লেখা থাকুক—“সেবা বিক্রয়যোগ্য নয়, এটি আপনার অধিকার।”
“টলি সেবা” নামের চাঁদাবাজি এখন কেবল হাসপাতালের সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক সংকটের প্রতীক। যেখানে অসহায় মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে, সেখানে তার কাছ থেকে টাকা আদায় করা মানে মানবতার গায়ে কালিমা লেপন। গরিব মানুষের জন্য এটি এক বাড়তি চাপ, এক নীরব নির্যাতন, যা সমাজের ন্যায়ের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই অনাচার বন্ধ করা মানে কেবল দুর্নীতি দমন নয়, এটি হবে মানবতার পুনর্জাগরণ। সময় এসেছে হাসপাতালগুলোকে সত্যিকার অর্থে “সেবা কেন্দ্র” হিসেবে পুনর্গঠনের। এখনই যদি রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে আগামী প্রজন্ম এক নিষ্ঠুর ইতিহাসের সাক্ষী হবে—যেখানে টলি চালাতে ঘুষ লাগবে, আর মানবতা থাকবে আইসিইউতে।
মোঃ শামীম মিয়া শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ ও কলামিস্ট, আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী ,সাঘাটা, গাইবান্ধা।
Shamimmiabd94@gmail.com




























