ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
সোমবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫
বিজ্ঞপ্তি :
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’য় প্রাতিষ্ঠানিক কাজের জন্য কিছু কর্মী প্রয়োজন। বিস্তারিত জানতে আমাদের ফেসবুক পেইজ ভিজিট করুন, ধন্যবাদ।
‘মোহনা’ সহস্রতম সাহিত্য চর্চার বিজয়উৎসব

জেমস আব্দুর রহিম রানা:
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:৪২:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪ বার পঠিত

খুলনার জনপ্রিয় সাহিত্য ও সমাজসংস্কৃতি সংগঠন ‘মোহনা’ উদযাপন করেছে তাদের যাত্রাপথের এক ঐতিহাসিক সোপান—সহস্রতম সাহিত্য আসর। প্রায় চার দশক ধরে প্রতি শুক্রবার অবিরাম আয়োজনের ধারাবাহিকতায় গড়া এই আসর এখন খুলনার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য নজির। সাহিত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, তরুণদের লেখালেখিতে উৎসাহিত করা এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার যে উদ্দেশ্য নিয়ে মোহনার পথচলা শুরু হয়েছিল, এই সহস্রতম আসর সেই দীর্ঘ অভিযাত্রারই এক গর্বিত অর্জন।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত উৎসবে মিলিত হয় খুলনার সব প্রজন্মের সাহিত্যপ্রেমীরা।
দুপুর থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভিড় করতে থাকেন কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক ও সাহিত্য-আসক্ত মানুষজন। প্রবেশপথে সাজানো বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার এবং কবিদের পঙক্তিমালা যেন আগতদের জানিয়ে দিচ্ছিল—আজ থেকে খুলনার সাহিত্যসভায় যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক ইতিহাস। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীরা অনুভব করেন এক ধরনের আন্তরিকতার আবহ, যেন বহু দিনের পরিচিত এক পরিবার নতুন সৃজনের উৎসবে একত্র হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর হাফিজুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন কবিতা ও সাহিত্য গবেষণায় প্রশংসিত বিদ্বান প্রফেসর মোঃ আব্দুল মান্নান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল আলিম, দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শহীদুল ইসলাম জোয়ার্দার, সোনামুখ সমাজকল্যাণ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এ. এম. কামরুল ইসলাম ও গবেষক-লেখক ড. সন্দীপন মল্লিক। অতিথিবৃন্দ বলেন, মোহনার ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চা খুলনার সাংস্কৃতিক চিত্র বদলে দিয়েছে এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনচর্চায় উজ্জীবিত করেছে।
সহস্রতম আসরের ইতিহাস উপস্থাপন করেন কবি-সাহিত্যিক মুনির হাসান। তিনি জানান, মোহনার শুরুটা ছিল স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতির; অল্প ক’জন সাহিত্যপ্রেমীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি ছোট আসর এখন বৃহৎ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “মোহনার ভিত্তি মানুষের ভালোবাসা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার ওপর। চার দশকে এ সংগঠন বহু কবি, লেখক ও সমাজকর্মীকে জন্ম দিয়েছে।” তার স্মৃতিচারণে উঠে আসে প্রথম আসরগুলোর গল্প, প্রতিকূল সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা এবং টিকে থাকার অবিশ্বাস্য নিষ্ঠা।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাংবাদিক-কবি জেমস আব্দুর রহিম রানা নিজের কবিতা পাঠ করেন। তার কবিতায় উঠে আসে সমাজবোধ, মানবিকতা, সংগ্রাম এবং নতুন ভোরের প্রত্যাশা। আবৃত্তিশিল্পী সাবিত্রী গাইন নিলিমা পরিবেশন করেন স্বরচিত কবিতা; গণসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মুজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে অংশ নেন আসাদুজ্জামান মিথুন, এম এ হান্নান, তানিয়া নাজনীন, গোলাম রসুল, জুয়েল আহমেদ ভুঁইয়া, মিন্টু কুমার নন্দী, অমল কৃষ্ণ হালদার, এফ এম এ রশিদ, ঋষি এস্তেবান (মনির হাসান), মাহমুদা আক্তার, আব্দুল গাফফার ও শিল্পী আমীন শাহসহ আরও অনেকে। কণ্ঠ, সুর ও কবিতার মিশেলে পুরো অডিটোরিয়াম রূপ নেয় এক বহুমাত্রিক শিল্প-উৎসবে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন সরজিৎ সরকার, কাজী আব্দুল মতিন, এ. জি. রানা, সৈয়দ আলী হাকিম, কামরুল ইসলাম মৃধা, পিজিএল ইউনুস আলী, মনিরুজ্জামান মোড়ল, কবি নাসির আহমেদ, মোহনার প্রথম সাধারণ সম্পাদক সেলিম হোসেন সীমান্ত, কবি ও সাংবাদিক ফরহাদ কাদির, কবি অশোক বল, কবি মোহার দেওয়ানা এবং অধ্যাপক আজিজুল ইসলাম টিপু। সবার উপস্থিতিতে নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মের মিলন ঘটায় এক সৃজনমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
সংগঠনের সভাপতি ড. নিরাপদ বসাক তার বক্তব্যে বলেন, “এক হাজার আসর মানে এক হাজার শুক্রবারের অবিচল উপস্থিতি—যা আমাদের কর্মযজ্ঞের দৃঢ়তাকে প্রমাণ করে। মানুষের ভালোবাসা, হৃদয়ের টান এবং সৃষ্টিশীল একটি পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এতদূর আসতে পেরেছি।” তিনি জানান, তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস জাগাতে এবং সাহিত্যচর্চাকে শক্তিশালী করতে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
মোহনার প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওলিউর রহমান বলেন, “আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম সাহিত্যকে সহজ ও উন্মুক্ত একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে। চার দশকে আমরা যে পরিবার পেয়েছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।” তিনি নতুন সাহিত্য কর্মশালা, পাঠচক্র, গবেষণা প্রকল্প, বিদ্যালয়ে সাহিত্যচক্র চালু এবং তরুণদের জন্য সৃজন-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরুর পরিকল্পনার কথা জানান।
বক্তারা বলেন, আজকের প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই মোহনার মতো সংগঠনগুলোর প্রয়োজন আরও বেশি—যেখানে তরুণরা আবার যুক্ত হবে সাহিত্য, গবেষণা, সংগীত ও শিল্পচর্চার সঙ্গে। তারা বলেন, সাহিত্যই পারে সমাজকে যুক্ত করতে, মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে এবং বোধের জগৎ উন্মুক্ত করতে।
প্রধান অতিথি প্রফেসর হাফিজুর রহমান বলেন, “সৃষ্টিশীলতার মূল শক্তি অনুশীলন। নিয়মিত লেখালেখি, পাঠ এবং ভাবনার পরিসর বিস্তৃত করলেই একজন লেখক পরিপক্ব হয়ে ওঠেন। মোহনার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লেখকদের সেই অনুশীলনের জায়গা করে দিচ্ছে।” তিনি মোহনার অগ্রযাত্রাকে খুলনার সাংস্কৃতিক গর্ব বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত কবি ও সাহিত্যিকদের স্মরণে পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। সেই নীরবতা যেন স্মরণ করায় মোহনার প্রাথমিক যাত্রায় যারা আলো ছড়িয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। চার দশকের পথচলার নানা স্মৃতি এই আয়োজনে হয়ে ওঠে আরও জীবন্ত।
সারা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কবি সাইফুল ইসলাম মল্লিক। কবিতা, গান, আবৃত্তি, আলোচনা ও স্মৃতিচারণে সজ্জিত এই আয়োজন মোহনার দীর্ঘ সৃজনমুখর যাত্রার এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। দর্শকদের উচ্ছ্বাস, অংশগ্রহণকারীদের আবেগ ও অতিথিদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য সহস্রতম আসরকে পরিণত করে এক স্মরণীয় উপলক্ষে।
বক্তারা বলেন, একটি সাহিত্য সংগঠনের সহস্রতম আসর শুধু একটি উদযাপন নয়; এটি খুলনার সাহিত্যচর্চার এক যুগান্তকারী অধ্যায়। দেশে এমন সংগঠন খুবই কম, যারা চার দশক ধরে টিকে আছে একই উদ্যমে। মোহনা সেই ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল নাম—যা কেবল একটি অঞ্চল নয়, বাংলাদেশের সাহিত্য আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপস্থিত সবাই বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন—মোহনা আগামীতে আরও বিস্তৃত হবে, আরও সৃজনচর্চা জন্ম দেবে, তরুণদের পথ দেখাবে এবং মানবিকতার আলো ছড়িয়ে যাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে। সহস্রতম আসর তাই হয়ে থাকল এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে।


























