সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা-গ্রহণযোগ্যতা-স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:০৫:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ মে ২০২৫
- / ৭৭৯ বার পঠিত

সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, আধুনিক সভ্যতার দর্পণ বলা হয়। কারণ রাতের সকল অন্ধকার দূর করে ভোরবেলায় সূর্য যেমন পৃথিবীকে আলোকময় করে, তেমনি রাত পেড়িয়ে ভোরে নিত্য নতুন খবর দিয়ে আমাদের জ্ঞানালোক আলোকময় করে সংবাদপত্র। সংবাদপত্র সমাজের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, আবালবৃদ্ধবনিতাসহ সকল শ্রেণীর লোকেরই জ্ঞান বৃদ্ধি ও মনের কৌতূহল মিটিয়ে থাকে। একটা সময় ছিল, যখন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবাকে ঘরময় হেটে বেড়াতে দেখতাম, মায়ের দেয়া ধোয়াময় চায়ের কাপ যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কোন খেয়াল নেই সেদিকে, ক্যামন যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন বাবা। ঠিক যখন এলাকার হকার দরজার তলা দিয়ে পত্রিকা দিয়ে যেতো, ব্যাস বাবার মনে যে তখন কি এক শান্তিময় হাসি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখতো না। টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, আর হাতে পত্রিকা নিয়ে মন দিয়ে পড়ছেন, এই দৃশ্য দেখতে দেখতে-ই আমাদের বড় হওয়া। আর সংবাদপত্রের প্রতি ভালোলাগা ও ভালোবাসা হয়তো সেখান থেকেই শুরু। বাবার অভ্যাসটা আমিও পেয়েছি, আজ-ও সকালে উঠে পত্রিকা হাতে না পেলে কোন কিছু-ই যেন ভালো লাগে না। তবে আমার মেয়ে পত্রিকা পড়ায় অতটা আগ্রহী না হলেও, মাঝে মাঝে দেখি মায়ের সাথে পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে ২/৪ লাইন পড়ছে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, এদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো পত্রিকা হাতে-ই নিবে না।
এক সময়ের জনপ্রিয় সংবাদপত্র অনেকটাই আধুনিকতার কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সকলের হাতে হাতে মোবাইল-ইন্টারনেট, অনলাইন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দিনের খবর দিনেই পাচ্ছি আমরা, স্বভাবত-ই পরের দিন পত্রিকার পাতায় ঐ খবর পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি আমরা। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, সংবাদপত্র একটি দালিলিক প্রমাণ। তাই হাজার বছর পরেও সংবাদপত্রের গ্রহণযোগ্যতা ফুরাবার নয়। সভ্যতার সার্বিক বিকাশের প্রয়োজনেই সংবাদপত্রের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। আজ শনিবার (৩ মে) বিশ্ব সংবাদপত্র স্বাধীনতা দিবস, যা বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। প্রতিটি সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার কিংবা তথ্যের অবাধ প্রবাহের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় এই দিনটি। আমাদের দেশের সংবিধানেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সুইডেন বিশ্বের প্রথম দেশ, যেখানে ১৭৬৬ সালের ফ্রিডম অফ প্রেস অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রেসের স্বাধীনতাকে তাদের সংবিধানে সংরক্ষণ করেছিল। জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকের মতামত ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে, এই অধিকারে হস্তক্ষেপ ছাড়াই মতামত রাখা, এবং কোনও গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য ও ধারণাগুলি অনুসন্ধান করা, গ্রহণ এবং গ্রহণের স্বাধীনতার সীমানা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত’। আমাদের দেশে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি)-র সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে অনুমোদিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ১ হাজার ৩৬৯টি, যার মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা ৫৬১টি (যার মধ্যে দৈনিক নাগরিক ভাবনা ৪২৭ নং ক্রমিকে)। এছাড়া সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ইত্যাদি মিলিয়ে সর্বমোট নিবন্ধিত পত্রিকা সংখ্যা ৩ হাজার ৩১০টি। টেলিভিশন খাতে অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ৪৫টি এর মধ্যে ৩০টির বেশি সম্প্রচারে রয়েছে।

সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ও সংবাদপত্র একটি ঝুঁকিবহুল শিল্প। যেখানেই সমাজবিরোধী, দুর্নীতিবাজ ও স্বার্থান্বেষী অশুভ চক্রের ষড়যন্ত্র, সেখানেই সাংবাদিকরা তৎপর হন। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা অনন্য সাধারণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। সাংবাদিক জাতির বিবেক এবং পাঠক সংবাদপত্রের প্রাণশক্তি। কেননা জনগণের ভাবনার প্রতিফলন ঘটে সংবাদপত্রে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি আপেক্ষিক। তবে সংবাদপত্রের ওপর অযাচিত ও অনাকাঙ্খিত চাপ সৃষ্টি নিশ্চিতভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা কখনই অর্থবহ হয় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের মানবাধিকারেরই অংশবিশেষ। তাই সাংবাদিককে মানবাধিকার কর্মীও বলা যেতে পারে। স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। একটি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হলে গণতন্ত্র বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কোনো সময়ই সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা ছিল না। আজ সংবাদপত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সেন্সরশিপ, প্রণয়ন করা হয়েছে বিভিন্ন কালাকানুন। গণমাধ্যমের কার্যালয়ে পুলিশের মারমুখী অনুপ্রবেশ, কর্মরত সাংবাদিককে চোর-ডাকাতের মতো আটক, এমনকি সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ এবং প্রেস পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। আর এখন হরহামেশাই নানাভাবে রোষানলে পড়তে হয় সংবাদকর্মীদের। অনেক সাংবাদিক সম্মানহানি ও বন্দি হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও কাজ করেন শুধু সর্বসাধারণের অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য। তারা যে কোনো অবস্থায় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে, দুর্নীতি ফাঁস করলে, ঘুষ, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিসহ অনৈতিক ও জিঘাংসামূলক অবস্থানের চিত্র তুলে ধরলে সেটা এখন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আশির্বাদপুষ্ট রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’। সংবাদ প্রকাশ করায় পত্রিকার ঐ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী মামলা করা হয় রাজশাহীতে। মজার বিষয় হলো, ঐ চাঁদাবাজী মামলায় পত্রিকার প্রকাশককেও আসামী করা হয়েছে। সকল তথ্য প্রমাণ দাখিল করার পরেও মামলাটি আজও বিচারাধীন, কারণ মামলার সাক্ষী অদ্যাবধি অনুপস্থিত।

সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন আমাদের সকল সাংবাদিকদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর মত প্রকাশের স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রে শতভাগ সমান নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষেত্রবিশেষ অনেকটাই বৃত্তবন্দি হয়ে পড়েছে। ১৯৭৩-এ প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী জেলা প্রশাসকদের হাতে সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করার ঘটনাও অনেকে বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেছে, আবার অনেকে এই সিদ্ধান্ত দ্বারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলেও মন্তব্য করেছেন।
বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে এখনো সুবিধাবাদীদের রক্তচক্ষুতে পরিণত হতে হয়। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাও বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে সংবাদপত্র প্রকাশ অনেকে লাভজনক ব্যবসা বলে মনে করেন। আসলে-ই কি তাই? তবে সামাজিক প্রভাব বিস্তার, প্রকারান্তরে লাভকেই বুঝায়। আর এমনটিই যদি হয় মুখ্য, তাহলে সংবাদপত্রে দায়বদ্ধতার বিষয়টি আর থাকে না, থাকতে পারে না। তবে সংবাদপত্রকে শুধু ব্যবসায়িক মাধ্যম হিসেবে দেখলে চলবে না, কারণ সংবাদপত্রের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে। কোনো তথ্য জানার অধিকার থেকে পাঠককে বঞ্চিত না করা-ও কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি অংশ। তবে মত প্রকাশ করতে গিয়ে একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা ব্যাহত হয়, এমন কাজ করা মোটেও সমীচিন নয়। জানার অধিকার এবং গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে আমাদের সবাইকে অবশ্যই একটি ভারসাম্য রেখে ও মেনে চলতে হবে। অন্যথায় সংবাদপত্র আর সংবাদমাধ্যম হিসেবে বিকশিত হতে পারবে না, হয়ে যাবে সংবাদ বাহক। সমাজের দর্পণ যদি সমাজ পরিবর্তন না করে কলুষিত-ই করে, তবে তার দায়বদ্ধতা কিন্তু প্রশ্নবোধকের জন্ম দিবে। তখন দেশ ও রাজনীতির স্বার্থে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন নিয়ে বিতর্ক থেকে যাবে। সংবাদপত্র ও তার সাংবাদিকেরা যত বেশি নিরপেক্ষ ও সৎ হবে, দেশ ও জাতি ততো বেশি উপকৃত হবে।
-লেখকঃ সাংবাদিক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা































