
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় শিশুদের জন্য নির্মিত হচ্ছে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব পার্ক। পৌর ভবনের নিকটবর্তী একটি উন্মুক্ত চত্বরকে সাজানো হচ্ছে শিশুদের খেলার জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে। বর্তমান পৌর প্রশাসক মো. ইকবাল হোসাইনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়, বরং শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঈশ্বরগঞ্জ একটি ঘনবসতিপূর্ণ পৌর এলাকা। এখানে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো খেলার জায়গা এতদিন ছিল না। স্কুল শেষে কিংবা অবসরে শিশুদের বিনোদনের জায়গা বলতে ছিল রাস্তাঘাট কিংবা অনিরাপদ খোলা মাঠ, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। অভিভাবকরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন একটি সুশৃঙ্খল শিশু পার্কের, যেখানে বাচ্চারা নিরাপদে সময় কাটাতে পারবে। এই চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে পৌর প্রশাসক নিজেই উদ্যোগ নেন পার্ক নির্মাণের। তিনি বলেন,-“একটি কথা আছে, যদি তুমি বড় কিছু করতে না পারো, কোনো সমস্যা নেই। ছোটো কিছু করো, যেটা মানুষের জন্য অনেক বড় কিছু হবে। জায়গার সমস্যা ও অন্যান্য কিছু সমস্যার কারণে পৌর পার্কটি হয়তো ছোটো হয়েছে। হয়তো শুধু পৌরসভার বাসিন্দারা এর সুবিধা পাবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, হয়তো এই ছোটো শুরুটাই ভবিষ্যতে অনেক বড় আকারে কোনো শিশু পার্ক নির্মাণের ভিত্তি গড়ে দিবে। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাঁদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের দায়িত্ব। এই পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে আমরা সেই দায়িত্ব পালনের একটি ছোট্ট চেষ্টা করছি।”
পৌর ভবনের সামনের অংশের জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে এই পার্ক। এখানে থাকবে দোলনা, কয়েক ধরণের স্লিপার, পাখি আকৃতির খেলনাসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গ। শিশুদের দৌড়ানোর জায়গাও রাখা হয়েছে বেশ খানিকটা। পার্কটির প্রতিটি খুঁটিনাটি পরিকল্পনায় শিশুদের নিরাপত্তা ও আনন্দের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে।
বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে দেয়ালজুড়ে আঁকা কার্টুন চরিত্র, ছোটদের জন্য একাংশে ফুড কর্ণার এবং পরিবেশ পরিচিতিমূলক শিক্ষামূলক সাইনবোর্ড। সন্ধ্যায় আলোকসজ্জায় পার্কটি এক মনোরম পরিবেশে পরিণত হবে, যেখানে পরিবারগুলো একত্রে সময় কাটাতে পারবে।
শিশুদের আনন্দদায়ক সময় কাটানোর পাশাপাশি এই পার্কটি স্থানীয়দের জন্যও হয়ে উঠবে একটি সামাজিক মিলনমেলা। তাই অভিভাবকরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাশেদুল ইসলাম রাজ নামে এক অভিভাবক জানান,-“আমাদের সন্তানেরা এখন দিনের অনেকটা সময় মোবাইলের স্ক্রিনে কাটায়। যদি ওদের জন্য একটি নিরাপদ খেলার জায়গা থাকে, তাহলে ওরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশবে, খেলবে, হাসবে—যেটি আমাদের সময় হতো।”
ঈশ্বরগঞ্জ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. কামরুল আলম বলেন,-“শুধু পড়াশোনাই নয়, খেলাধুলা ও মুক্ত পরিবেশে সময় কাটানো শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্ক শিশুদের সেই সুযোগ এনে দেবে।”
বাচ্চারাও দারুণ উচ্ছ্বসিত। ৭ বছর বয়সী সিয়াম বলে,
“আমি এখানে দোলনায় দোল খেতে চাই, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াতে চাই। আমার খুব ভালো লাগবে!”
পৌরসভার বাসিন্দা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হাসিবুল হাসান সনেট বলেন,- “শিশুদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নেও খোলা পরিবেশে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। আজকের শিশুরা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে, যার ফলে বাড়ছে অমনোযোগিতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও শারীরিক স্থূলতা। এমন পরিস্থিতিতে এই ধরনের একটি খেলার জায়গা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক হবে”।
শুধু শিশুরাই নয়, এমন একটি পার্ক অভিভাবকদের মানসিক চাপ হ্রাসেও সহায়তা করতে পারে। পার্কের পাশে বসার জায়গা, ছায়াযুক্ত গাছ ও ফুলের বাগান থাকবে যাতে অভিভাবকরাও কিছুটা সময় স্বস্তিতে কাটাতে পারেন।
পৌরসভা জানিয়েছে, পার্কে থাকবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কর্মী, সিসিটিভি ক্যামেরা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী। পার্কটি আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে মানুষের আগ্রহের উপর ভিত্তি করে সময় পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া পৌরসভার ফাঁকা রুমগুলোতে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি মিউজিয়াম করার পরিকল্পনা ছিল পৌর প্রশাসকের। কিন্তু বদলিজনিত কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে কেউ ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি মিউজিয়াম করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন পৌর প্রশাসক মো. ইকবাল হোসাইন।
ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার শিশু পার্ক প্রকল্পটি একটি মানবিক ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ। এটি যেমন শিশুদের একটি নিরাপদ বিনোদন কেন্দ্র দেবে, তেমনি পুরো সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বহন করবে। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টার সম্মিলনে এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যান্য পৌরসভাগুলোর জন্যও একটি মডেল।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত