
“মুসলিম রাষ্ট্র”—এই শব্দটা শোনামাত্র আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল, একটা আলোকিত ভূমি, যেখানে কোরআনের নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র চলে, যেখানে মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে সত্য, যেখানে শাসক মানে হালাল নেতৃত্ব। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এমন ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ই সবচেয়ে বড় মুসলমান হত্যা মেশিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা গড়েছে আল্লাহর নামে রাষ্ট্র, কিন্তু দিনশেষে তাদের বাণিজ্য হয় ইসরায়েলের সাথে।
তারা নামাজ পড়ে, কিন্তু অস্ত্র বানায় শিশু হত্যার জন্য। তারা কাবার দিকে মুখ করে,
কিন্তু চুক্তি সই করে হোয়াইট হাউজে বসে।
তারা বলেছিল: "এই রাষ্ট্র হবে উম্মাহর আশ্রয়।" কিন্তু এই আশ্রয়ে আজও উম্মাহর সন্তানরা লাশ হয়ে পড়ে থাকে। তাদের সংবিধানে “আল্লাহ” শব্দ থাকলেও, তাদের বাজেটে “আলজাজিরা নিষিদ্ধ” ধারা থাকে। তারা বলেছিল “মুসলমানদের মর্যাদা রক্ষা করবে”, কিন্তু রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিনি, কাশ্মীরি—সবাই আজও পরবাসী।
তারা যেদিন অস্ত্র চুক্তি করে, সেদিন খুতবার টপিক হয়—“জিহাদ ও ইসলাম”।
তারা যখন গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্রে নামে, তাদের টেলিভিশনে চলে “ইসলামের ইতিহাস” প্রোগ্রাম। তারা যখন ফিলিস্তিনে চুপ থাকে, তখন দেশে মডেল কোরআন প্রতিযোগিতা হয়। তাদের রাষ্ট্রীয় ইমাম বলে: “রাজনীতি নিয়ে কথা বলা গুনাহ।”
এইসব রাষ্ট্র “ইসলামী কূটনীতি”র নামে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য করে, সাইবার প্রশিক্ষণ
নেয়, আর ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ রাখে কেবল নীরবতা। তারা ইসরায়েলের তৈরী ডিভাইস দিয়ে মুসলমানদের ফোন হ্যাক করে। তারা Mossad-এর পরামর্শে জঙ্গি ধরার অভিযান চালায়, যাতে আসলে দমন হয় ইসলামী আন্দোলন।
তারা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামিক নাটক চালায়, যাতে মুসলমানদের মন শান্ত থাকে, প্রতিবাদ না করে। তারা ইসলামী গায়িকা দিয়ে গান গাওয়ায়, যার পরদিনই সেই টিভিতে ইসরায়েলি প্রযুক্তির বিজ্ঞাপন চলে। তাদের ইসলামী অনুষ্ঠানেও ইউটিউব মনিটাইজেশনের ট্যাগ দেওয়া থাকে: “ইসলাম + মিলিটারি ইনোভেশন + ওয়েস্টার্ন পলিসি”
তারা মাদ্রাসা বানায়, যেখানে “জাকির নায়েক” হারাম, আর “ফারাহ খান” হালাল।
তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইসলামিক ইতিহাস বইয়ের পাতা ছোট করে দেয়, আর হিজাব পরা ছাত্রীদের রাষ্ট্রবিরোধী বানিয়ে তোলে। নিরাপত্তা বাহিনী মসজিদের তালাশি করে, কিন্তু কখনো আম্বেসিতে ঢুকে দেখে না কে কী পাঠাচ্ছে ইসরায়েলকে। তারা নিরাপত্তার নামে মুসলমানদেরই নজরদারিতে রাখে।
তারা হজ্বের জন্য বিমান চালু করে, যার পাইলট আমেরিকান, রুট ডিজাইন ইসরায়েলি।
তারা হজ্ব প্যাকেজের নামে কোটি টাকা কমিশন নেয়, আর উম্মাহর দারিদ্র্য দেখে না। তারা কাবার ছবি দিয়ে ক্রেডিট কার্ড বানায়, যার ইন্টারেস্ট রেট শয়তানকেও অবাক করে দেয়। তারা ইসলামিক ব্যাংক খোলে, যার প্রকৃত মালিক—একটি মার্কিন গ্রুপ।
ধর্ম যখন ব্যবসায় পরিণত হয়:
এখনকার ধর্মীয় রাষ্ট্রগুলো কোরআনের পবিত্র পাতা নয়, চুক্তির দলিল হিসেবে ব্যবহার করে
ধর্মকে। তারা ধর্মকে শাসনযন্ত্র বানিয়েছে, আর কাবার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে পেছনের দরজা দিয়ে ফিলিস্তিনের মৃত্যুর চুক্তি স্বাক্ষর করে। তারা ইসলামকে রপ্তানিকারক পণ্য বানিয়েছে, আর আমদানি করেছে রক্তমাখা ডলার।
আরবীয় দ্বিচারিতা:
আরব রাষ্ট্রগুলোর অনেকের জন্য ফিলিস্তিন এখন আর কোনো ‘ইস্যু’ নয়। তারা এখন ‘নিউ মিডল ইস্ট’ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভিতর ঘুমিয়ে আছে একটি আগ্নেয়গিরি—যেটা জেগে উঠবে ফিলিস্তিনি রক্তের প্রতিশোধে। যখন গাজায় শিশুরা মাটির নিচে আশ্রয় নেয়, তখন সৌদি আরব “ডেভেলপমেন্ট সেমিনার” আয়োজন করে। যখন আল আকসা রক্তে রাঙা হয়, তখন দুবাইয়ে আতশবাজি ছোঁড়া হয়। যখন মায়ের কোলে ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে থাকে, তখন তারা ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ নিয়ে ব্যস্ত।
ইতিহাস যখন মিথ্যা প্রচার করে:
আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়ি, মুসলিমরা ছিলো উম্মাহ। একে অপরের দুঃখে পাশে দাঁড়াতো। কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো—একটা মুসলিম রাষ্ট্র অন্য মুসলিমদের বোমায় উড়িয়ে দেয়, আর তারপর জাতিসংঘে গিয়ে ‘সমঝোতার’ কথা বলে। উন্নয়ন, নিরাপত্তা আর আধুনিকতা—এই তিনটা শব্দ এখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মুখোশে পরিনত হয়েছে।
প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে:
আজকের দিনে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটি উচ্চারণ করাও বিপজ্জনক। কারণ ধর্মীয় চ্যানেলগুলো পর্যন্ত এখন ব্যবসায়িক স্পনসরের শর্তে চলে। তারা বলে—“বেশি কিছু বলো না, রাষ্ট্রীয় ইমেজ নষ্ট হয়।” তাহলে বলো, একটা শিশুর মুখ থেঁতলে গেলে কে জবাব দেবে তার ইমেজের?
একটা বিধবা যখন গোঙাতে গোঙাতে দুঃস্বপ্নে কাঁদে তখন রাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ দিয়ে কী হয়?
সামরিক দাসত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতা:
ইসলামিক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এখন মুসলিম ভাইদের জন্য দাঁড়ায় না, বরং ইসরায়েলের গোপন চুক্তিতে দেহরক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের মুসলমান পরিচয়ে গর্ববোধ করে, কিন্তু গোপনে প্রশিক্ষণ নেয় সেই শত্রুর কাছ থেকে যাদের হাতে হাজারো শিশু নিহত।
প্রশ্নের মুখোমুখি রাষ্ট্রব্যবস্থা:
এখন সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার—
➤ কেন পবিত্র কাবার আঙিনা নিরাপদ, কিন্তু গাজার মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়?
➤ কেন নামাজে ‘উম্মাহ’র জন্য কান্না, আর বাস্তবে সেই উম্মাহকে জঙ্গি ঘোষণা করা হয়?
➤ কেন একটি আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়, অথচ মুসলিমদের সাথে প্রযুক্তি ভাগ করে না?
তুমি যদি মুসলমান হও, তাহলে তোমার রাষ্ট্র মুসলিম নামে হত্যার লাইসেন্স পায় কেন?
কেন প্রতিটি গণহত্যায় একক মুসলিম রাষ্ট্র চুপ থাকে?
কেন ইসলামী দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক?
কেন মসজিদের ডোমের নিচে বসে থাকে স্পাই ক্যামেরা?
এখন প্রশ্ন করো,
এই রাষ্ট্রগুলো কি সত্যিই মুসলমানের? নাকি তারা হলো আধুনিক ফেরাউন, যারা নামাজ পড়ে, কিন্তু ফেরাউনকেই প্রভু মানে? “তোমরা যদি মহান আল্লাহর নামে রাষ্ট্র গড়বে, তাহলে কেন ইসরায়েলের গর্ভে তোমাদের জন্ম হলো?”
চলো এবার শিরদাড়া সোজা করি
এখন সময় এসেছে গলার সেই হাড্ডিটা শক্ত করে প্রশ্ন তোলার: “তোমরা আল্লাহর নামে রাষ্ট্র গড়লে, তাহলে কেন ইসরায়েলের গর্ভে তোমাদের জন্ম হয়?” আমরা যারা কলম হাতে নিয়েছি, তারা জানি—এই লেখাগুলো হয়তো পত্রিকায় ছাপা হবে না, টেলিভিশনে বলা যাবে না, সরকারি চ্যানেল প্রচার করবে না। তবু আমরা লিখবো, কারণ আমাদের লেখার দায় কোনো রাষ্ট্র দেয়নি— এই দায় এসেছে গাজায় কাঁদতে থাকা সেই মায়ের বুক থেকে। এই কলাম উৎসর্গ করছি ফিলিস্তিনের প্রতিটি শহীদ শিশুকে, যাদের দেহের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শীতল নীরবতা। (এটা কোনো সাহিত্য নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ খুলে ফেলার একটি দলিল)
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত