অপু দাস,স্টাফ রিপোর্টার,রাজশাহী: পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহীর বিভিন্ন বিপণিবিতান, শপিংমল ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে দিন দিন বাড়ছে ক্রেতাদের উপস্থিতি। রমজানের শুরুতে বাজারের চিত্র কিছুটা শান্ত থাকলেও বর্তমানে নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ঈদের কেনাকাটায় স্পষ্টভাবে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী এবং শিশুদের নানা সামগ্রী কিনতে ভিড় করছেন মানুষ।
নগরীর সাহেববাজার, নতুন মার্কেট, লক্ষ্মীপুর ও আরডিএ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, দোকানগুলোতে নতুন নকশা ও আধুনিক ফ্যাশনের পোশাক সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের পোশাকের দোকানগুলোতে তুলনামূলক বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তরুণ-তরুণীরা ঈদের জন্য থ্রি-পিস, শাড়ি, গাউন ও বিভিন্ন নকশার পোশাক কিনতে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে। অনেক দোকান মালিক তাই ক্রেতাদের সুবিধার্থে রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছেন।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নারীদের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। শাড়ির দাম কাপড়ের মান ও কারুকাজের ধরন অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার এমনকি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে পুরুষদের পাঞ্জাবি ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রেও কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে; ফ্রক কিংবা পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান দোকানিরা।
ঈদকে সামনে রেখে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পেও দেখা দিয়েছে নতুন কর্মব্যস্ততা। নগরীর বিভিন্ন রেশমের দোকানে রেশমি শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ঈদ মৌসুমে রেশম পণ্যের বিক্রি কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে কিছু ক্রেতা বলছেন, আগের তুলনায় দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় তারা প্রয়োজন অনুযায়ী হিসেব করে কেনাকাটা করছেন।
ঈদের পোশাক তৈরি ঘিরে নগরীর দর্জিপাড়াগুলোতেও এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। অনেকেই আগেভাগেই কাপড় কিনে দর্জির কাছে অর্ডার দিচ্ছেন, ফলে দর্জির দোকানগুলোতে দিন-রাত কাজ চলছে। দর্জিরা জানান, ঈদের আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোশাক সরবরাহ করতে তাদের অতিরিক্ত সময় দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও স্থানীয় বাজারে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এর সম্ভাব্য প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ার পর নগরীর কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এখন পর্যন্ত বাজারে বড় ধরনের কোনো সরাসরি প্রভাব পড়েনি।
নগরীর কয়েকজন ক্রেতা জানান, পণ্যের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেশি মনে হওয়ায় তারা সীমিত পরিসরে কেনাকাটা করছেন। এক ক্রেতা বলেন, “ঈদ বছরে একবারই আসে, তাই পরিবারের জন্য কিছু না কিছু কিনতেই হয়। তবে এবার খরচের হিসাব একটু বেশি করে রাখতে হচ্ছে।”
ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, ঈদের শেষ সপ্তাহে বাজারে ক্রেতার চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, ঈদ বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় মানুষ নানা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার আলোচনা থাকলেও ঈদকে ঘিরে রাজশাহীর বাজারে ইতোমধ্যেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততায় নগরীর বিপণিকেন্দ্রগুলো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে এবং ঈদের আগমনী আনন্দে শহর ধীরে ধীরে মুখর হয়ে উঠছে।