প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ৬:১৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ১৬, ২০২৫, ৩:৩৭ পি.এম
![]()
রমজান মাস মুসলিমদের জন্য পবিত্রতম মাসগুলোর একটি, যা সংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাস। কিন্তু এ মাসে ইবাদতের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও ব্যস্ততা বেড়ে যায়, বিশেষ করে বিপণি-বিতান, শপিংমল ও বাজারগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। ফলে দোকান-মার্কেটগুলোতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জার প্রবণতা দেখা যায়। তবে এই অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বিদ্যুতের মারাত্মক অপচয় ঘটায়, যা অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে ক্ষতিকর। তাই আমাদের উচিত মাহে রমজানে সচেতনভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার করা।
> বিদ্যুতের গুরুত্ব ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিদ্যুৎ আধুনিক সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে প্রায়ই লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রমজান মাসে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার আরও বেড়ে যায়, বিশেষ করে মসজিদ, বাসা-বাড়ি ও বাজারগুলোতে। এই সময় অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বিদ্যুতের ঘাটতিকে আরও তীব্র করে তোলে। রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা ও অতিরিক্ত আলোকসজ্জার প্রভাব রমজান মাসে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এর কারণ: ইফতার ও সেহরির সময় বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি: রান্নার জন্য ইলেকট্রিক ওভেন, রেফ্রিজারেটর, পানির পাম্প ইত্যাদি চালানো হয়। ইবাদতের জন্য মসজিদে বিদ্যুতের চাহিদা: তারাবিহ, কিয়ামুল লাইল, ইফতার মাহফিলসহ নানা ধর্মীয় আয়োজনের কারণে মসজিদগুলোতে অধিক বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বাজার ও শপিংমলগুলোর বাড়তি আলোকসজ্জা: রমজান মাসে কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ে। বিক্রেতারা ক্রেতা আকৃষ্ট করতে দোকান ও মার্কেটে অতিরিক্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করে, যা বিদ্যুতের অপচয় বাড়িয়ে দেয়।
অতিরিক্ত আলোকসজ্জার ফলে—
বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়ে, যা লোডশেডিংয়ের কারণ হতে পারে। অন্যান্য খাতের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সমস্যা হয়। অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কারণে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়। পরিবেশগত ক্ষতি হয়, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, যা কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।
> বিদ্যুতের অপচয় রোধে করণীয়
রমজানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা কমিয়ে বিদ্যুতের সাশ্রয় করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এজন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
১. বাজার ও শপিংমলে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা
ব্যবসায়ীদের উচিত শুধু প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করা এবং সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য অপ্রয়োজনীয় লাইটিং এড়িয়ে চলা।
২. এলইডি ও সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করা
পুরনো বা অধিক বিদ্যুৎ খরচকারী বাতির পরিবর্তে এলইডি বা সাশ্রয়ী লাইট ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ কম খরচ হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৩. নির্দিষ্ট সময় পর লাইট বন্ধ রাখা
শপিংমল বা বাজারগুলোতে নির্দিষ্ট সময় পর অতিরিক্ত আলো নিভিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা যায়।
৪. সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ
সরকারের উচিত বিদ্যুতের অপচয় রোধে নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং ব্যবসায়ীদের এই বিষয়ে সচেতন করা।
৫. গণসচেতনতা বৃদ্ধি
সাধারণ মানুষকে বিদ্যুতের সাশ্রয় সম্পর্কে সচেতন করতে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রচারপত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
> ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয়
ইসলামে অপচয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা ইসরা: ২৭)
বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের অপচয়ও ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। তাই আমাদের উচিত রমজান মাসে সংযম প্রদর্শন করা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা থেকে বিরত থাকা। পরিশেষে বলতে চাই, রমজান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বিদ্যুতের অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং পরিবেশগত ও সামাজিকভাবে ক্ষতিকর। তাই আমাদের উচিত প্রয়োজনের অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বর্জন করা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। রমজানে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করে আমরা একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদ রক্ষা করতে পারব, তেমনি ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী সংযমের চর্চাও করতে পারব।