
প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৩, ২০২৬, ৭:০৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ৩, ২০২৬, ৪:০৫ পি.এম
গ্রামবাংলার শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার কবে নিশ্চিত হবে?
![]()
।। জেমস আব্দুর রহিম রানা।। মে মাস এলেই শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই সমাজ, এই অর্থনীতি, এই উন্নয়নের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকের ঘামে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, সেই শ্রমিক—বিশেষ করে গ্রামবাংলার শ্রমজীবী মানুষ—আজও বঞ্চনার এক দীর্ঘ চক্রে আবদ্ধ।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষিশ্রমিক, ইটভাটা শ্রমিক, দিনমজুর ও নির্মাণশ্রমিকরা প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু তাদের আয় অপ্রতুল, অনিশ্চিত এবং অনেক ক্ষেত্রে মৌসুমি। একদিকে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য, অন্যদিকে তাদের মজুরি সেই হারে বাড়ছে না। ফলে ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও হয়ে উঠছে কঠিন।
গ্রামাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থানের স্থায়িত্বের অভাব। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কাজ থাকলেও বাকি সময় তারা বেকারত্ব বা অর্ধ-বেকারত্বে ভোগেন। এতে তাদের জীবনযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা। ইটভাটা, নির্মাণকাজ কিংবা কৃষিক্ষেত্রে কাজ করার সময় শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় নেওয়ার মতো কোনো কার্যকর কাঠামো নেই। একটি দুর্ঘটনা মানে একটি পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার।
যদিও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন নীতিমালা নির্ধারণ করেছে, গ্রামীণ বাস্তবতায় তার প্রয়োগ এখনো সীমিত। শ্রম আইন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের অনেক শ্রমিকই এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত ও কার্যকর উদ্যোগ। প্রথমত, গ্রামীণ শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের বিকল্প সুযোগ তৈরি করতে হবে—ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করতে হবে, যাতে দুর্যোগ বা বেকার সময়ে তারা সহায়তা পান।
মে মাস আমাদের শুধু অতীতের সংগ্রাম স্মরণ করিয়ে দেয় না, বর্তমানের দায়ও তুলে ধরে। গ্রামবাংলার শ্রমিকদের উন্নয়ন ছাড়া টেকসই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের অধিকার নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি শ্রেণির উন্নয়ন নয়—এটি পুরো সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার পূর্বশর্ত।
সাপ্তাহিক পল্লী কথা পত্রিকার পক্ষ থেকে এটাই প্রত্যাশা—শ্রমিকের ঘামে গড়া এই দেশ যেন তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে। কথার চেয়ে কাজে প্রতিফলন ঘটুক, তবেই মে মাসের প্রকৃত তাৎপর্য সফল হবে।
লেখক: সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত