নেশা শব্দটি শুনলেই সাধারণত বাজে জিনিসের নেশার কথাই মাথায় আসে। কিন্তু শত শত বাজে নেশার ভীড়েও আমাদের নজর কাড়ে ভালো নেশাগুলো।ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলাতেও এরকম নজর কেড়েছে একজনের একটি ব্যতিক্রমী নেশা। জানাজার নেশা! শুনতে কিছুটা অবাক লাগলেও এমনটিই সত্যি। শত কাজের মধ্যেও, শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর জানাজা পড়া বাদ যায় না। দিনে ৫/৭ জন মৃত ব্যক্তির জানাজাতেও অংশ নেন মাঝে মাঝে। উপজেলার প্রায় সকল মানুষ তাঁকে জানাজা পড়ার জন্য আলাদাভাবে চেনেন। বলছি আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া মনি’র কথা। পরিচিত মুখ। একজন রাজনীতিবিদ। উপজেলার ভাইস-চেয়ারম্যান পদে দীর্ঘদিন দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ঈশ্বরগঞ্জের মাইজবাগ ইউনিয়নের তারাটি গ্রামের ইসমাইল ভুঁইয়ার ছেলে তিনি। ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত হওয়ায়, মানুষের কাছাকাছি থাকার সুযোগ হয়েছে তাঁর।
রাজনীতি তাঁকে দিয়েছে মানুষের সেবা করার প্ল্যাটফর্ম।আর এই মানুষকে ভালোবেসেই ধীরে ধীরে যেন ভিন্ন এই নেশায় জড়িয়ে পড়েন তিনি—জানাজা পড়ার নেশায়। প্রথমে বিষয়টি দায়িত্ববোধ মনে হলেও সময়ের সাথে সেটিই তাঁর জীবনের অন্যতম আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। যা রীতিমতো এখন নেশার পর্যায়ে। কেউ মারা গেলে কখন জানাজায় যাবেন সেই চিন্তায় অন্য কাজেও মন দিতে পারেন না।
জানাজার নামাজ মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মুসলিম সমাজে মৃতব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করতেই এই নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তবে জানাজার নামাজ পড়ার প্রতি অদ্ভুত ভালোবাসা এবং অভ্যাসের কারণে, মানুষের ভিন্ন পর্যায়ের ভালোবাসা পাচ্ছেন আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া মনি।
তাঁর ব্যতিক্রমী এই নেশা তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। তিনি দশ বছরের অধিক সময় ধরে নিয়মিতভাবে এলাকার জানাজার নামাজে অংশ নিচ্ছেন। কোনো আত্মীয়, প্রতিবেশী, বা দূরের কারো জানাজার খবর পেলেই তিনি দ্রুত সেখানে পৌঁছে যান।
আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া মনি জানান, প্রথম দিকে তিনি তাঁর আত্মীয়দের জানাজায় অংশ নিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে জানাজার প্রতি তার একধরনের আত্মিক টান অনুভূত হতে থাকে। তিনি বিশ্বাস করেন, জানাজার নামাজে অংশ নিলে মৃতব্যক্তির জন্য দোয়া করার পাশাপাশি নিজের আত্মার পরিশুদ্ধিও ঘটে।
মনি বলেন, “জানাজা পড়া এমন একটি কাজ, যা আমাকে পরকালীন জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন কোনো জানাজায় অংশ নেই, তখন মনে হয়, আমিও একদিন এভাবেই চলে যাবো। এটা আমাকে দুনিয়ার লোভ-লালসা থেকে দূরে রাখে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মতই জানাজার নামাজ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার কাছে। ”
পুরোনো স্মৃতি ঘেটে আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া মনি আরও যোগ করেন। ২০১৪ সালের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ যেদিন হওয়ার কথা, সেদিন মারা যান উপজেলার স্বনামধন্য ডাক্তার আব্দুর রাশিদ। তখন যাচাই-বাছাইয়ের দিন সেখানে উপস্থিত না হয়ে চলে যান ডাক্তার আব্দুর রাশিদের জানাজায়। এরকম বহু ব্যস্ততা ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলি দিয়ে জানাজায় অংশ নিয়েছেন তিনি।
এলাকাবাসীর মতে, জানাজার প্রতি মনির এই টান যেন নেশার মতো। দিন-রাত কোনো সময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি যেকোনো জায়গার জানাজায় পৌঁছে যান। একাধিকবার তাকে দেখা গেছে দূরবর্তী এলাকায় জানাজায় যোগ দিতে। এমনকি কখনো কখনো তিনি অন্য কাজ ফেলে রেখেই জানাজায় ছুটে গেছেন।
উপজেলার পৌর সদরের কাকনহাটি গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ মুফতি সফিউল্লাহ ফুআদ বলেন, কোনো মুসলিম মানুষ যখন মারা যায়, ইসলামী বিধান মতে তার জানাযায় উপস্থিত হওয়া জীবিত মানুষের কাছে মৃতের অধিকার। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "এক মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি অধিকার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো, কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জানাজায় শরিক হবে।”
আমাদের ঈশ্বরগঞ্জের একজন জনপ্রতিনিধি আমিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মনি। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি অত্যন্ত কল্যাণকর কাজ করছেন। তিনি একেকটি জানাজায় একেকজন মৃত ব্যক্তির হক আদায় করছেন। আমরা তাঁর ইসলামের পথে কল্যাণ কামনা করি।
এলাকার যুবকরাও আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া মনির এই কাজে উৎসাহিত হচ্ছেন। তাঁরা জানান, “বর্তমান প্রজন্ম জানাজার মতো ধর্মীয় কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু মনি ভাই এ বিষয়ে যুবকদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন”।
জানাজার প্রতি এই ভালোবাসা নিয়ে মনি বলেন, “আমি চাই, যতদিন বেঁচে আছি, ততোদিন যেন জানাজার নামাজে অংশ নিতে পারি। এটা আমার নেশা, এটা আমার ভালোবাসা”।
মনির এই ব্যতিক্রমী নেশা এবং নিবেদন আজ অনেকের কাছেই প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু জানাজায় অংশ নিচ্ছেন না, বরং মৃতব্যক্তির প্রতি সম্মান জানিয়ে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগ হয়তো একদিন আরও অনেক মানুষকে জানাজার মতো মহৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করবে।