
নাগরিকভাবনা ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি–অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে মেয়র পদে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চার প্রার্থী।
এই প্রার্থীরা হলেন অ্যাসপায়ার পার্টির বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান, লেবার পার্টির কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের প্রার্থী জামি আলী ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির (লিব ডেমস) মোহাম্মদ আবদুল হান্নান।
এ নির্বাচনে মেয়র পদে আরও লড়ছেন কনজারভেটিভ পার্টির ডমিনিক নোলান, গ্রিন পার্টির হীরা খান, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড স্যোশালিস্ট কোয়ালিশনের হুগো পিয়েরে, রিফর্ম ইউকের জন বোলার্ড ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্যারেন্স ম্যাকগ্রেনেরা।
আগামী ৭ মে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
টাওয়ার হ্যামলেটস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে এবার লুৎফুর রহমানের সঙ্গে সিরাজুল ইসলামের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো রাজনীতিকের হাতে থাকার সম্ভাবনা জোরালো বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
এই বরোর দুটি পার্লামেন্টারি আসনে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুজন এমপি। তাঁরা হলেন রুশনারা আলী ও আপসানা বেগম।
লুৎফুর রহমান
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের তিনবারের নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান। রাজনৈতিক জীবনে তিনি আলোচিত–সমালোচিত।
লুৎফুর রহমানের জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। তিনি শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি–অধ্যুষিত এলাকায় তিনি বেড়ে ওঠেন।
আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে সলিসিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন লুৎফুর রহমান। কমিউনিটি রাজনীতির মাধ্যমে তিনি দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে লুৎফুর রহমান লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দলের হয়ে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমান প্রথমে লেবার পার্টির মনোনয়ন পান। পরে তা বাতিল হলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হন। তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম সরাসরি নির্বাচিত মেয়র।
২০১৪ সালে লুৎফুর রহমান মেয়র হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে আদালতের রায়ে তাঁর মেয়র পদ বাতিল হয়। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে নিষিদ্ধ হন তিনি। তবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
সম্প্রতি লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল ঘিরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকি। কাউন্সিলের ওপর সরকারের তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারনিযুক্ত প্রতিনিধিদের। তাঁরা আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ সেবাদানের প্রক্রিয়া আরও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
লুৎফুর রহমান বলেন, এই বরোর মতো জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এখানে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লুৎফুর রহমান দাবি করেন, গত নির্বাচনের আগে তাঁর দেওয়া প্রায় ১২০টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৯৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
লুৎফুর রহমান ভাষায়, ‘কথা বা সমালোচনা নয়, প্রয়োজন কার্যকর নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা।’
লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী স্লোগান হলো ‘উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অ্যাসপায়ারকে ভোট দিন’।
সিরাজুল ইসলাম
২০০১ সাল থেকে টানা সাতবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম। এবারের নির্বাচনে তাঁকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে লেবার পার্টি। তিন দশকের বেশি সময়ের কমিউনিটি ও স্থানীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এবার মেয়র পদের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
১৯৭২ সালে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে আসা সিরাজুল ইসলাম পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দরজির কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে বর্ণবাদী অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপট তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯৯০–এর দশকে লেবার পার্টির মাধ্যমে সিরাজুল ইসলামের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ২০০১ সালে হলি ট্রিনিটি ওয়ার্ড থেকে তিনি প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। একই এলাকা থেকে টানা সাতবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে পাঁচ হাজার নতুন ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। হাউজিং খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান মেয়র অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি।
জামি আলী
আইন পেশাসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে জামি আলী স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে জন্ম নেওয়া জামি আলীর পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাঁর দাদা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে যুক্তরাজ্যে বসবাস শুরু করেন।
জামি আলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি যুক্তরাজ্যের কুইনমেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ইনার টেম্পল থেকে বার-এ কল গ্রহণ করে লন্ডনে আইনচর্চা শুরু করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে জামি আলীর। তিনি বর্তমানে লন্ডনের ৩৩ বেডফোর্ড রো চেম্বারে ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ করছেন।
জামি আলী প্রথম আলোকে বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়াসহ কাউন্সিল প্রশাসনের স্বচ্ছতার ঘাটতি তাঁকে মেয়র নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে।
নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের ব্যয়ের স্বাধীন অডিট, হাউজিং খাতে স্বচ্ছতা ও জনসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জামি আলী।
মোহাম্মদ আবদুল হান্নান
লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি (লিব ডেমস) থেকে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল হান্নান। তিনি ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হয়ে আসেন। আবদুল হান্নান একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।
২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন আবদুল হান্নান। লেবার পার্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন তিনি।
টাওয়ার হ্যামলেটসে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী আবদুল হান্নান একজন টেলিকম নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বর্তমানে ক্যানারি ওয়ার্ফে নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে।
আবদুল হান্নান বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি আবাসনসংকট মোকাবিলা, সড়ক নিরাপত্তাসহ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবেন। কাউন্সিলের সেবায় জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেবেন।
আবদুল হান্নান বলেন, ‘অপরাধ ও ময়লার সমস্যা বেড়েছে। আমরা নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন টাওয়ার হ্যামলেটস গড়ে তুলতে কাজ করব।’
কাউন্সিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণদের জন্য গণপরিবহন আরও সহজে প্রবেশযোগ্য করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আবদুল হান্নান।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত