প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২১, ২০২৬, ১০:১৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ৭, ২০২৫, ১২:৪০ পি.এম
![]()
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ : শীত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ডায়রিয়া রোগের প্রকোপ।আর শীত মৌসুমে সক্রিয় হয় এমন ভাইরাসবাহী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকেই।রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও খুব একটা কমেনি শীতের তীব্রতা। এসময় শিশুদের ডায়রিয়া প্রবণতা বেশি দেখা দেয়। দূষিত পানি, বাহিরের খোলা ও অপরিস্কার খাবার খেলে শিশুো এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এসময় শিশুর ডায়রিয়া প্রতিরোধে পিতা-মাতাকে বাড়তি সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ডা.এম এম মাজেদ । নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস ইত্যাদি রোগের পাশাপাশি ডায়রিয়াতেও প্রচুর শিশু আক্রান্ত হয়, যাকে বলে কোল্ড ডায়রিয়া।
> কারণ : কোল্ড ডায়রিয়ার তেমন সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘এডিনো’ ভাইরাসকে দায়ী করা হয়। এ ভাইরাস ঠাণ্ডা যেমন ঘটায়, আবার ডায়রিয়াও ঘটায়।
চিকিৎসা : শীতজনিত ডায়রিয়া বা কোল্ড ডায়রিয়ার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেমন কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না। এর চিকিৎসা খুবই সাধারণ এবং তা হল, মুখে খাওয়ার স্যালাইন ও জিংক খাওয়ান। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে শুধু মায়ের বুকের দুধ ও অল্প অল্প খাবার স্যালাইন খেতে দিতে হবে। এতেই ডায়রিয়া ভালো হয়ে যায়, অন্য কোনো ওষুধ দেয়া লাগে না। ডায়রিয়া সেরে যেতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগে। এ সময় সম্ভব হলে খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, কাঁচা কলার ভর্তা ইত্যাদি খেতে দিন। খাবার স্যালাইন ঘরে না থাকলে হাতে তৈরি স্যালাইন বানিয়ে পান করান। জ্বর থাকলে প্যারাসিটামলজাতীয় জ্বরের সিরাপ, ঠাণ্ডার জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন সিরাপও দেয়া যেতে পারে। আর হোমিওপ্যাথিতে নাক্স ভূমিকা, একোনাইট,মারকুরিয়াস সল সুরুতেই খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ালে পানিশূন্যতা দেখা দেয় না।
কখন হাসপাতালে নিবেন : কিছু ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। নচেৎ সে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কিন্তু কখন হাসপাতালে নিতে হবে, সে বিষয়ে অনেকে অবগত নয়। সাধারণত যখন শিশুকে হাসপাতালে দ্রুত ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন হয়, তা হল-
* খুব বেশি পানির মতো পাতলা পায়খানা অনবরত হতে থাকলে।
* শরীর অতিরিক্ত পানিশূন্য হয়ে নিস্তেজ হলে।
* প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে বা একেবারেই প্রস্রাব না হলে।
* মুখ ও জিব শুকিয়ে গেলে।
* স্যালাইন বা অন্য কোনো খাবার একেবারে খেতে না পারলে।
* খুব বেশি বমি করলে, এমনকি স্যালাইন খেয়েও বমি হলে বা অবস্থা বেশি খারাপ মনে হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়।
কিছু ভুল ধারণা
* শিশুর ডায়রিয়া হলে অনেকে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেন বা নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করেন, যা মোটেই ঠিক নয়।
* অনেকে ডায়রিয়া হলে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ান একেবারেই বন্ধ করে দেন, এটাও শিশুর জন্য বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর।
* বমি হলে অনেকে স্যালাইন বন্ধ করে দেন তা করা যাবে না। বরং বমি বন্ধ হলে বা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অল্প অল্প করে খাওয়ার স্যালাইন দিন।
* অনেকে স্যালাইনের কিছু অংশ পানির সঙ্গে গুলিয়ে পান করায়, যা মোটেও ঠিক নয়। এতে স্যালাইনে লবণের পরিমাণ বেশি হয়ে শিশুর ব্রেণে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। বরং শিশু যতটুকুই পান করুক না কেন, স্যালাইনের পুরো অংশ পরিমাণমতো পানির সঙ্গে মিশিয়ে সেই পানি বারবার খাওয়াতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর স্যালাইন মেশান বাকি পানি ফেলে দিতে হবে।
* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, ভাইরাসজনিত কোল্ড ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের কিন্তু কোনো ভূমিকা নেই।
প্রতিরোধে করণীয়
* যেহেতু ঠাণ্ডার কারণে কোল্ড ডায়রিয়া হয়, সেহেতু যেকোনোভাবেই হোক এ শীতের সময় শিশুকে ঠাণ্ডা বা শীতের অতিরিক্ত প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে হবে। সব সময় পর্যাপ্ত গরম পোশাকে শিশুকে আবৃত করে রাখতে হবে।
* স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বা ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করা যাবে না।
* শীতের সময় শিশুর গোসলে হালকা গরম পানি ব্যবহার করা ভালো। প্রতিদিন গোসল করানোর দরকার নেই।
* সর্দি, হাঁচি, কাশি, জ্বর দেখা দিলেই সতর্ক হতে হবে। এ সময় নাকে-মুখে রুমাল ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে নেবুলাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
* শিশুকে সব সময় স্বাভাবিক ও টাটকা খাবার খাওয়াতে হবে। খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে, যাতে মশা-মাছি না বসে। বাইরের খোলা খাবার শিশুকে কখনও খাওয়াবেন না। ঘরে তৈরি খাবার খাওয়ানোই শ্রেয়।
* মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে।
* গরুর দুধ ঘন না করে বরং একটু পাতলা করে পান করানো উচিত।
* শিশুর খাবার পানি ফুটিয়ে পান করাতে হবে।
> ডায়রিয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ:- আসলে রোটা ভাইরাস ডায়রিয়া তো পানির মতো হতে থাকে। কোনো কোনো বাচ্চার দেখা যায় যে দিনে ১০/১৫ বারও পানির মতো পায়খানা হতে থাকে। পায়খানাতে লবণ ও পানি বেরিয়ে আসে। লবণ ও পানি যদি ঠিকমতো আবার তাকে দেওয়া হয়, তাহলে ঠিক হবে। রোটা ভাইরাস তো আসলে ভাইরাস দিয়ে হয়, এর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই। এর প্রধান চিকিৎসাই হলো স্যালাইন। এর ভেতর পানি ও লবণ রয়েছে। এটিই তাদের খুব ঘন ঘন খাওয়াতে হবে। যদি শিশুদের ঘন ঘন স্যালাইন খাওয়াতে পারে, তাহলে ভালো। কিছু কিছু খাবার রয়েছে, যেগুলো খাওয়ালে পায়খানা অনেকটা শক্ত হয়ে আসে। যেমন : কাঁচাকলা। কাঁচাকলা অনেক বেশি খাওয়ালে পায়খানাটা একটু শক্ত হয়ে আসে। নরম ভাত খাওয়াবে। আরেকটি উপাদান হলো দই। এর মধ্যে প্রোবায়োটিক বলে একটি বস্তু রয়েছে, এটিও খুব কাজে দেয়। সাধারণত প্রস্রাব ছয় ঘণ্টার মধ্যে হবে। তবে ছয় ঘণ্টার থেকে যদি দেরি করে, তাহলে বুঝতে হবে ডায়রিয়ার কারণে শিশুর পানিশূন্যতা হয়েছে। এ ছাড়া জিহ্বাটা শুকিয়ে যাবে। চামড়াটা আরো শুকিয়ে যাবে। এ রকম কিছু লক্ষণ আমরা বুঝতে পারি। পরিশেষে বলতে চাই,ডায়রিয়া একটি সাধারণ রোগ। আজকাল ডায়রিয়া বা কলেরায় মৃত্যুর হার খুবই কম। কিন্তু আক্রান্ত হলে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, কার্যক্ষমতা কমে যায়। তাই সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও উচিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং টাটকা খাবার খেতে হবে। পঁচা ও বাশি খাবার খাওয়া যাবে না। বাজারের খোলা খাবার খাওয়া যাবে না। বৃদ্ধ ও শিশুদের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে।আর চারদিকে শীতের তীব্রতার বার্তা, এই সময় নানাবিধ অসুখের প্রকোপ দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া। শিশুদের শীতকালীন ডায়রিয়ার একটা বড় অংশ রোটা ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে।আর শিশুর ডায়রিয়া হলে অনেকে খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দেন বা নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেন, যা ডায়রিয়ার সমস্যাকে তীব্র করে। অনেকে আবার ডায়রিয়া হলে বুকের দুধও বন্ধ রাখেন, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। বারবার বমি হলেও অনেকে স্যালাইন বন্ধ করে দেন, যা করা উচিত নয়। বরং বমি বন্ধ হলে বা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অল্প অল্প করে খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে। শিশু খাবার স্যালাইন যতটুকুই পান করুক না কেন, স্যালাইনের পুরো অংশ পরিমাণমতো পানির সঙ্গে মিশিয়ে সেই পানি বারবার পান করাতে হবে।তাই আসুন সবাই সচেতন হই, ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করি।
লেখক, চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
চেম্বার:-অলংকার শপিং কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম