
মোঃ শামীম মিয়া----
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জ্বালানি তেলকে বলা হয় অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’—যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে কৃষি, শিল্প, পরিবহন থেকে শুরু করে প্রতিটি সেবা খাত| কিন্তু যখন এই লাইফলাইনের প্রবাহ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন তার অভিঘাত কেবল অর্থনীতির সূচকে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সরাসরি আঘাত হানে সাধারণ মানুষের ˆদনন্দিন জীবনে| বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে উন্মোচন করেছে—যেখানে উন্নয়নের গালভরা বয়ান আর মানুষের ক্ষুধার বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে| জ্বালানি তেলের দাম বাড়া মানেই একটি সর্বগ্রাসী শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া| ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, আর সেই বাড়তি দাম শেষ পর্যন্ত বহন করে সাধারণ মানুষ| কিন্তু সমস্যাটি এখানে শেষ নয়| আমাদের দেশের বাজার কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা হলো—যে কোনো মূল্যবৃদ্ধি সুযোগসন্ধানী মহলের জন্য অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্র ˆতরি করে| ফলে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা অর্থনীতির ¯^াভাবিক নিয়মকে ছাড়িয়ে এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত শোষণে পরিণত হয়| এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী| একজন রিকশাচালক, দিনমজুর বা ¯^ল্প আয়ের কর্মজীবী মানুষ যখন বাজারে যান, তখন তিনি কেবল পণ্য কিনছেন না—তিনি বহন করছেন জ্বালানির বাড়তি দাম, পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং মধ্য¯^ত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার সম্মিলিত চাপ| তার সীমিত আয়ের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই| ফলে তাকে বাধ্য হয়ে খাদ্য তালিকা সংকুচিত করতে হয়, পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দিতে হয়| পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে| ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক| সরকারিভাবে মূল্যস্ফীতির হার যতই নিয়ন্ত্রিত বলে দেখানো হোক না কেন, বাস্তব বাজারে তার প্রভাব অনেক বেশি তীব্র| এই ব্যবধানই প্রমাণ করে—অর্থনৈতিক সূচক আর মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা এক নয়|
এখানেই আসে উন্নয়নের প্রশ্ন| একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে| কিন্তু যখন উন্নয়নের সুফল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অন্য অংশ ক্রমাগত বঞ্চিত হয়, তখন সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে| বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প অবশ্যই একটি দেশের সক্ষমতার প্রতীক, কিন্তু পেটে ক্ষুধা নিয়ে সেই উন্নয়নের সুফল অনুভব করা যায় না| আজ দেশের একটি বড় অংশের মানুষ ডিম, দুধ, মাছের মতো মৌলিক পুষ্টিকর খাবার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে—এ বাস্তবতা কোনো উন্নয়নের সাফল্যের গল্পকে ম্লান করে দেয়| জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ˆবশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট কিংবা আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি—এসব যুক্তি অবশ্যই রয়েছে| কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি কোথায় ছিল? কেন আমরা এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর এতটা নির্ভরশীল? বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের পরিকল্পনায় সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা রয়েছে? সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি কিংবা বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন—এসব খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ ও কার্যকর বাস্তবায়ন করা গেলে আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত| একইভাবে, রেলপথ আধুনিকায়ন ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত| কিন্তু নীতিনির্ধারণে এই দূরদর্শিতার ঘাটতিই আজ আমাদের সংকটকে তীব্র করেছে| অন্যদিকে, বাজার তদারকির ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে| তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যদিও সেই পণ্য আগের দামে কেনা ছিল| এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কার্যত এক ধরনের সংগঠিত অনিয়ম, যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট| মাঝে মাঝে জরিমানা বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না| বরং সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছে|
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমšি^ত, সাহসী ও বাস্তবভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ| প্রথমত, জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে—বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সহজ করতে হবে| দ্বিতীয়ত, কৃষি খাতে সরাসরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত না হয়| তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী তদারকি ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে| চতুর্থত, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, সাশ্রয়ী ও জ্বালানিসাশ্রয়ী করতে হবে| সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতিনির্ধারণে মানুষের কষ্টকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা| অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, ¯^প্ন ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম| যদি সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে| শেষে বলা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আজ কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা আমাদের উন্নয়ন দর্শনকে পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে| উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা মানুষের জীবনে ¯^স্তি বয়ে আনবে, কষ্ট নয়| এখন সময় এসেছে—উন্নয়নের অঙ্ককে মানবিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার, যাতে কোনো মা’কে সন্তানের দুধ কমাতে না হয়, কোনো বাবাকে সন্তানের ওষুধ কিনতে দ্বিধায় পড়তে না হয়| কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি তার মানুষের মুখের হাসিতেই প্রতিফলিত হয়|
মোঃ শামীম মিয়া শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ জুমারবাড়ী সাঘাটা গাইবান্ধা|
shamimmiabd94@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত