
প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১, ২০২৬, ৯:১৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫, ৭:২৫ পি.এম
নকলমুক্ত পরীক্ষার উদ্যোগ : যশোর বোর্ডে ১৪০ ভেন্যুকেন্দ্র বাতিল

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নকল ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আগামী বছর থেকে আর কোনো ভেন্যুকেন্দ্র থাকবে না। এর ফলে বোর্ডের আওতাধীন খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে বিদ্যমান ১৪০টি ভেন্যুকেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হচ্ছে। শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন নিশ্চিত করেছেন যে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং অনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ২৯৯টি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অনেক কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় পাশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবনকে ভেন্যুকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতো। কিন্তু বোর্ডের তদন্তে দেখা গেছে, এ সুযোগকে অনেক প্রতিষ্ঠান অপব্যবহার করেছে। নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া, নকলের সুযোগ করে দেওয়া এবং শিক্ষক-পর্যবেক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়ানোর অভিযোগ বহুদিন ধরেই ওঠে আসছিল। ফলে বোর্ড মনে করছে, ভেন্যুকেন্দ্র ব্যবস্থাই পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, “শিক্ষার্থীরা যখন নিজ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়, তখন অনৈতিক সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে নকল ঠেকানো সম্ভব হয় না। শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও কখনো কখনো অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃবোর্ড সমন্বয় কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সব ভেন্যুকেন্দ্র বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
শুধু ভেন্যুকেন্দ্র বাতিল নয়, কেন্দ্র নির্ধারণেও নতুন নীতি গ্রহণ করেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ড জানিয়েছে, কোনো কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কয়েকটি কঠোর শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—কেন্দ্রে ৩০০ জনের কম পরীক্ষার্থী থাকলে অনিবার্য কারণ ছাড়া সেই কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হবে না। পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো মজবুত হতে হবে এবং চারপাশে সুরক্ষিত প্রাচীর থাকতে হবে। বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হতে হবে এবং বোর্ডের অর্পিত সব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের সক্ষমতা থাকতে হবে।
বোর্ড কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এতদিন ভেন্যুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত, তাদেরকে নিকটবর্তী কোনো কেন্দ্রে যুক্ত হতে আবেদন করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আবেদন না করলে বোর্ড নিজ উদ্যোগে ভেন্যুকেন্দ্র বাতিল করে পরীক্ষার্থীদের অন্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করবে। এতে শিক্ষার্থীদের কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করতে হতে পারে, তবে বোর্ড বিশ্বাস করে, পরীক্ষার মান ও শুদ্ধতা রক্ষায় এই ত্যাগ প্রয়োজনীয়।
শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলের অনেকেই বোর্ডের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, বহু বছর ধরে ভেন্যুকেন্দ্রের কারণে পরীক্ষায় অনিয়ম বেড়ে গিয়েছিল। নকলমুক্ত পরীক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেন্দ্র সংখ্যা হ্রাসের কারণে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য দূরে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেন্যুকেন্দ্র বাতিলের এ পদক্ষেপ সঠিক হলেও এর বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ভেন্যু বাতিল করলেই হবে না, পরীক্ষার সময় সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে। প্রয়োজন হলে নতুন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। আমরা চেষ্টা করছি আসন্ন এসএসসি পরীক্ষাকে সত্যিকার অর্থেই নকলমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও প্রভাবমুক্ত করতে। সমাজের সব স্তরের সহযোগিতা পেলে আমরা নিশ্চয়ই সফল হব।”
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা এখনো কয়েক মাস দূরে। তবে এরই মধ্যে যশোর শিক্ষা বোর্ডের এই ঘোষণা পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে একে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখছেন। আর এই সিদ্ধান্ত কতটা সফল হবে, তা দেখা যাবে আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষার বাস্তব চিত্রেই।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত