
প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৪, ২০২৬, ৪:৩৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২, ২০২৫, ৬:১৭ পি.এম
নানান জটিলতার কারণে সরকারি গুদামে চাল বিক্রি করতে নারাজ খুলনার চাষীরা!

মন প্রতি পঞ্চাশ টাকা কম পেলেও নানান জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যে হাট মোকামে ধান বিক্রি করতে সুবিধা পাচ্ছে স্থানীয় কৃষকরা।
খুলনার স্থানীয় কৃষকরা গণমাধ্যমে জানিয়েছে খুলনায় সরকারিভাবে ধান ও চাল সংগ্রহের নানা শর্তের বেড়াজালে আটকে রয়েছি আমরা। ধানে ১২ শতাংশের কম আর্দ্রতা, ব্যাংক হিসাব থাকাসহ এসব শর্তকে ঝামেলা মনে করছেন তারা। ফলে সরকারি গুদামে বেশি দামে ধান বিক্রি না করে বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেক কৃষক। এতে অবশ্য নগদ টাকা পাচ্ছেন। সরকারি গুদামে বারবার ঘোরা ও বাড়তি শ্রমসহ খরচ থেকে বাঁচেন বলে দাবি তাদের।
সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে ঝামেলায় পড়তে হয় জানিয়ে পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাঠি গ্রামের সাধন কুমার দাশ বলেন, ‘আট বিঘায় বোরো মৌসুমে ১৮০-২০০ মণ ধান হয়। আমনে ১৬০ মণ হয়। হাটে নিয়ে বিক্রি করি সবসময়। সরকারি গুদামে বিক্রি করতে হলে চার-পাঁচ বার রোদে দিতে হয়। অথচ একবার-দুবার রোদে দিয়ে নিয়ে গেলেই বাজারে বিক্রি করতে পারি। সরকারি দামের চেয়ে বাজারে ৫০ টাকা মণে কম পাই। এই ৫০ টাকা বেশি পেতে নানা শর্ত মানতে হয়। রোদ বৃষ্টির সময়ে টানা রোদ পাওয়া যায় না। বিঘা প্রতি চার হাজার টাকা লাগে পানি খরচ। সরকারি বীজ ভালো। নষ্ট হয় না। বিঘায় গড়ে পাঁচ-ছয় কেজি বীজ লাগে। সরকারি বীজ ধানের কেজি ৬০ টাকা। ১২০ টাকা কেজি কোম্পানির বীজ। সরকারিভাবে শর্ত বেশি দেওয়ায় সমস্যা। ঝামেলা হয়। হাটে গেলে দাম কম হলেও সমস্যা নেই। ঝামেলা মুক্ত থাকা যায়।’
একই গ্রামের পূর্ণিমা দাশ জানান, পাঁচ-ছয় বিঘা জমিতে ভালো ধান পান। সারা বছরের খোরাকি মিটে যায়। অ্যাওসেড বীজ দেয়। তবে ধানে মাজরা পোকার সমস্যা হয়। কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ নিই।
একই গ্রামের কৃষক পরিতোষ দাশ জানিয়েছেন, এ বছর বিঘায় ২৪ মণ ধান পেয়েছেন। বাজারে বিক্রি করেছেন। ঝামেলা ও শর্তের কারণে অ্যাপের মাধ্যমে বা সরকারি গুদামে বিক্রি করতে যাননি।
চুমকি দাশ জানান, আগে ধান চাষ করে সংসার চালানো দায় ছিল। এখন উৎপাদন বেড়েছে। ফলে সংসার চালানোর পরও বিক্রি করতে পারেন। সরকারি গুদামে দাম বেশি হলেও ঝামেলা অনেক। তাই বাজারে কম দামে বিক্রি করেন। সরকারি গুদামে নিতে খরচ লাগে, শর্ত মেনে দিতে হয়। তাই বাজারে বিক্রি করে দেন। কৃষকদের মাঝে বীজ সরবরাহকারী এ্যাওসেডের কমিউনিটি মোবিলাইজার সুপ্রিয়া মণ্ডল জানান, ৩৪২ কৃষি পরিবারে সদস্য ৬৬৫ জন। মাহমুদকাঠি, রামনাথপুর, বাকা ও নোয়াকাঠি গ্রামের বাসিন্দা তারা। এওসেড ৬৭ ও ৮৯ বীজ ২৫ শতাংশ ছাড়ে দেয়। কৃষকদের পরামর্শসহ বীজ সহায়তা দেওয়া হয় সবসময়।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলায় আউশ, আমন ও বোরো চাষ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়। পাওয়া যায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৮৬০ টন চাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৭০ হাজার ১১৩ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন হয়। ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭ মেট্টিক টন চাল পাওয়া যায়। জেলায় গত ৫ বছরে ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়লেও পাইকগাছা উপজেলায় গত বছর আবাদ ও উৎপাদন কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাইকগাছায় ২১ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ৪৫৫ টন চাল। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ উপজেলায় ২৩ হাজার ৩৪৩ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়ে ৮১ হাজার ৩৮৪ মে টন চাল উৎপাদন হয়েছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বছর ৫ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ৫৭৫ হেক্টর বীজতলার মধ্যে ১০৬ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ হেক্টর জমিই পাইকগাছায়। খুলনায় ২০.৮৭০ হেক্টর ফসলের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৪৮ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সংখ্যা ১৩ হাজার ৭১ জন। এতে মোট আর্থিক ক্ষতি ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ৯৭ হাজার। দুর্যোগ এ অঞ্চলের নিত্যসঙ্গী। এসব মেনেই কৃষি আবাদ করছেন কৃষকরা।’
খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, ‘চলতি বছর খুলনায় ধান চাল সংগ্রহ ভালো হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সংগ্রহ হয়েছে। চাল সংগ্রহ হয়েছে ৮৫ শতাংশ। এখনও সময় আছে। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। গত বছর সিদ্ধ চাল ৯৩ শতাংশ, আতপ চাল ১০০ শতাংশ ও ধান ৯৮ শতাংশ অর্জন হয়েছিল। এবার ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১১৯ শতাংশ হয়ে গেছে যা সরকারের চাহিদার ক্ষেত্রে আশা অনুরূপ।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত