
প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৭, ২০২৬, ১০:৫১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ২৪, ২০২৬, ৪:০৮ পি.এম
পদ্মা সেতুর প্রভাবে কমেছে গোয়ালন্দ রুটের ট্রেন চলাচল যাত্রীদের চরম ভোগান্তি

রাজু আহমেদ, রাজবাড়ী:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে রেলওয়ের দুটি স্টেশনের মধ্যে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি দশ বছর যাবত বন্ধ রয়েছে। জনবল শূণ্যের কারণে বন্ধ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী ওই রেলস্টেশটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এদিকে চলাচলকারি ৫টি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ মোট ৪টি ট্রেন প্রত্যাহার করায় উপজেলার দৌলতদিয়ায় অবস্থিত অপর স্টেশন গোয়ালন্দ ঘাট প্রকট ট্রেনসংকটে ভুগছে। বর্তমান সেখানে বেসরকারি ভাবে পরিচালিত একটি মাত্র শাটল ট্রেন (লোকাল) দিয়ে কোন রকমে চলছে ওই স্টেশনটির কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের গণদাবী থাকা সত্ত্বেও গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে ট্রেনের সংখ্যা আজও বাড়েনি। ট্রেনের অভাবে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে সড়ক পথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন এলাকার ব্যবসায়ী সহ সাধারণ মানুষ। রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) স্টেশন অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায় গোয়ালন্দ ঘাট-খুলনা,গোয়ালন্দ ঘাট-রাজশাহী রেলপথের গোয়ালন্দ বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। প্রতিদিন ওই স্টেশন থেকে বিভিন্ন ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করতো এলাকার হাজারো মানুষ। সেখানে স্টেশন মাস্টার পদে একজন, সহকারি স্টেশন মাস্টার একজন,পয়েন্টসম্যান তিন জন এবং গেটম্যান দুই জনসহ সকল পদে প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল। পরবর্তীতে স্টেশন মাস্টারসহ সকল পদে জনবল শূণ্য হয়ে যায়। এতে রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি গত দশ বছর যাবত বন্ধ থাকায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট দেশের মধ্যে একটি পরিচিত জায়গা। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত গোয়ালন্দ বাজার টু গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইন ও স্টেশন এখন অনেকটাই মৃত। নেই আগের মতো ট্রেনের জৌলুস। যাত্রী ওঠানামার জন্য ট্রেন থামলেও বন্ধ হয়ে গেছে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনের কার্যক্রম। এই ৫ কিলোমিটার রেলপথ হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। লাইনে নেই পাথর বা খোয়া, কাঠের স্লিপারগুলোর অবস্থাও তেমন ভালো নেই। দেখলে মনে হয় এটি সচল নয়, দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত কোনো রেললাইন। শুধু মাটির ওপর নড়বড়ে নষ্ট কাঠের স্লিপারের ওপর বসানো রয়েছে রেল। এর ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সকাল-বিকেল দুটি ট্রেন হেলেদুলে তিনবার চলাচল করছে। ট্রেন যাওয়ার সময় রেল ও স্লিপারগুলো উঁচু-নিচু হয়। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজার টু গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) স্টেশনের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। এর পুরোটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। রেললাইনের সাপোর্টিং হিসাবে কাঠের স্লিপার ও রেল ছাড়া নাই আর কিছু। লাইনে নাই কোনো খোয়া বা পাথর। অনেক স্লিপার ভাঙা এবং রেলের নাট-বল্টুও ঢিলা। যার কারণে ট্রেন চলাচলের সময় স্লিপার ও রেল উঁচু-নিচু হয়। অপরদিকে দীর্ঘদিন লাইন সংস্কার বা মেরামত না করা এবং লাইনে খোয়া বা পাথর না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে রেললাইন। মাঝে মাঝে ট্রেন লাইন চ্যুতের মতো ঘটনা ঘটে এই লাইনে। স্থানীয়রা বলেন, এক সময় গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে ভারত যাওয়া যেত। সেই গোয়ালন্দ বাজার টু ঘাট স্টেশন দুইটি ঐহিত্যবাহী স্টেশন হওয়ার শর্তেও নেই কোনো উন্নয়ন। কয়েক বছর ধরে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ, কমেছে এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা। সারাদেশে রেলেরও উন্নয়ন হলেও এই ৫ কিলোমিটার রেললাইনের অবস্থা খুবই খারাপ। কোনোরকম নষ্ট-পচা কাঠের স্লিপারের ওপর বসানো রয়েছে রেল। যার কারণে এর আগে তিন-চারবার ট্রেন পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া লাইনে কোনো পাথর দেওয়া নাই। ট্রেন যাওয়া-আসা করার সময় খুব আস্তে আস্তে যায়। এর চাইতে হেঁটেও আগে যাওয়া যায়। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো রেলের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গোয়ালন্দ বাজার টু গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেললাইন ও স্টেশনের উন্নয়নে রেল কর্তৃপক্ষসহ সবার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। স্থানীয় হকাররা জানায়, রেললাইনে কোনো পাথর বা খোয়া নাই। ট্রেন যাওয়ার সময় এদিক ওদিক দোলে এবং ট্রেন খুবই আস্তে আস্তে যায়। সে সময় তারা ট্রেনে ওঠে আবার নামে। দৌলতদিয়া ঘাট স্টেশনের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ৫ থেকে ৬টি ট্রেন দৌলতদিয়া ঘাটে আসলেও এখন মাত্র দুটি ট্রেন আসে। পদ্মা সেতু হয়ে ঘাট অনেকটাই মরে গেছে। এখন আর ট্রেন কমে গেলে তাদের মতো ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। এই লাইনে কিছু মেইল ট্রেন ও আন্তনগর ট্রেন দিলে সবাই উপকৃত হবে। এদিকে উপজেলার দৌলতদিয়ায় অবস্থিত রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন। প্রতিদিন সেখানে দুটি আন্তঃনগর,একটি মেইলসহ মোট ৫টি ট্রেন বিভিন্ন রুটে নিয়মিত চলাচল করতো। পরবর্তীতে ওই স্টেশন থেকে ট্রেনের সংখ্যা সংকোচন করে সংশ্লিষ্ট রেলকর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রাজশাহী থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে নিয়মিত চলাচল করতো মধুমতি এক্সপ্রেস নামের আন্তঃনগর একটি ট্রেন। ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর ওই ট্রেনটি গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয় এখন সেটা পদ্মাসেতু হয়ে রাজশাহী-ঢাকা চলাচল করে। নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস নামের অপর একটি মেইল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করতো রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট-খুলনা রুটে। বেসরকারি ভাবে পরিচালিত ওই মেইল ট্রেনটিও গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয় ২০২৩ সালের ১ নভেম্বরে সেদিন থেকেই এই মেইল ট্রেনটি খুলনা-ঢাকা চলাচল করে পদ্মা সেতু হয়ে। এর আগে খুলনা-গোয়ালন্দ ঘাট রুটে চলাচলকারি তিতুমীর এক্সপ্রেস নামের অপর আন্তঃনগর ট্রেনটি ১৯৯৬ সালে প্রত্যাহার করে রাজশাহী-চিলাহাটি রুটে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে পার্বতীপুর থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন নিয়মিত চলাচল করতো শিলিগুড়ি নামে পরিচিত অপর একটি লোকাল ট্রেন। ইঞ্জিন ও বগি সংকটের কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালে ৫১৩ নম্বরের ওই লোকাল ট্রেনটি (শিলিগুড়ি) বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চলাচলকারি ৫টি ট্রেনের মধ্যে তিনটি প্রত্যাহার ও একটি বন্ধের কারণে রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন প্রকট ট্রেনসংকটে ধুঁকছে। বর্তমান সেখানে একটি মাত্র শাটল ট্রেন (লোকাল) চলাচল করেছে। বেসরকারি ভাবে পরিচালিত ওই শাটল টেনটি চলছে গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ স্টেশন রুটে। এদিকে গোয়ালন্দ রেলওয়ে পুলিশফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি বন্ধ হয়ে আছে। কিন্ত গেন্টম্যানের অভাবে গোয়ালন্দ পৌরশহরের ব্যাস্ততম স্টেশন সড়কে অবস্থিত রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় বেরিয়ার থাকলেও শার্টল ট্রেনটি চলাচলের সময় ওই লেভেলক্রসিংয়ে তা নামানো হয় না। এতে যে কোন সময় সেখানে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি লিখিত ভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি জানিয়েছি।এদিকে গোয়ালন্দ বাজার ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি মো.সিদ্দিক মিয়া বলেন, শিলিগুড়ি নামে পরিচিত ওই লোকাল ট্রেনটি বন্ধ থাকায় গোয়ালন্দ ঘাট-পার্বতীপুর রেলরুট এলাকার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্পআয়ের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। রেলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া মিটিয়ে তারা সড়ক পথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন। বন্ধ শিলিগুড়ি নামের লোকাল ট্টিনটি ফের চালু করার পাশাপাশি প্রত্যাহার করা আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনগুলো গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে দ্রূত ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি। গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনের হকাররা পড়েছে বিপাকে। তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আগে পাঁচ- ছয় টি ট্রেন চলাচল করার ফলে তারা অনেক বেচা কেনা করত কিন্তু এখন ট্রেন না থাকাতে তাদের আয় কমে গেছে। গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন এলাকার পত্রিকা কুতুব উদ্দিন বলেন, আমি আগে সারাদিন স্টেশনে প্রায় একশ পত্রিকা বিক্রি করতাম আর এখন ট্রেন না থাকায় আমার পত্রিকা বিক্রি অনেক গেছে। আমি আর্থিক ভাবে অনেক ক্ষতি হয়েছি আমরা চাই এই ট্রেন লাইনে আরো কিছু ট্রেন বৃদ্ধি হোক তাতে আমার খেয়ে পড়ে বাচতে পারবো। গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনের আরেক পত্রিকা বিক্রেতা সুমন বলেন যে, আমি আগে যখন পত্রিকা নিয়ে স্টেশনে যেতাম তখন সবাই পত্রিকা পেয়ে খুব খুশি হতো একটা ট্রেন আসলে আমি অগত ২০ -২৫ কপি বিক্রি করতাম, সারাদিন ট্রেনে স্টেশনে আমি ৭০-৮০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতাম। এখন পদ্মা সেতু হওয়াতে আমি স্টেশন গিয়ে ঘুরে আসি কোনদিন দুই একটা পত্রিকা বিক্রি হয় আবার কোনদিন হয়ও না। আর এখন আর আগের মতো কেউ পত্রিকা পড়তে চায় না অনেক পত্রিকা কমে গেছে আমার আমি খুব কষ্টে জীবন-যাপন করছি। আমার সরকারের কাছে একটাই চাওয়া এই লাইনে আগের ট্রেন চালু করুক যাতে আমরা ভালোভাবে জীবন-যাপন করতে পারি।গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে এক দোকানি মানিক বলেন,ট্রেন আগে কিছুক্ষন পর পর আসত অনেক গুলো ট্রেন চলতো কিন্তু এখন এই লাইনে একটির বেশি ট্রেন চলে না এর জন্য আমার দোকানের বেচা কেনা অনেক কমে গেছে বেছে থাকায় কষ্টকর হয়ে পড়ছে।গোয়ালন্দ ঘাটের বোডিং মালিকদের অবস্থা আরো নাজুক। পদ্মা সেতুর চালু হওয়ারি পর যেমন কমছে যাত্রীবাহী, পণ্য বাহী গাড়ী তেমনি ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের কাষ্টমার হয় না তারা অনেক লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছে। অনেক মালিক বোডিং বন্ধ করে দিয়েছে অতিরিক্ত লোকসানের কারনে। রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) স্টেশন মাস্টার মোসলেম উদ্দিন সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন বিভিন্ন রুটে চলাচলকারি ৫টি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ মোট ৪টি ট্রেন প্রত্যাহার করায় গুরুত্তপূর্ণ গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে প্রকট ট্রেনসংকট সৃষ্টি হয়ে আছে। বর্তমান গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ রুটে বেসরকারি ভাবে পরিচালিত একটিমাত্র শাটল ট্রেন (লোকাল) চলাচল করছে বলে জানান তিনি।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত