নিজস্ব প্রতিনিধি, রাজশাহী: রাজশাহীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) শিক্ষক অসীম কুমার ঘোষকে নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে সঙ্গে করে ‘উধাও’ হওয়ার যে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার পাশাপাশি পেশাগত সুনাম নষ্ট করতে এমন অপপ্রচার চালিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরিরও চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শনিবার রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন আইএইচটির শিক্ষক অসীম কুমার ঘোষ। নিজের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে ‘কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ধরনের সত্যতা যাচাই ছাড়াই তার ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অসীম কুমার ঘোষ জানান, গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছুটি নেন। ছুটির সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তবে ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে তাকে নিয়ে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে উধাও হয়েছেন।
অসীম কুমার ঘোষ বলেন, তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়ে কোথাও উধাও হননি। ছুটির সময়ে তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল নেই। তার মতে, দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার সুবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার যে আস্থা ও সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের অপপ্রচারের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার আগে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বরং তার ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তার সামাজিক অবস্থান, ব্যক্তিগত সম্মান এবং পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের লোকেশন ট্র্যাকিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অসীম কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, তার জানা মতে কোনো পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়নি। তাহলে দুজনের মোবাইল নম্বরের লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের বিষয়টি কীভাবে সামনে এসেছে, সেটি তার কাছে প্রশ্নের বিষয়।
তার অভিযোগ, সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর তথ্যকে ভিত্তি করে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর সঙ্গে তার ছবি যুক্ত করে প্রচার চালানোয় মানুষের মধ্যে তার সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে যে বিপুল সম্মানহানি হয়েছে, তার দায়ভার কে নেবে—এমন প্রশ্নও সংবাদ সম্মেলনে তোলেন তিনি।
অসীম কুমার ঘোষের দাবি, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল শুধু তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন অজ্ঞাত নম্বর থেকে তার মোবাইলে ফোন আসছে এবং তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব হুমকির কারণে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে জানান।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই শিক্ষক। তিনি প্রশ্ন করেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন মানুষ হওয়াই কি তার অপরাধ? একজন শিক্ষক হিসেবে তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন—এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
অসীম কুমার ঘোষ বলেন, একজন মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া শুধু তার ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না, এর প্রভাব তার পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি তথ্য মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সেটি সত্য না হলেও মানুষের মনে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা সহজে দূর করা যায় না।
তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো মহল থেকে পাওয়া তথ্যকে যাচাই না করে সংবাদ হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। কোনো অভিযোগ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি। তিনি গণমাধ্যমের কাছে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের প্রত্যাশা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের উদ্দেশেও তিনি বলেন, কোনো পোস্ট, ছবি কিংবা অভিযোগ দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার করলে তা একজন নির্দোষ মানুষের সামাজিক মর্যাদার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
নিজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে অসীম কুমার ঘোষ বলেন, তিনি কারও সঙ্গে অযথা বিরোধে যেতে চান না। কিন্তু তার সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং হুমকি দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকলে তিনি আইনগতভাবে বিষয়টির মোকাবিলা করবেন।
তিনি আরও জানান, তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রচারণা ও হুমকি বন্ধ না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানহানি এবং প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নিজের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অসীম কুমার ঘোষ তার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে দেখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোনো অসাধু মহলের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকরা গুজব কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার পরিবর্তে প্রকৃত তথ্যকে গুরুত্ব দেবেন এবং তার বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার বন্ধে সবাই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।