প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ১:৫১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১১:২৭ এ.এম

মোঃ মজনু মিয়া, গাইবান্ধা: গাইবান্ধা জেলায় অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে চলছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের দৈনন্দিন পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ক্লাসে মনোযোগ আকর্ষণ, ঝরে পড়া (ড্রপআউট) রোধ এবং শিশুদের মাঝে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার বহুমুখী লক্ষ্য নিয়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বর্তমানে জেলার দুটি প্রধান উপজেলা—গাইবান্ধা সদর ও পলাশবাড়ী-তে এই কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে চলছে। এ দুই উপজেলার মোট ৪৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ৯০% হারে মোট ৫৮,৭৩৮ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে।
উপজেলার তথ্য ও চিত্র
গাইবান্ধা সদর উপজেলা: উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ২২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন ৯০% হারে প্রায় ৩৪,৫৬৫ জন শিশু শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে।
পলাশবাড়ী উপজেলা: পলাশবাড়ী উপজেলার ২১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯০% হারে ২৪,১৭৩ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত এ খাবারের সুবিধা পাচ্ছে।
খাবার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি
খাবারের খাদ্যতালিকা: শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে বনরুটি, সিদ্ধ ডিম, কলা, দুধ এবং পুষ্টিকর বিস্কুট।
সরবরাহকারী সংস্থা ও স্কুল মাদার: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (ইএসডিও)-র ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে স্কুলে স্কুলে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। খাবার পরিবেশন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য ১৮৮ জন ‘স্কুল মাদার’ কাজ করছেন।
কমিটির তদারকি: কার্যক্রমটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্কুলে ৫ সদস্যের অধিদপ্তর অনুমোদিত খাদ্য নির্বাচন কমিটি কাজ করছে। এই কমিটিতে ৩ জন মা, ১ জন অভিভাবক সদস্য (বাবা) এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা
বেড়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: বাফিউল সিদ্দিকী জানান, “স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। পূর্বে যেখানে উপস্থিতির হার ছিল ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ, তা এখন বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।”
এনএইচ মডার্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা: নাজমা সুলতানা বলেন, “ড্রপআউট বাচ্চারা আবার স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে। এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার দ্রুতই ১০০% এ পৌঁছে যাবে।”
গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: আব্দুল হান্নান বলেন, “আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আগে অনেক শিশু খালি পেটে স্কুলে আসতো এবং ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারতো না। এখন পুষ্টিকর খাবার পেয়ে শিশুরা অনেক আনন্দিত ও মনোযোগী।”
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির জেলা ম্যানেজার আবু ওয়ালিদ জানান, নানা ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও দুর্গম চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সারা দেশে প্রতিটি উপজেলায় অবিলম্বে স্কুল ফিডিং চালু করার জোর দাবি
গাইবান্ধা সদর ও পলাশবাড়ী উপজেলায় এই কর্মসূচির চমৎকার ফলাফল দেখে জেলার অবশিষ্ট ৫টি উপজেলাসহ সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি থানায় এ কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষ্মণ রায় গাইবান্ধার বাকি ৫টি উপজেলাতেও দ্রুত এ কর্মসূচি শুরুর ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের আকুল আবেদন:
সুস্থ ও মেধাভিত্তিক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির বিকল্প নেই। অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের খাবারের চিন্তামুক্ত রেখে শিক্ষা অর্জনে উৎসাহিত করতে এটি একটি মাইলফলক উদ্যোগ। দেশের সর্বস্তরের অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষা অনুরাগী ও সচেতন মহলের আকুল দাবি—শুধু নির্দিষ্ট কিছু উপজেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে, গাইবান্ধার বাকি সব থানাসহ সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলম্বে এই স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হোক। এতে করে সারা দেশের একটি শিশুও পুষ্টিহীনতায় ভুগবে না এবং ঝরে পড়া বন্ধ হয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ সাফল্য অর্জিত হবে।