এম.জে.এ মামুন:
আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের অবদান, অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures’। বাংলায় যার ভাবার্থ—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ৬০ বছর’।
২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ বছর শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে ১৯৬৬ সালে গৃহীত ILO/UNESCO Recommendation concerning the Status of Teachers-এর ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ওই আন্তর্জাতিক দলিলে শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব, পেশাগত প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, চাকরির শর্ত, কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষাদান-শেখানোর মানদণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
যেভাবে শুরু বিশ্ব শিক্ষক দিবস
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের পেছনে রয়েছে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। UNESCO-এর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ৫ অক্টোবরকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ হলো ১৯৬৬ সালের ওই ঐতিহাসিক ILO/UNESCO সুপারিশ গ্রহণের দিনটিকে স্মরণ করা।
দিবসটির মূল লক্ষ্য শুধু শিক্ষকদের সম্মান জানানো নয়; বরং শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতের গুরুত্ব নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, বাস্তুচ্যুতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার মতো বিষয়গুলো শিক্ষকদের দায়িত্বকে আরও জটিল করে তুলছে।
UNESCO বলছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত স্বীকৃতি, পেশাগত স্বাধীনতা, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ, পর্যাপ্ত সহায়তা ও অনুকূল কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন ও কর্মপরিবেশের বিষয়গুলোও শিক্ষকতার পেশার আকর্ষণ ও স্থায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমান শিক্ষক ঘাটতি পূরণ করতে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষক প্রয়োজন হবে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করলে প্রয়োজন আরও প্রায় ৬০ লাখ বাড়বে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক দিবস
বাংলাদেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে পালনের উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে আরও জোরদার হয়েছে। ২০২২ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও UNESCO-এর সহযোগিতায় দেশব্যাপী শিক্ষক দিবস উদযাপনের মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার হয়।
এরপর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মন্ত্রিসভা প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বাংলাদেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে দিনটি জাতীয় বার্ষিক ক্যালেন্ডারে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থান পায়। ২০২৪ সালে এ বিষয়ে উদযাপন নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়।
২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। চলতি ২০২৬ সালে শিক্ষক সম্মাননার পরিধি আরও বাড়িয়ে ১০০ জন শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, কৃষি, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গুণী শিক্ষকদের বাছাই করা হয়েছে।
শুধু সম্মান নয়, প্রয়োজন মর্যাদা ও অধিকার
শিক্ষককে বলা হয় জাতি গঠনের কারিগর। কিন্তু শুধু এই উপাধি দিয়ে শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয় না; শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
UNESCO-এর ২০২৬ সালের বার্তায়ও শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পেশাগত ও বস্তুগত অবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, শিক্ষকদের শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাজ গঠন কঠিন।
ভবিষ্যতের শিক্ষা, শিক্ষকের হাতেই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, একজন শিক্ষার্থীর মন বুঝে তাকে অনুপ্রাণিত করা, মূল্যবোধ শেখানো, নৈতিকতা ও মানবিকতা গড়ে তোলা এবং সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা এখনও অপরিসীম।
তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল ফুল, শুভেচ্ছা ও আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। এটি শিক্ষকদের অবদানকে নতুন করে মূল্যায়ন করার এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার দিন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল বার্তাই হলো শিক্ষককে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা; শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
প্রধান কার্যালয়: ৫০/এফ, ইনার সার্কুলার (ভিআইপি) রোড, নয়াপল্টন, পল্টন মডেল থানা, ঢাকা-১০০০।
হটলাইন: 09643-230220, মুঠোফোন: 01915-708187, মেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@Copyright & reserved by NAGORIK BHABNA