প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৬:৩৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ১৮, ২০২৬, ৯:৩৬ এ.এম

রাসেল রানা, রংপুর: ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ সকাল ১০টায় রংপুর পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জনাব মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) জনাব নরেশ চাকমা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জনাব তোফায়েল আহমেদ, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) জনাব সনাতন চক্রবর্তী, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) জনাব মারুফ আহমেদ এবং অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম, ট্রাফিক) জনাব শরিফুল আলমসহ আরপিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যবৃন্দ।
সভায় পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ, পেশাগত দায়িত্ব পালনে সততা ও নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, জনবান্ধব পুলিশিং, স্বাস্থ্য সচেতনতা, অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পেশাদারিত্ব ও জনবান্ধব পুলিশিং
পুলিশ কমিশনার বলেন, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করতে প্রত্যেক সদস্যকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল, মানবিক ও পেশাদার আচরণ করতে হবে। একজন পুলিশ সদস্যের কথাবার্তা, আচরণ, চলাফেরা ও দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্বের প্রতিফলন থাকতে হবে। জনগণ যেন একজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যকে দেশ ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে সম্মানের চোখে দেখে, সে লক্ষ্যেই সবাইকে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অশোভন আচরণ বা অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা যাবে না। আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক ও ভদ্র আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা ও সম্পৃক্ততা জোরদারের মাধ্যমেই জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সদস্যদের কল্যাণ ও মতামতের গুরুত্ব
পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ ও কল্যাণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জুনিয়র সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাঁদের সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট, ক্ষোভ বা অভিযোগ প্রকাশের যথাযথ সুযোগ দিতে হবে এবং যৌক্তিক বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বেনামী অভিযোগ, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয় বা অপপ্রচারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। কোনো অভিযোগ বা সমস্যা থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে উপস্থাপনের জন্য সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অনলাইন জুয়া পরিহার
পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, সুস্বাস্থ্য একজন মানুষের অন্যতম বড় সম্পদ। নিয়মিত পিটি-প্যারেড বা খেলাধুলার সুযোগ সবসময় না থাকলেও প্রত্যেক সদস্যকে নিজ উদ্যোগে শরীরচর্চা, হাঁটাচলা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। একই সঙ্গে সব ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার করে সুস্থ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, কোনো সদস্য অনলাইন জুয়া, অনৈতিক লেনদেন কিংবা অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হবেন না। এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তি, পরিবার ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরকারি নির্দেশনা ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই ছাড়া নেতিবাচক, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি বাংলাদেশ পুলিশ ও আরপিএমপির অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত জনকল্যাণমূলক ও ইতিবাচক কার্যক্রম প্রচারে সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
উত্তম কাজের স্বীকৃতি ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ
পুলিশ সদস্যদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে পুলিশ কমিশনার বলেন, দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও নিষ্ঠার জন্য সদস্যদের পুরস্কার, প্রশংসাপত্র ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। উত্তম কাজের স্বীকৃতি সদস্যদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত জীবনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাসেবা সহজতর করা এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নিজস্ব পুলিশ লাইন্স স্থাপনের উদ্যোগ
আরপিএমপির নিজস্ব পুলিশ লাইন্স স্থাপনের অগ্রগতি তুলে ধরে পুলিশ কমিশনার জানান, সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ১০ একর জায়গা পাওয়া গেছে। সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে বর্তমান ভাড়াকৃত স্থান থেকে নিজস্ব পুলিশ লাইন্সে দ্রুত স্থানান্তরের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে দায়িত্বশীলতার আহ্বান
পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেওয়া, পরিবারের প্রতি যত্নশীল থাকা এবং ব্যক্তিগত বিরোধে সংযত থাকা প্রয়োজন। জমিজমা বা পারিবারিক কোনো বিরোধে নিজেরা সংঘাতে না জড়িয়ে আইনানুগ পদ্ধতিতে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ের দায়িত্বশীল আচরণই ভবিষ্যৎ পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। তাই প্রত্যেক সদস্যকে নিজের আচরণ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
বিদায়ী কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা
সভায় বিদায়ী কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জানানো হয়। রংপুর জেলা পুলিশে বদলির আদেশ প্রাপ্ত জনাব মোঃ শরিফুল আলম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও ট্রাফিক), এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে বদলির আদেশ প্রাপ্ত জনাব মোঃ নাজির হোসেন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (ফোর্স ও প্যাট্রোল)-কে শুভকামনা জানানো হয়।
এছাড়া চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা জনাব মোঃ রবিউল হাসান, সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতয়ালী জোন)-কে অবসরোত্তর জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়ে বিদায়ী সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
সভায় পুলিশ কমিশনার বিদায়ী কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্মস্থলের সফলতা কামনা করেন।
সভা শেষে পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, মানবিক মূল্যবোধ ও জনসেবার মান আরও উন্নত করার মাধ্যমে আরপিএমপির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস সুদৃঢ় করার আহ্বান জানানো হয়।