প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১, ২০২৬, ৬:০০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ৬, ২০২৫, ৫:৩৪ পি.এম

যশোরের রাজনীতিতে যে কয়েকজন মানুষ সততা, নীতিবোধ, সংগ্রাম ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অ্যাডভোকেট পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ছিলেন অন্যতম। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য এই বর্ষীয়ান নেতার জীবনাবসান ঘটেছে বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) ভোর সাড়ে পাঁচটায়। শহরের বেজপাড়ার ভাড়া বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের স্রোত নেমে এসেছে। যশোরের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নয়—একজন নীতিনিষ্ঠ মানুষ, বীর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং শান্ত–মননের শিক্ষক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ১৯৪০ সালের ১ মার্চ মণিরামপুর উপজেলার পাড়ালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সুধীর কুমার ভট্টাচার্য্য এবং মাতা ঊষা রানী ভট্টাচার্য্য—উভয়ের পরিবারই ছিল সংস্কৃতিবান, ধর্ম–নিরপেক্ষতা ও শিক্ষার চর্চায় বিশ্বাসী। সাত ভাই–বোনের জ্যেষ্ঠ ছিলেন তিনি। বড় বোন সবিতা বর্তমানে ভারতের বিহারে বসবাস করেন। মেজ বোন কবিতা প্রয়াত হয়েছেন বহু বছর আগে। ছোট বোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক পরিতোষ সরকারের স্ত্রী; বর্তমানে দু’জনে ঢাকায় বসবাস করছেন। ভাইদের মধ্যে স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্য ছিলেন সাবেক মন্ত্রী, অরুণ কুমার ভট্টাচার্য্য ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সমাজসেবক। ছোট ভাই বরুণ ভট্টাচার্য্য গ্রামের বাড়িতে কৃষি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
শৈশব থেকেই পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ছিলেন মেধাবী ও চঞ্চল। মণিরামপুরে মানসম্মত বিদ্যালয় না থাকায় তাঁকে যশোরে এসে পড়াশোনা করতে হয়। ভর্তি হন খাজুরা এম.এন. মিত্র স্কুলে এবং ১৯৫৬ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে আইএ ও বিএ সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বিজয়ী হন। তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে ওঠে এই সময়েই। তবে পারিবারিক সংকট, বিশেষ করে পিতার মৃত্যুর কারণে পড়াশোনার কিছু সময় ব্যাঘাত ঘটে। পরিবারের দায়ভার কাঁধে নিয়ে তিনি আবারও পড়াশোনায় ফেরেন এবং ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬১ সালে মশিয়াহাটী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা ছিল তাঁর নেশা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ। সাত বছর সেখানে শিক্ষকতা শেষে ১৯৬৮ সালে যোগ দেন মণিরামপুর কলেজে। মাত্র দুই বছরের মাথায় উপাধ্যক্ষ হিসেবে পদোন্নতি পান এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় স্থানীয় সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠেন।
১৯৬৬ সাল পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্যের রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোড়ানোর বছর। এই বছর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। শুরু করেন ইউনিয়ন–থেকে–থানা পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের কাজ। তখন ছয় দফা আন্দোলন তীব্র হয় এবং তিনি তাঁর সহযোদ্ধা ডা. নওশের আলীর সঙ্গে ছুটে বেড়ান গ্রাম–গঞ্জে। ছয় দফা, এগারো দফা, মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই তিনি জনগণের সামনে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর বক্তৃতায় ছিল দৃঢ়তা, যুক্তি, এবং অসাধারণ স্বরনিয়ন্ত্রণ। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মুখ।
১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যশোর সফর করে মণিরামপুরে গভীর রাতে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। সেই জনসভার দায়িত্ব পড়ে পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্যের ওপর। তিনি দক্ষতার সঙ্গে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। বঙ্গবন্ধুর চোখে পড়ে যায় তাঁর বাগ্মিতা, নেতৃত্বগুণ এবং শালীনতার সমন্বয়। বক্তৃতা শেষে বঙ্গবন্ধু তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “তোর সাথে আবার দেখা হবে”—যা পরে সত্যি হয়েছিল ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে।
১৯৭১ সালে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার তালিকা করে। মণিরামপুর থানায় খবর আসে—ডা. নওশের আলী ও পীযুষ ভট্টাচার্য্যকে ক্যান্টনমেন্টে পাঠাতে হবে। কিন্তু থানার ওসি তাঁদের জীবন বাঁচাতে গোপনে একটি ট্রাকে তুলেভারতের দিকে পাঠিয়ে দেন। তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত—তাঁদের পরবর্তী জীবন ও দেশের ভবিষ্যৎ অবদানকে রক্ষা করে।
ভারতে পৌঁছে প্রথমে কলকাতায় অবস্থান নেন পীযুষ কান্তি। পরে যান হাবড়ার বাণীপুর শরণার্থী শিবিরে। সেখানে তাঁকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থী শিশুদের জন্য তিনটি স্কুল গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি শিক্ষকদের নিয়োগ, পাঠ্যসূচি, বেতন, ক্লাস ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একাই সামলান। তাঁর শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা এই শিবিরে হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁকে স্মরণ করে মনোনয়ন চাইলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেন মণিরামপুর–কেশবপুর আসন থেকে আরও তিনজন প্রার্থী—সুবোধ মিত্র, এড. নুরুল ইসলাম ও আব্দুল হালিম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পান পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসই তাঁর প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৩ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন প্রতিনিধি দলের প্রধান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, ফজলুল হক মনি, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা এবং সাংবাদিক বজলুর রহমান। তিনি মস্কো পার্লামেন্টে “Independence and Economic Development” শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা–উত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও উন্নয়ন রূপরেখা তুলে ধরেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড পুরো রাজনৈতিক পরিবেশকে ওলট–পালট করে দেয়। খন্দকার মোশতাক আহমেদ তাঁকে ঢাকায় ডেকে সংসদে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য দৃঢ়ভাবে সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুহীন সংসদে যোগ দেওয়া মানে জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। পরে মোশতাক তাঁকে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি দলের সঙ্গে ভারত সফরের দায়িত্ব দিতে চান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি বিশেষ চিঠি পৌঁছে দিতে বলেন—যেখানে মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যায় নিজের দায় অস্বীকার করেন। পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সেই চিঠি নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সেদিনই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু সালেহ তোতার মোটরসাইকেলে করে গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। তাঁর পরিবারকেও বেনাপোল থানার ওসি নিরাপদে ভারতে পাঠিয়ে দেয়।
১৯৭৬ সালে দিল্লীতে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। শেখ হাসিনা তাঁকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন—পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরে না আসতে। তিনি সেই নির্দেশ মেনে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেন। দেশে ফিরে যশোরে পুলিশের নজরদারিতে পড়লে আবার ঢাকায় চলে যান। রাজনৈতিক হয়রানি তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পেলেও ব্যাপক ভোট কারচুপির কারণে পরাজিত হন। সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁকে এরশাদ সরকারের দলে যোগ দিতে আহ্বান জানান। শুধু তা-ই নয়—স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ, প্রতিরক্ষা বাদে যে কোনও মন্ত্রণালয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন। পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য সোজাসাপ্টা ভাষায় জানিয়ে দেন—বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মানুষের আস্থা বিকিয়ে তিনি কখনো ক্ষমতা গ্রহণ করবেন না। তাঁর এই সিদ্ধান্ত মানুষকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
স্বাধীনতার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল উপদেষ্টা পর্যায়ে—উদীচী, সুরধুনী, পুনশ্চসহ যশোরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তিনি দিকনির্দেশনা দিতেন।
শিক্ষা খাতে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। কেশবপুরে ১২টি এবং মণিরামপুরে ২৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। শিক্ষক নিয়োগ থেকে পরিচালনা—সবই নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাঁর গ্রামের স্কুল গোপালপুর স্কুলের বিজ্ঞানাগার আধুনিকীকরণে এবং মণিরামপুর কলেজের ল্যাব সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অর্থ সহায়তা দেন। একই সঙ্গে মণিরামপুরে হাসপাতাল স্থাপন, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ চালু—এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।
জীবনের শেষ বায়নব্বই বছর তিনি কাটিয়েছেন একেবারে সাধারণ জীবনযাপনে। বেজপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী মনিকা ভট্টাচার্য্যকে নিয়ে থাকতেন। চার সন্তান—বড় ছেলে বাবলু ভট্টাচার্য্য চলচ্চিত্র শিল্পে কর্মরত; বড় মেয়ে তপতী যশোরের পরিচিত আবৃত্তিশিল্পী, বর্তমানে কলকাতায়; ছোট ছেলে পার্থ দেশে–বিদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত; ছোট মেয়ে তাপসী সুইডেনে বসবাস করেন। সন্তানদের কাউকেই তিনি কখনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের পথে যেতে দেননি—নিজের জীবনদর্শন তাঁদের ওপরও প্রয়োগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় তিনি শান্তভাবে পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যু যশোরের রাজনৈতিক অঙ্গনকে শূন্য করে দিয়েছে। মানুষের মাঝে তাঁর সম্পর্কে সর্বজনীন মূল্যায়ন—“সততা যার প্রাপ্তি, আদর্শ যার পরিচয়”— এই বাক্য যেন তাঁর জীবনকেই সংক্ষেপে তুলে ধরে। পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন নীতি, আদর্শ, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমের জীবন্ত অভিধান। তাঁর মতো মানুষ রাজনীতিতে বিরল হয়ে উঠছে দিন দিন। অথচ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যেতে দরকার ঠিক তাঁর মতোন নীতির দীপ্তিতে উজ্জ্বল মানুষ।
জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে সততার সৌরভ ছড়িয়ে দেওয়া এক নির্ভীক নেতার নামে। যশোরের রাজনীতি বহু সময় তাঁর মতো মানুষের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।