প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ৬:১২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ২২, ২০২৬, ১১:৫৭ এ.এম
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী : রাজশাহী নগরীতে সরকারি রাস্তা দখল করে নির্মিত একটি বহুতল মার্কেটকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আজও সেটি বহাল তবিয়তে রয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান আওয়াল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর একাধিক মামলার মুখে পড়ে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও অবৈধভাবে নির্মিত এই মার্কেট থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেববাজার এলাকায় অবস্থিত ‘বৈশাখী মার্কেট’ নামের এই বহুতল বিপণি বিতানটি নির্মাণ করা হয় সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে দোকান বরাদ্দ ও ভাড়া আদায় সম্পূর্ণভাবে শামসুজ্জামান আওয়ালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জানা যায়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচিত আওয়াল কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই ২০১২ সালে এই মার্কেট নির্মাণের কাজ পান। লিটনের প্রথম মেয়াদকালে কাজ শেষ না হলেও ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। শর্ত ছিল, আগে থেকে সেখানে ব্যবসা করা দোকানিরা বরাদ্দে অগ্রাধিকার পাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় ওই ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
এ বিষয়ে ২০১৩ সালের ২৭ জুন রাজশাহীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, সাহেববাজার কাঁচাবাজারে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত সরকারি রাস্তা দখল করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মার্কেট নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ৫৯৯৬ নম্বর দাগে মার্কেট নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ৫৯৪৩ নম্বর দাগের সরকারি জমিও কোনো ধরনের অধিগ্রহণ বা বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা ছাড়াই মার্কেটের আওতায় আনা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, পুরো মার্কেট নির্মাণে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) কাছ থেকে কোনো নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং সরকারি রাস্তা বন্ধেরও কোনো বৈধ অনুমতি ছিল না। মামলায় বাদী হিসেবে রফিকুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম ও সালাহউদ্দিন তৎকালীন মেয়র, সিটি কর্পোরেশনের সচিব, আরডিএ ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শামসুজ্জামান আওয়ালকে বিবাদী করেন।
বাদীদের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলেও তারা মামলা প্রত্যাহার করেননি। তাদের দাবি, তৎকালীন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এবং মেয়রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। এর ফলে সরকারি রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং নগরবাসীকে সবজিবাজারে যাতায়াতের জন্য বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আলী জানান, মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। আগামী মার্চ মাসে পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত আছে।
এদিকে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শামসুজ্জামান আওয়াল রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় আত্মগোপনে থাকলেও মার্কেটের দৈনন্দিন কার্যক্রম তার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে তার ভাই রুবেল মার্কেটের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১ সালে মার্কেটের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হলেও অধিকাংশ অংশ এখনও ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রুবেল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা আপাতত কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। তারা আরও জানান, আত্মগোপনে থাকার পরও আওয়াল একাধিকবার গোপনে রাজশাহী এসেছেন এবং সম্প্রতি কয়েকজন ব্যবসায়ী ঢাকায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে তিনি পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শুধু বৈশাখী মার্কেট নয়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অধীনে আরও অন্তত চারটি বহুতল মার্কেট নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শামসুজ্জামান আওয়ালের বিরুদ্ধে। একটি মার্কেটে দোকান বরাদ্দের জন্য টাকা দিয়েও এক দশক ধরে দোকান বুঝে পাননি ব্যবসায়ীরা। আবার একটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি। এছাড়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শামসুজ্জামান আওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার ভাই রুবেল দাবি করেন, তিনি আওয়ালের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, মার্কেট নির্মাণ ও পরিচালনার সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।