
মোঃ শামীম মিয়া----
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা—সংবিধানসম্মতভাবে যা একটি মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন হওয়ার কথা—আজ ক্রমশ এক জটিল বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়ছে| গ্রাম থেকে শহর, উপজেলা থেকে জেলা—সবখানেই যেন এক অদৃশ্য জাল বিস্তৃত হয়েছে, যার নাম ‘রেফারেল সিন্ডিকেট’ এবং ‘প্রেসক্রিপশন বাণিজ্য’| এই জালের ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ, অথচ নীরব দর্শকের ভূমিকায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বড় অংশ| একজন দরিদ্র কৃষক যখন তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান, তার চোখে থাকে শেষ আশার আলো| কিন্তু চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করার পরই সেই আলো অনেক সময় নিভে যায় একটি পরিচিত বাক্যে—“এখানে হবে না, জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান” কিংবা “অমুক ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা পাবেন|” প্রশ্ন হলো, এই ‘হবে না’-র পেছনে কি সত্যিই চিকিৎসাগত সীমাবদ্ধতা কাজ করে, নাকি এটি একটি পরিকল্পিত রেফারেল চক্রের অংশ? বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের অনেক সরকারি হাসপাতাল ধীরে ধীরে চিকিৎসার কেন্দ্র থেকে ‘রেফারেল স্টেশন’-এ রূপান্তরিত হচ্ছে| এখানে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার চেয়ে রোগীকে অন্যত্র পাঠানোই যেন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে| অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসির সঙ্গে একাংশ চিকিৎসকের অঘোষিত সমঝোতা রয়েছে| প্রতিটি ‘রেফার’-এর পেছনে থাকে কমিশন, আর সেই কমিশনের বোঝা গিয়ে পড়ে রোগীর কাঁধে|
এই চিত্রটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণের নয়, এটি ˆনতিকতার চরম অবক্ষয়েরও প্রতিফলন| চিকিৎসা পেশা যেখানে মানবসেবার প্রতীক, সেখানে যদি রোগী হয়ে ওঠে ‘লেনদেনের পণ্য’, তাহলে সেই সমাজের মানবিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য|
আরও উদ্বেগজনক হলো প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের বিস্তার| চিকিৎসকের হাতে লেখা একটি প্রেসক্রিপশন, যা হওয়ার কথা রোগমুক্তির নির্দেশনা, সেটিই অনেক সময় হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপনপত্র| রোগীকে এমন সব ব্র্যান্ডের ওষুধ দেওয়া হয়, যা আশপাশের সাধারণ ফার্মেসিতে পাওয়া যায় না| বাধ্য হয়ে রোগীকে যেতে হয় হাসপাতালের আশেপাশের নির্দিষ্ট দোকানে—যেখানে সেই ওষুধ ‘অলৌকিকভাবে’ মজুত থাকে| এখানেই ˆতরি হয় একচেটিয়া বাজার| রোগী জানেন না, একই জেনেরিক ওষুধ অন্য কোম্পানির কাছ থেকে অনেক কম দামে পাওয়া সম্ভব| কিন্তু তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে| কারণ, এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কমিশন, উপঢৌকন, বিদেশ ভ্রমণ—আরও নানা প্রলোভন|
ফলাফল কী ? একজন দিনমজুর, যিনি সরকারি হাসপাতালে আসেন সাশ্রয়ী চিকিৎসার আশায়, তিনি শেষ পর্যন্ত এমন একটি খরচের ফাঁদে পড়েন, যেখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব| চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাকে জমি বিক্রি করতে হয়, ঋণের বোঝা বইতে হয়, কখনো কখনো চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে যেতে হয় মৃত্যুর মুখে| এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তার অপব্যবহার| কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে অযত্নে, অপারেটর নেই বা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয় না| কেন? কারণ, রোগী যদি বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করেন, তাহলে সেই ‘চেইন’-এর সবাই লাভবান হন| চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিও একটি বড় সমস্যা| অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে তারা ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট ক্লিনিকে| ফলে সরকারি হাসপাতাল হয়ে পড়ে জনবল সংকটে জর্জরিত, আর রোগীরা হয়ে ওঠেন অবহেলার শিকার| এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর জ্বলন্ত উদাহরণ| একজন চিকিৎসক যখন একইসঙ্গে সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালন করেন এবং পাশের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখেন, তখন তার সিদ্ধান্ত কতটা নিরপেক্ষ থাকবে—সেটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ| তবে সবচেয়ে করুণ দিকটি হলো—এই সবকিছুর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ| তারা জানেন না কোথায় অভিযোগ করবেন, কিভাবে প্রতিকার পাবেন| তাদের কণ্ঠ¯^র অনেক সময় পৌঁছায় না নীতিনির্ধারকদের কানে| ফলে এই অন্যায়গুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে| এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব—তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সামাজিক সচেতনতা| প্রথমত, প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক নাম বাধ্যতামূলক করতে হবে| এতে রোগী স্বাধীনভাবে যেকোনো ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে পারবেন এবং একচেটিয়া ব্যবসা ভেঙে পড়বে| দ্বিতীয়ত, রেফারেল নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে| কেন রোগীকে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে, তার লিখিত ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা থাকতে হবে| তৃতীয়ত, হাসপাতাল ও সংলগ্ন ফার্মেসির ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে, যাতে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে না পারে| চতুর্থত, চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে| পঞ্চমত, রোগীদের জন্য সহজ ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন|
সবশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—চিকিৎসা কোনো পণ্য নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার| এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর তা বাস্তবায়ন করা চিকিৎসকদের ˆনতিক কর্তব্য| আজ সময় এসেছে এই অন্ধকার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার| আমরা কি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই, যেখানে রোগী কেবল একটি ‘কেস’ বা ‘কমিশন’-এর সংখ্যা? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ তার প্রাপ্য সম্মান ও সেবা পাবে? যদি আমরা দ্বিতীয়টি চাই, তবে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে| নতুবা এই নিঃশব্দ কান্না একদিন উচ্চস্বারে প্রতিবাদে পরিণত হবে—আর তখন হয়তো সংশোধনের সময় থাকবে না|
স্বাস্থ্য খাতের এই অমানবিক বাণিজ্য বন্ধ হোক—মানুষ বাঁচুক, মানবতা জাগুক|
---মোঃ শামীম মিয়া, সাঘাটা, গাইবান্ধা|
shamimmiabd94@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত