
মোঃ শামীম মিয়া :--
সমসাময়িক সমাজে তরুণদের এক বড় অংশের মধ্যে গতির প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে| “ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস” শব্দবন্ধটি আজ শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অনেকের কাছে এক ধরনের জীবনধারা বা ‘স্ট্যাটাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে| বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা, বন্ধুদের সামনে নিজেকে ‘সাহসী’ বা ‘দুর্দান্ত’ প্রমাণ করার চেষ্টা—এসব মিলিয়ে সড়কে বেপরোয়া গতির এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি ˆতরি হয়েছে| এই প্রবণতা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর|
The Fast and the Furious চলচ্চিত্র সিরিজটি নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে| সেখানে উচ্চগতির গাড়ি, চমকপ্রদ স্টান্ট এবং রোমাঞ্চকর দৃশ্য দর্শকদের আকৃষ্ট করে| চলচ্চিত্রের নায়করা প্রায় অসম্ভব পরিস্থিতিতেও গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়, যা দর্শকদের মনে এক ধরনের রোমাঞ্চ ও অনুকরণের ইচ্ছা সৃষ্টি করে| কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন| সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত| বাস্তব সড়কে নেই সেই নিরাপত্তা, নেই কোনো পূর্বপ্রস্তুতি—আছে কেবল অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি|
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা| জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের শিথিল প্রয়োগ—সবকিছু মিলিয়ে সড়কগুলো ইতোমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ| এর মধ্যে যখন যুক্ত হয় অতিরিক্ত গতি ও প্রতিযোগিতামূলক ড্রাইভিং, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে| সড়কে অনেক চালকই নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের জন্য অন্যদের সঙ্গে ‘রেস’ করার প্রবণতা দেখায়, যা এক ধরনের আত্মঘাতী মনোভাবের প্রতিফলন|
তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে|
ˆকশোর ও তারুণ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ¯^াভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে| এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় সামাজিক ¯^ীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে| অনেকেই মনে করে, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো মানেই সাহসিকতা বা আধুনিকতার পরিচয়| কিন্তু প্রকৃত সাহসিকতা হলো নিজের এবং অন্যের জীবনের মূল্য বোঝা| দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানোই প্রকৃত দক্ষতার পরিচায়ক|
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলেছে| ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়ার আশায় অনেকেই বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করছে| এতে তারা সাময়িক জনপ্রিয়তা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে দেয়| অন্য তরুণরা সেই ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয় এবং একই ধরনের কাজ করার চেষ্টা করে| ফলে একটি নেতিবাচক চক্র ˆতরি হয়, যা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে| এই প্রেক্ষাপটে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়| স্পিড লিমিট অমান্য করা, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো—এসব অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে| একইসঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সড়ক নজরদারি জোরদার করা যেতে পারে, যেমন স্পিড ক্যামেরা বা ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম|
তবে কেবল আইন প্রয়োগ করেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়| প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিকতার পরিবর্তন| পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে| স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা এ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে| পাশাপাশি গণমাধ্যমের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি| গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ| চলচ্চিত্র, নাটক কিংবা অনলাইন কনটেন্টে যদি বেপরোয়া ড্রাইভিংকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তা তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে| তাই কনটেন্ট নির্মাতাদের উচিত দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা এবং বিনোদনের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতার বার্তা প্রদান করা|
অবকাঠামোগত উন্নয়নও এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক| উন্নতমানের সড়ক, সঠিক ট্রাফিক সিগন্যাল, পর্যাপ্ত ফুটপাত এবং কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সড়কের চাপ কমানো সম্ভব| একইসঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে, যাতে তারা কেবল গাড়ি চালানো নয়, বরং নিরাপদে চালানোর কৌশলও শিখতে পারে| সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জীবনের মূল্য উপলব্ধি করা| একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়, সমাজে সৃষ্টি করে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব| তাই সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক ও ˆনতিক দায়িত্ব|
পরিশেষে বলা যায়, “ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস” যদি কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা উপভোগ্য| কিন্তু যখন তা বাস্তব জীবনে অনুকরণ করা হয়, তখন এটি হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ বিপদের কারণ| আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে, নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে এবং অন্যদেরও সচেতন করতে হবে| গতি নয়, নিরাপত্তাই হোক আমাদের অগ্রাধিকার| কারণ জীবন একবারই পাওয়া যায়—এটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনো বীরত্ব নয়, বরং চরম অবিবেচনা|
মোঃ শামীম মিয়া,জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা
shamimmiabd94@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত