
জসিম মুহাম্মদ রুশনী: গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সংবাদপত্র হচ্ছে গণমাধ্যমের সবচেয়ে প্রাচীন ও শক্তিশালী বিভাগ, এটিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণও বলা চলে। তাই সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী হচ্ছে রাষ্ট্রের তৃতীয় চোখ। সঙ্গতঃ কারণেই জাতীয় জীবনের চড়াই -উৎরাইয়ে এই সাংবাদিক শ্রেণির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র, সরকার ও জাতীয় জীবনের সামগ্রিক অনুষঙ্গের সাথে সাংবাদিক সমাজের সম্পর্ক অনিবার্য। কখনও শাসকদের রক্তচক্ষু আবার কখনো শাসিত জনগোষ্ঠীর একাংশের চক্ষুশূল সয়েই এই মহান পেশাটিকে চালিয়ে নিতে হয়। কিন্তু যারা গণমাধ্যমের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকে শাসকগোষ্ঠীর স্তাবক হিসেবেই তুলে ধরে তাদেরকে কারও রক্তচক্ষু সইতে হয় না, অবশ্য বৃহত্তর শোষিত জনগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হতে হয়। তারপরও এই শ্রেণির সংবাদকর্মীরা সবসময় সুসময়ের মধুকর হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে।
অতি সম্প্রতি বাঙলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক এক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে শাসনকার্যে নিয়োজিত থাকা দলটির রাজনৈতিক অবিমৃশ্যতা ও ভয়তান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দরুন একটি চাপা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আসছিলো বহুদিন ধরে। তার চূড়ান্ত বিস্ফোরণে দলটি তার সাজানো সংসার ফেলে ক্ষমতা ও দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ এটাকে অভূতপূর্ব বিপ্লব হিসেবেও চিহ্নিত করছে৷
এই যে বিশাল আঙ্গিকে বিপুল জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেলো এর পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকা কতোটুকু তা মূল্যায়নের অবকাশ রাখে। দিনের পর দিন জমতে থাকা বিন্দু বিন্দু ক্ষোভকে চূড়ান্ত বিক্ষোভে পরিণত করার ক্ষেত্রে সাংবাদিক সমাজের বিরাট অবদান রয়েছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এই পেশার কিছু আদর্শবাদী মানুষ প্রতিটা অনিয়ম দুর্নীতিকে জাতির সামনে তুলে ধরেছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতিকে সোচ্চার করে তোলার ক্ষেত্রে অতিঅবশ্যই নির্ভীক সাংবাদিকদের প্রধান ভূমিকা রয়েছে। যাঁরা এই মহান দায়িত্বশীলতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় সমুন্নত রাখতে ব্রতী ছিলেন তাঁদেরকেও রাষ্ট্রশক্তির সেই সীমাহীন নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। এ কথাটি অস্বীকার করার সুযোগই নেই।
রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকরা এখন কেমন আছেন? কোনও আমলেই কি তাঁরা আসলে ভালো থাকেন? প্রশ্নগুলো সহজ কিন্তু উত্তর সহজ নয়। এর উত্তরের মাঝে লুকিয়ে আছে অপ্রিয় বাস্তবতার নিরেট সমাজচিত্র।
সাংবাদিক সমাজের মধ্যে কারা সবসময় ভালো থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরটা সহজ বটে তবে সাবলীল নয়। প্রতিটি শাসনামলে গদীর ছায়া পাওয়া কিংবা ক্ষমতাসীনদের খুদকুঁড়ো খাওয়া সাংবাদিকরাই সবসময় ছড়িয়ে ঘোরায়। যাঁরা নীতিতে অটল থেকে সমাজের নিরেট চিত্রটা নির্মোহভাবে তুলে ধরে তাঁদেরকে মূল্যায়নের গরজ কখনো কোনও শক্তিই বোধ করেনি, বরং মেরুদণ্ডহীন সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী সাংবাদিকরাই বিজয়ী পক্ষের অনুকম্পা পেয়ে থাকে।
চব্বিশের পরিবর্তিত বাঙলাদেশও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত পাঁচ মাস ধরে এমন সব সাংবাদিকরা শ্রেণিনেতা সেজে বসে আছে যারা বিগত শাসনামলে নির্যাতিতদের পক্ষে একটি অক্ষরও লিখেনি, উপরন্তু নিপীড়কদের নিপীড়নকে যৌক্তিক হিসেবে সাফাই গেয়েছে। আবার আরেকটি শ্রেণি আছে যারা রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে দালালী না করলেও মজলুমের পক্ষে কিছুই বলেনি এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ম্যাড়ম্যাড়ে সাংবাদিকতা পেশাগত দায় সেরেছে মাত্র। এই শ্রেণিটিও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশ খয়ের খাঁ হয়ে গিয়ে নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদেরকে নিগ্রহের পাঁকেই ঠেলে রাখে।
পরিবর্তন কিংবা সংস্কারের যতোরকম গান -ই গাই না কেন, সংবাদপত্র জগতের এই ছদ্মবেশী অচলায়তন ভাঙতে না পারলে তা কোনও কাজেই আসবে না। মনে রাখতে হবে - সাংবাদিকরা জাতীয় বিবেক ও সমাজের তৃতীয় চোখ, সাংবাদিক নামধারী সুবিধাবাদী সাংঘাতিকদের কবল থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত করতে পারলেই সমস্ত সংস্কার ইতিবাচক হবে, নতুবা হাজার বছরের ইতিহাসের মতো সর্বশেষ পরিবর্তনটাও কেবল ঐতিহাসিক ঘটনাবহুলতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
[লেখক : সাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী ]
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত