প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১, ২০২৬, ৯:৩২ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ৬:৩০ পি.এম

দীর্ঘ ১৬ বছর পর পুনরায় চালু হওয়া জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দেশের গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল স্বপ্ন দেখার এক বড় সুযোগ। এই পরীক্ষার পুনঃপ্রবর্তনকে অনেকেই শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ছিল নতুন সম্ভাবনার জানালা। কিন্তু যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই স্বপ্নই পরিণত হয়েছে গভীর হতাশায়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক গাফিলতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে এবছর ৮ জন শিক্ষার্থী জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে।
বিদ্যালয় ও অভিভাবক সূত্রে জানা যায়, পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফিস সহ বিদ্যালয়ের সকল দেনা পাওনা পরিশোধ করার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইন নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি। অনলাইন কার্যক্রমের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ফলে শিক্ষা বোর্ড ওই শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করেনি এবং তারা পরীক্ষার তালিকায় স্থান পায়নি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারার ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের জীবনে বড় মানসিক আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত তদারকি ও স্বচ্ছ যোগাযোগ ছিল না। অনলাইন আবেদন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত শিক্ষার্থী বা অভিভাবক কেউ কোনো সতর্কবার্তা বা অগ্রগতির তথ্য পায়নি। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, তারা বিদ্যালয়ের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল সময়মতো সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, কিন্তু সেই দায়িত্বে চরম অবহেলা করা হয়েছে।
মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের গাফিলতি নতুন নয়। অভিভাবকদের মতে, এর আগেও প্রধান শিক্ষকের তদারকির অভাবে এসএসসি পরীক্ষার অনলাইন ফরম পূরণের সময় ছাত্রছাত্রীর নামের বানান ভুল হয়েছিল। পরে সেই ভুল সংশোধনের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অতিরিক্ত অর্থ, সময় এবং মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে সময়ও দায়িত্বশীল কারও বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিভাবকরা মনে করছেন, বারবার দায়িত্বহীনতার পরও শাস্তির নজির না থাকায় এবার আরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা ৮ শিক্ষার্থী অনেকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কেউ বাড়তি পড়াশোনায় যুক্ত ছিলেন, কেউ কোচিং করেছেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর এই পরীক্ষার সুযোগকে তারা জীবনের বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিলেন। হঠাৎ করে সুযোগ হারিয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, পরীক্ষার খবর শোনার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়েছে এবং পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউনুস আলী মোল্লা জানান, অনলাইন কার্যক্রমের দায়িত্ব অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর তোজাম্মুল হোসেনের ওপর ন্যস্ত ছিল। তার গাফিলতি ও অসতর্কতার কারণে নির্ধারিত সময়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। যদিও দায় স্বীকার করা হয়নি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। একই সঙ্গে শনিবার দুপুরে বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার নির্ধারিত সাধারণ গ্রেডের বৃত্তির টাকা বহন করতে হবে মর্মে তোজাম্মুল হোসেনকে মুচলেকা দিতে হয়েছে।
তবে এই পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, অনলাইন ফরম পূরণ কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়; এটি একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রধান শিক্ষক হিসেবে সার্বিক তদারকি, সময়মতো যাচাই এবং দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা তার মৌলিক দায়িত্ব। শুধু একজন শিক্ষককে দায়ী করে পুরো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এড়ানো যায় না।
ঘটনাটি জানাজানি হলে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেয়। মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সম্রাট হোসেন আমাদের প্রতিবেদক জেমস আব্দুর রহিম রানাকে বলেন, “আমি যোগদানের আগে অনলাইন কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অবহিত হওয়া মাত্রই আমি প্রধান শিক্ষককে ডেকেছি। তদন্ত চলছে। যদি কারো গাফিলতির কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইউএনও’র এই বক্তব্যে প্রশাসনের উদ্যোগের ইঙ্গিত মিললেও অভিভাবকদের প্রশ্ন, তদন্ত শেষে যদি দোষ প্রমাণিত হয়, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে? একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাজীবনের সুযোগ হারালে তার ক্ষতিপূরণ কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো এখন এলাকাজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ঘটনা শুধু একটি বিদ্যালয়ের ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে দক্ষ জনবল, একাধিক স্তরের যাচাই এবং সময়সীমা মনিটরিংয়ের অভাবই এ ধরনের ঘটনার মূল কারণ।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর পর চালু হওয়া জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় এমন অবহেলা শিক্ষা প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কেবল একটি পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এলাকাবাসীর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি একটি বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনিক ত্রুটি ঘটে, তার তদারকিতে থাকা শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল? কেন পূর্বের অভিযোগের পরও কার্যকর নজরদারি করা হয়নি? কেন একই ধরনের ভুল বারবার ঘটছে?
ঘটনাটি সামনে আসার পর মনোহরপুরে অভিভাবক, শিক্ষক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অনলাইন কার্যক্রমে একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, লিখিত অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অভিভাবকদের অবহিত করার ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা তুলে ধরে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাত্র ৮ শিক্ষার্থী, কিন্তু এর প্রতীকী অর্থ অনেক বড়। সামান্য অবহেলাই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করতে পারে।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফিরে আসা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়ে এই ৮ শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ কেবল তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় কি না।