

শ্রমিক শ্রেণি যে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি, তা অকপটভাবে স্বীকার করতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অধিকার এবং নিরাপত্তা যে দূরের কথা, তাদের মৌলিক অধিকারও অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। রাষ্ট্রের নীতিতে শ্রমিকদের কথা থাকলেও, প্রক্রিয়ায় তার বাস্তব প্রয়োগ প্রায়শই হয় না। একদিকে কর্পোরেট সুবিধা, অন্যদিকে শ্রমিকদের অবহেলা—এই দ্বৈত ভূমিকা রাষ্ট্রের শ্রমিকবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে। এটা একটা বাস্তবতা, যেখানে শ্রমিকরা শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ নয়, তাদেরও মানবাধিকার রয়েছে, যা রাষ্ট্র কখনো গুরুত্বের সঙ্গে দেখে না।
রাষ্ট্রের উচিত শ্রমিকদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও কার্যকরী আইন তৈরি করা, যা শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মজুরি ও অন্যান্য অধিকার সুরক্ষিত রাখবে। অথচ বাস্তবে, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রায় শূন্য। সরকারের শ্রম আইনগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না, এবং এর ফলে শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছে। গার্মেন্টস, নির্মাণ শিল্প, কৃষি ক্ষেত্র—এইসব ক্ষেত্রে শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, কিন্তু তাদের সম্মানজনক মজুরি, নিরাপত্তা, এবং অন্যান্য অধিকার প্রদান করা হয় না।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যখন তারা কাজের সময় হুমকির সম্মুখীন হয়, এবং এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা অবমূল্যায়িত হয়। গার্মেন্টস শিল্পে দীর্ঘ সময় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, ফলে তাদের জন্য দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। নির্মাণ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের শর্তও ভয়াবহ, যেখানে প্রায়শই নিরাপত্তা সামগ্রী বা নিয়ম মেনে কাজ করা হয় না।
মজুরি বৈষম্যও এক অমীমাংসিত সমস্যা, যা শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। একদিকে যেখানে কারখানা মালিকরা বিপুল লাভ করছে, সেখানে শ্রমিকরা সামান্য মজুরি নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এই মজুরি বৈষম্য শুধু গার্মেন্টস নয়, নির্মাণ এবং কৃষি শিল্পেও প্রকট।
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠন গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে বাস্তবে, রাষ্ট্র তার শক্তি ব্যবহার করে এই সংগঠনগুলোকে দমন করে থাকে। প্রশাসনিক নীতিমালা, শ্রমিকদের সংগঠন নিষিদ্ধ করা, আন্দোলন দমন—এগুলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চালানো হয়।
বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যণীয়। বহুবার শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনে নেমেছে, কিন্তু সেগুলিকে প্রতিহত করার জন্য রাষ্ট্র বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করেছে। ট্রেড ইউনিয়নকে নির্মূল করার জন্য পুলিশের সহায়তায় অনেক সময় শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করা হয়। রাষ্ট্রের এই দমনমূলক নীতি শ্রমিকদের সংগ্রামের পথ আরও কঠিন করে তোলে।
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য শ্রম আইন প্রণীত হলেও, তাদের বাস্তবায়ন ঘটাতে রাষ্ট্র সেভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। গার্মেন্টস, কৃষি, নির্মাণ—এ সব ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এখনও নিয়মিতভাবে অবহেলিত হয়। রাষ্ট্র যদি তার আইন প্রয়োগে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়, তবে এই অবস্থা অনেকাংশে উন্নত হতে পারে।
শ্রম আইনের বাস্তবায়ন কখনোই এককভাবে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মজুরি পরিশোধের বিধি, কর্মস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শ্রমিকদের সুরক্ষা—এসব কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের সুরক্ষা নীতির প্রতি উদাসীন, এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
অতীতে, শ্রমিকদের আন্দোলন ছিল রাষ্ট্রের কাছে এক বড় হুমকি। তবে এখন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করা যায় না। শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা নীতিগতভাবে গঠনমূলক নয় এবং তার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারকে শুধু শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা নয়, তাদের জীবনমান উন্নত করার জন্যও কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য সুখী জীবনযাত্রা, কাজের সুরক্ষা, এবং সঠিক মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।
শ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের অবহেলায় থাকতে পারে, কিন্তু তা তাদের মুছিয়ে ফেলা যাবে না। গত কয়েক বছরে শ্রমিক আন্দোলনের পুনর্জাগরণ একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন। শ্রমিকদের সংগঠনগুলো তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে, এবং এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
শ্রমিকরা এখন নিজেদের সংগঠনগুলোতে একত্রিত হয়ে, আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ের পথ প্রশস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রমিকদের আন্দোলন গুরুত্ব পাচ্ছে, এবং সেই আন্দোলন রাষ্ট্রের নিপীড়নকে চ্যালেঞ্জ করে চলছে।
এখন সময় এসেছে, যেখানে রাষ্ট্র শ্রমিকদের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করবে। আইন প্রণয়ন, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিতকরণ, এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত করার মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শ্রমিকদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, রাষ্ট্রের উচিত তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত