প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ১৯, ২০২৬, ৪:৩১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১১, ২০২৫, ৫:২০ পি.এম
![]()
নার্স বা সেবিকা পেশাটি এমন একটি মহান পেশা যা নিঃস্বার্থ সেবা ও মানবিকতার প্রতীক। একজন নার্স একজন রোগীর শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও প্রদান করেন। ১২ মে, বিশ্বব্যাপী “আন্তর্জাতিক নার্স দিবস” পালিত হয়, যা আধুনিক নার্সিং পেশার প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মদিন হিসেবেও চিহ্নিত। এ দিনটি নার্সদের প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতি প্রদানের দিন।২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য "নার্সদের যত্ন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।" এই প্রতিপাদ্যটি কেবল তাদের ব্যক্তিগত সুস্থতার জন্যই নয় বরং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বৃহত্তর সুবিধার জন্য নার্সদের সহায়তা করার গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বকে তুলে ধরে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সাথে সাথে, নার্সদের অবদান অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে।
নার্সিং পেশার ইতিহাস ও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল
নার্সিং পেশার ইতিহাস বহু পুরনো হলেও একে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৮৫৪ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবা করতে গিয়ে তিনি স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং সংগঠিত নার্সিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। তার কারণে হাজার হাজার সৈনিকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। তার অবদান স্বীকৃত করে ১২ মে তার জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আজকের এই দিনে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষেই প্রতিবছর এইদিনে বিশ্বজুড়ে পালিত আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের ২০৫ তম জন্মবার্ষিকী।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্ম ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে। তিনি ছিলেন অপূর্ব রূপসী, অন্যদিকে খুবই দয়ালু ও স্নেহপূর্ণ মনের অধিকারী। তাকে ইউরোপের অন্ধকারে আলোকবর্তিকা বলে আখ্যায়িত করা হয়। নাইটিঙ্গেলের বাবা ছিলেন দুটো স্টেটের মালিক এক ধনী ভূস্বামী। নাইটিঙ্গেল যখন কেবল যৌবনে পা দেন, তখন তার ধনী বাবা পুরো পরিবারকে নিয়ে ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। এই ভ্রমণই তরুণী নাইটিঙ্গেলের চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
নাইটিঙ্গেল মানবসেবার প্রতি প্রথম টান অনুভব করেন ১৭ বছর বয়সে লন্ডনে থাকা অবস্থায়। পরবর্তীতে এই টানকে তিনি ‘ঈশ্বরের ডাক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে সেবাকে জীবনের ব্রত হিসাবে নেয়ার কথায় প্রবল আপত্তি আসে তার পরিবার থেকে। তখন সমাজে নার্সিং ছিল নিম্নবিত্ত, অসহায়, বিধবা নারীদের পেশা। পরিবারের প্রবল আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে তিনি নিজেকে নার্সিংয়ের কৌশল ও জ্ঞানে দক্ষ করে তোলেন। বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুবাদে তিনি সেসব দেশের সেবা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা ও অপেক্ষাকৃত উন্নত ব্যবস্থাতে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
১৮৫৩ সালে লন্ডনের মেয়েদের একটি হাসপাতালে নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব নেন। নাইটিঙ্গেলের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অসুস্থ সৈন্যদের পাশে দাঁড়ানো। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের এই যুদ্ধে সৈন্যদের অবস্থা বিপন্ন। সে সময় প্রতিরক্ষা দপ্তরের সেক্রেটারি সিডনি হার্বাট নাইটিঙ্গেলকে লিখলেন- ‘যুদ্ধের এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় আহত সৈন্যদের তত্ত্বাবধান করার মতো একজনও উপযুক্ত ব্যক্তি নেই। যদি আপনি এ কাজের ভার গ্রহণ করেন, দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।’
নিজ উদ্যোগে নার্সিংয়ের জন্য ৩৮ জনের স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়ে তিনি ছুটে যান যুদ্ধে অসুস্থ সৈন্যদের পাশে
নিজ উদ্যোগে নার্সিংয়ের জন্য ৩৮ জনের স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়ে তিনি ছুটে যান যুদ্ধে অসুস্থ সৈন্যদের পাশে।দেশের এই ডাক নাইটিঙ্গেল উপেক্ষা করতে পারেননি। বিশ্বে ১৯৬৫ সাল থেকে পালিত হয়ে আসলেও বাংলাদেশেও ১৯৭৪ সাল থেকে দেশে দিবসটি পালন করে আসছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন রেজিস্ট্রার্ড নার্স প্রয়োজন। তবে নার্সিং এমন একটি বিশেষত্ব যার গুরুত্বকে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। আসলে, কোনও ডাক্তার যদি তার সহকারী না থাকে তবে তার কর্তব্যগুলি সামলাতে পারবেন না। এটি দেওয়া, আমরা নিরাপদে বলতে পারি যে কোনও ক্লিনিক বা হাসপাতালে একজন নার্স অপরিহার্য।তবে এই কর্মচারীর দায়িত্ব সম্পর্কে আমরা কতটা জানি? তাদের মাঝে মাঝে কী ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়? এবং এমন কি কোনও মেয়ে যে কোনও নার্সের পথ বেছে নিয়েছে তার সম্ভাবনা কী?
নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন নার্সের প্রয়োজন তিন লাখের বেশি। যদিও নিবন্ধিত নার্স আছেন ৮৪ হাজার। সে হিসেবে দেশে নার্স আছে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ২৮ শতাংশ। প্রতি চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন দশমিক ৩০ জন। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ২৩ জন নার্স থাকার কথা। যদিও বাংলাদেশে এ সংখ্যা তিনজন।
এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কর্মরত নার্সের সংখ্যা ৪২ হাজার ৩৩০ জন। বাকিরা দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৪২৯টি নার্সিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ১৩টি বিএসসি নার্সিং কলেজ, ৪৪টি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ও একটি সরকারি পোস্টগ্যাজুয়েট কলেজ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী মান সম্মত স্বাস্থ্যসেবার জন্য একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিন জন নিবন্ধিত নার্স প্রয়োজন। বাংলাদেশে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৯৯৭ জন নিবন্ধিত চিকিৎসকের বিপরীতে নিবন্ধিত নার্স রয়েছেন মাত্র ৭৬ হাজার ৫১৭ জন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসকের অনুপাতে বর্তমানে নার্স থাকা উচিত ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৯১ জন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমানে দেশে চিকিৎসকের অনুপাতে নার্সের ঘাটতি ২ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৪ জন। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত নার্সের সংখ্যা মাত্র ৪২ হাজার ৩৩০ জন। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
> নার্সদের অবদান
একজন নার্স শুধু হাসপাতালের রোগীকেই সেবা দেন না, তিনি সমাজে স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত থাকেন। গর্ভবতী নারী, নবজাতক শিশু, প্রবীণ নাগরিক, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রে নার্সদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা নার্সদের আত্মত্যাগ ও কর্মনিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখেছি। তারা নিজের জীবন বিপন্ন করে রোগীদের পাশে থেকেছেন, সেবা করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন। এই সেবাব্রতই নার্সদের আলাদা মর্যাদা দেয়।
> বাংলাদেশে নার্সিং পেশার অবস্থা
বাংলাদেশে নার্সিং পেশার গুরুত্ব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে নার্সদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে এই অনুপাত এখনও ১:১ এর নিচে।
তাছাড়া নার্সদের বেতন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের দিক থেকেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানের নয়। পেশাগত উন্নয়নের সুযোগও সীমিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নার্সদের জন্য ডিপ্লোমা ও ব্যাচেলর কোর্স চালু হওয়ায় ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
> নার্সদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
নার্সদের পেশাকে অনেক সময় সামাজিকভাবে অবহেলিত মনে করা হয়, বিশেষ করে নারীদের পেশা বলেই অনেকের মনোভাব নেতিবাচক। এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যা, যা সচেতনতা ও শিক্ষার মাধ্যমে দূর করা জরুরি। নার্সিং পেশা যেমন কঠিন, তেমনি এটি চূড়ান্ত মানবিকতা ও সহানুভূতির প্রতীক। আমাদের উচিত নার্সদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করা।
> আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের তাৎপর্য
এই দিবসটি বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল, নার্সিং ইন্সটিটিউট, স্বাস্থ্য সংস্থা, ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নার্সদের সম্মাননা প্রদান, সেমিনার, র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রতি বছর ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ নার্সেস (ICN) এই দিবসের জন্য একটি নির্দিষ্ট থিম নির্ধারণ করে। যেমন ২০২৪ সালের থিম ছিল: "Our Nurses. Our Future. The Economic Power of Care." এই থিমটি নার্সদের কর্মক্ষমতা ও সেবার মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়নে তাদের অবদানকে তুলে ধরেছে।
> প্রযুক্তি ও নার্সিং পেশা
বর্তমান যুগে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে নার্সিং পেশাও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, টেলিমেডিসিন, রোবোটিক সেবা ইত্যাদি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে নার্সদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান জরুরি।
> নার্সিং পেশায় পুরুষের অংশগ্রহণ
একসময় নার্সিং পেশাকে শুধুমাত্র নারীদের জন্য উপযুক্ত পেশা হিসেবে দেখা হতো। তবে বর্তমানে অনেক পুরুষও এই পেশায় যোগ দিচ্ছেন এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে পুরুষ নার্সদের সংখ্যা বাড়ছে, যা পেশার বৈচিত্র্য ও সেবার পরিধি বাড়াতে সহায়ক।
> নার্সদের বিধিবদ্ধ শ্রেণিবিন্যাস
এই পেশাটি নিয়ে আলোচনা করার সময়, নার্সদের শ্রেণিবদ্ধকরণ আছে এমন বিষয়টি এড়ানো যায় না। এবং, শিক্ষাগুলি একই রকম হওয়া সত্ত্বেও, দায়িত্বগুলির পরিধি সবার জন্য আলাদা।
>সুতরাং নার্স কি ধরণের আছে?
° প্রধান নার্স একমাত্র পদ যা কলেজ ডিগ্রি প্রয়োজন। এটির মূল কাজটি নিয়ন্ত্রণ। এই কর্মচারীই মধ্য ও জুনিয়র মেডিকেল কর্মীদের কাজের সাথে সামঞ্জস্য করেন।
° সিনিয়র নার্স - প্রতিটি বিভাগের প্রধানকে অর্পিত একটি পদ। মূল কাজটি হ'ল তার নিজস্ব অধীনস্থদের পরিচালনা করে তাকে অর্পিত অঞ্চলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
° একজন সেন্ড্রি নার্স এমন বিশেষজ্ঞ যা রোগীদের চিকিৎসকের সমস্ত পরামর্শ কঠোরভাবে অনুসরণ করে তা নিশ্চিত করে: ওষুধ খাওয়া, বিছানা বিশ্রাম বা ডায়েট মেনে চলা।
° প্রসিডেরাল নার্স। তিনিই ডাক্তার দ্বারা নির্ধারিত ইনজেকশন এবং ড্রপারগুলির জন্য দায়ী। এছাড়াও, তিনি বিশ্লেষণগুলি সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে নিয়ে যান।
° অপারেটিং রুমের নার্স সার্জনের ডান হাত। তিনি অপারেশন করার আগে অপারেটিং রুমটি প্রস্তুত করেন, যা কিছু আছে তা যাচাই করে এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে আসে। ভবিষ্যতে, তিনি সার্জন তাকে যে সমস্ত নির্দেশনা দিয়েছেন তা অনুসরণ করে: একটি স্ক্যাল্পেল, একটি বাতা বা বলুন, একটি ট্যাম্পোন জমা দিন।
স্থানীয় নার্স কোনও বিশেষজ্ঞ একজন নির্দিষ্ট ডাক্তারের কাছে নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ is প্রায়শই, এই অবস্থানটি কাগজপত্রের সাথে সম্পর্কিত: কার্ডগুলি পূরণ করা, দস্তাবেজগুলির সাথে কাজ করা, রেকর্ড রাখা ইত্যাদি।
> নার্সদের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
নার্সদের কাজ শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। দীর্ঘ সময় ডিউটি, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী মানসিক চাপ, মাঝেমধ্যে রোগীর আত্মীয়স্বজনের দুর্ব্যবহার—এসব সামাল দিতে হয় প্রতিনিয়ত। তাই সেবার পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার দিকেও নজর দেওয়া উচিত।
নার্সিং পেশাকে আরও পেশাগত ও মর্যাদাসম্পন্ন করতে হলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
১. নার্সদের জন্য উন্নত ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা
২. বেতন কাঠামো উন্নয়ন ও ক্যারিয়ার গ্রোথের সুযোগ তৈরি করা
৩. নার্সদের সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়ন
৪. সমাজে নার্সিং পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রচারণা
৫. গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা
> একজন নার্সের এই সব গুণাবলী চাইঃ-
একজন নার্স লালন পালন করেন এবং সুরক্ষা জোগান। অসুস্থ, আহত ও বয়স্ক লোকদের যত্ন নেয়ার জন্যে সবসময় তৈরি থাকেন। তবে ভালো নার্স হতে হলে দক্ষতা নিঃস্বার্থতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একজন দক্ষ নার্স হওয়ার জন্যে যদিও নিঃস্বার্থ হওয়া দরকার কিন্তু শুধু তাই-ই যথেষ্ট নয়। ভালো নার্স হওয়ার জন্যে অনেক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দরকার। নার্সিংয়ের ওপর এক থেকে চার বছর বা তারও বেশি সময় পড়াশোনা করতে এবং হাতে-কলমে শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন গুণগুলো থাকলে একজন ভালো নার্স হওয়া যায়? ‘সচেতন থাক’ নামক একটি পত্রিকা কিছু অভিজ্ঞ নার্সদের এই প্রশ্নটা করেছে, এখানে তাদের কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হলো-
• ডাক্তার রোগ সারান কিন্তু নার্স রোগীর দেখাশোনা করেন। এই জন্যে নার্সদের প্রায়ই মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়া সেই সমস্ত রোগীদের গড়ে তুলতে হয়, যারা জানতে পারেন যে তাদের এক দীর্ঘস্থায়ী রোগ হয়েছে বা খুব শিগগিরই মারা যাবে। আপনাকে একজন রোগীর মায়ের ভূমিকা নিতে হবে’ -কারমেন কিলমার্টিন, স্পেন।
• একজন রোগীর ব্যথা ও যন্ত্রণাকে অনুভব করতে হবে ও তাকে সাহায্য করার ইচ্ছা থাকতে হবে। এ জন্যে দয়া ও ধৈর্য থাকা দরকার। নার্সিং ও চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কে সবসময় আরও বেশি জানতে হবে’ -তাদাশি হাতানো, জাপান।
• সম্প্রতি নার্সদের আরও বেশি করে পেশাদারি জ্ঞান নেয়ার দরকার হয়েছে। তাই, তাদের পড়াশোনা করার ইচ্ছা ও তা বোঝার ক্ষমতা থাকা দরকার। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে নার্সদের তড়িত সিদ্ধান্ত ও সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে’ -কেইকো কাওয়ানে, জাপান।
• একজন নার্স হিসেবে আপনাকে আন্তরিক মনোভাব দেখাতে হবে। আপনার সহ্য শক্তি থাকতে হবে এবং সহানুভূতি দেখাতে হবে’ -আরাসেলি গারসিয়া পাডিয়া, মেক্সিকো।
• একজন ভালো নার্সের মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে, সবকিছু খুব ভালোভাবে খেয়াল করতে এবং পেশাদারি হতে হবে। একজন নার্সের মধ্যে যদি আত্মত্যাগের মনোভাব না থাকে অর্থাৎ তার মধ্যে যদি সামান্য স্বার্থপরতা থাকে বা তার থেকে উঁচু মর্যাদার মেডিকেল কর্তৃপক্ষের কেউ পরামর্শ দিলে যদি সে বিরক্ত হয়, তাহলে ওই নার্স রোগী এবং তার সহকর্মীদের জন্যে অনুপযোগী বলে বিবেচিত হবে’ -রোসাঞ্জেলা সান্তোষ, ব্রাজিল।
• কয়েকটা গুণ থাকতেই হবে যেমন- নমনীয় মনোভাব, সহ্য শক্তি এবং ধৈর্য। শুধু তাই নয়, আপনাকে খোলা মনের হতে হবে আর সেইসঙ্গে সহকর্মী ও মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে। দক্ষভাবে কাজ করে চলার জন্যে আপনাকে নতুন নতুন কৌশলগুলো তাড়াতাড়ি শিখে নিতে হবে’ -মার্ক কোলার, ফ্রান্স।
• লোকেদেরকে ভালোবাসতে হবে এবং অন্যদের সাহায্য করার ইচ্ছা আপনার থাকতে হবে। কঠিন মানসিক চাপ মোকাবিলা করার শক্তি থাকতে হবে; কারণ এই কাজে কোনোভাবেই ভুল করা চলবে না। আপনার মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হবে যাতে প্রয়োজনে অল্প কয়েকজন সহকর্মী নিয়েও উন্নত মানের সেবা প্রদান করতে পারেন’ -ক্লডিয়া রেকারবাকার, নেদারল্যান্ড।
তবে এটি সত্যি যে নার্সিংয়ে আপনাকে বৃহৎ হৃদয় নিয়ে আসতে হবে বিতরণ করতে হবে ভালোবাসার স্পর্শ। রোগীর অনুভূতি নিজের ভেতরে বোঝার অসীম ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
> বেসরকারি হাসপাতালে ‘ভুয়া নার্স’র ছড়াছড়ি:-সারা দেশের প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণবিহীন নার্স দিয়ে চলছে। আর নার্সিং বিষয়ে তাদের কোনো ডিপ্লোমা বা বিএসসি ডিগ্রি নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা কারও মাধ্যমিক অথবা উচ্চমাধ্যমিক। ওই হাসপাতালে নিয়োগের পর তাদের সবাইকে ৫ থেকে ৭ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর থেকেই তারা নার্স হিসেবে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন।
এ চিত্র সারা দেশের প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেরই একই অবস্থা। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণবিহীন নার্স দিয়ে চলছে হাসপাতালগুলো। তাদের নেই নার্সিং কাউন্সিলের নিবন্ধন। ডিপ্লোমা ও বিএসসি নিবন্ধিত নার্সরা তাদের নাম দিয়েছেন ‘ভুয়া নার্স’।সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনবিহীন অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তি নার্স হিসেবে নিয়োগের ফলে প্রকৃত নিবন্ধিত ও প্রশিক্ষিত নার্সরা চাকরি পাচ্ছেন না। পাশাপাশি হাসপাতালের রোগীরাও তাদের কাছ থেকেও কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন কি ডাক্তারদের বিভিন্ন নির্দেশনাও তার সহজেই বুঝতে পারেন না। ফলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে ওষুধ দেয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে মারাত্মক ভুল হওয়ার আশংকা থাকছেই। এরপরও বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরা নার্সিং কাউন্সিলের আইন অমান্য করে কয়েকদিনের নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়েই তথাকথিত নার্সদের নিয়োগ দিচ্ছেন। মোট অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে হাসপাতালে ভর্তি হলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকছেন রোগীরা। নিবন্ধিত নার্সদের নিয়োগ দেয়া হলে তাদের নির্ধারিত স্কেলে বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যদিকে তথাকথিত নার্সদের নামমাত্র বেতন দিলেই চলে। শুধু আর্থিক দিক বিবেচনা করেই ক্লিনিক মালিকরা তাদের নিয়োগ দেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নার্সিং কাউন্সিলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান , শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই এসব ভুয়া নার্স রয়েছে। অনিবন্ধিত নার্স নিয়োগ দেয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও কেউ আইন মানছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা নার্সিং কাউন্সিলের না থাকায় এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তিনি রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নার্সিং কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়াতে সরকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে প্রায় অর্ধ লাখের বেশি ভুয়া নার্স বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কর্মরত আছেন। রাজধানীর বেশকিছু নামিদামি হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘ভুয়া নার্স’ কাজ করছেন। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হলেও নেয়া হয়নি কার্যকরী কোনো উদ্যোগ। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে অনিবন্ধিত নার্স নিয়োগ না করতে একাধিকবার সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক বলেন, কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত নার্স নেই। তাই যাদের ন্যূনতম পেশাগত শিক্ষা আছে আদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল আচরণ করা হয়। বেশি কঠোর হলে প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে হাসপাতাল পরিচালনা কষ্টকর হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল অর্ডিনেন্স ১৯৮৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন/লাইসেন্স (পেশাগত সনদ) ব্যতীত কোনো নার্সকে কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদান সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভুয়া নার্স-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নির্মূল কমিটির প্রধান বলেন, সামান্য কিছু মুনাফার আশায় কিছু আসাধু স্বাস্থ্য ব্যবসায়ী লোকদের রাস্তা থেকে ধরে এনে সাদা এপ্রোন পরিয়ে নার্স আর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বানিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই, ভালো নার্সরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাণ। তাদের আন্তরিক সেবা, সহানুভূতি ও পেশাগত নিষ্ঠা না থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে কার্যকর হয় না। ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই নিরলস যোদ্ধাদের জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত, এবং তাদের অধিকতর সুযোগ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব