জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর বেশ আলোচনা হয়, বিবৃতি এবং সরকারের তরফ থেকে নানা পদক্ষেপের কথাও বলা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, সংবাদকর্মীরা অপরাধীচক্র ও চাঁদাবাজদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। পাশাপাশি কিছু গণমাধ্যমে ‘মব’ তৈরি করে মালিকপক্ষকে হুমকি দেওয়ার সংস্কৃতিও সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা এবং আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন সৌরভকে নৃশংসভাবে মারধরের ঘটনা শুধু দুঃখজনক নয়, বরং সাংবাদিক নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ভয়ংকর আঘাত। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার অপরাধেই তুহিনের জীবন শেষ হয়ে গেল। অন্যদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অসংখ্য মানুষ ভয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এটিও সমাজের ভীতিকর মানসিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। জানা যাচ্ছে, সাংবাদিক তুহিন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করায় তাঁকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে অপরাধীরা এতই বেপরোয়া যে সাধারণ মানুষ তো বটেই, সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ করতেও তারা কোনো রকম দ্বিধা করছে না। এই পরিস্থিতিতে নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন, তিনজন নিহত হয়েছেন এবং অনেককে চাকরি হারাতে হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দুর্বল অবস্থাকে তুলে ধরে। একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল, তা এখন সুদূরপরাহত মনে হচ্ছে। সরকারের উচিত এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। সাংবাদিক হত্যা, হামলা ও হয়রানির ঘটনায় দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নোয়াবের দাবি অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। গণমাধ্যমের কর্মপরিবেশে মব তৈরি করে মালিকপক্ষকে হুমকি, ভয়ভীতি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার। গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে জনগণের জানার অধিকার খর্ব হয়, দুর্নীতি ও অপরাধ বেড়ে যায়, আর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ভেঙে পড়ে। তাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও চাপ সৃষ্টি কোনোভাবেই সহনীয় হতে পারে না। এ ধরনের অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে অপরাধীদের দুঃসাহস আরো বাড়বে।