
আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে সত্যকে আড়াল করার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ভয়, আর সেই ভয় তৈরির সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মুসলমানকে শত্রু হিসেবে দেখানো। একসময় যুদ্ধের কারণ ছিল জমি, সম্পদ বা সাম্রাজ্য বিস্তার; এখন নতুন সাম্রাজ্যের ভিত্তি দাঁড়িয়েছে ‘ভয়বাণিজ্যে’। এই ভয়বাণিজ্যের মূল মুদ্রা আজ ইসলামবিদ্বেষ। একে বলা যায় ক্ষমতার নতুন রূপক — যে রূপক মানবতার চোখে ধুলো দিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের হাতে দেয় দমননীতির লাইসেন্স, আর গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে রাখে সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
গাজা, কাশ্মীর, শিনজিয়াং, আরাকান কিংবা প্যারিস—সব জায়গায় একই দৃশ্যপট: মুসলমান মানেই নিরাপত্তা-ঝুঁকি, প্রতিবাদ মানেই উগ্রতা, আত্মরক্ষা মানেই সন্ত্রাসবাদ। পশ্চিমা গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয় রাজনীতি পর্যন্ত—এই একক ন্যারেটিভ এখন বিশ্বব্যবস্থার মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। একে আর ধর্মীয় বিভাজন বলা যায় না; এটি মূলত এক প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল, যেখানে ইসলামকে ‘অন্যতা’র প্রতীক বানিয়ে পুরো মুসলিম সমাজকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এক পরিসরে আবদ্ধ করা হয়।
গাজার দিকে তাকান। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবী দেখছে—কীভাবে অবরুদ্ধ এক জাতিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের দেহভর্তি বারুদের টুকরো, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকা পরিবার, হাসপাতালে মায়ের চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নবজাতক—এইসব ছবিই আজ ‘নিরাপত্তা রক্ষা’র নামে বৈধতা পায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যখন ফিলিস্তিনিদের ‘মানব পশু’ বলেন, তখন পশ্চিমা নেতারা ধ্বনিত করেন পুরোনো মন্ত্র: “ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।” অথচ আত্মরক্ষার নাম করে প্রতিদিন ধ্বংস করা হচ্ছে এক জাতির অস্তিত্বের অধিকার। আন্তর্জাতিক আদালত ইতিমধ্যেই বলেছে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার বদলে ইসরায়েল পাচ্ছে আরও অস্ত্র, আরও অর্থ, আরও কূটনৈতিক সহায়তা—যেন হত্যাই হয়ে উঠেছে শান্তির নতুন সংজ্ঞা।
গাজার এই ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়; এটি ক্ষমতার নতুন রাজনীতির প্রতিফলন। ইসলামবিদ্বেষ আজ এমন এক সার্বজনীন ছদ্মবেশ, যার আড়ালে একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি, সামরিক শিল্প ও গণমাধ্যম জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে মার্কিন সাম্রাজ্য যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়েছে, সেই ন্যারেটিভই আজ ভারত, চীন বা ইউরোপের রাষ্ট্রনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। উইঘুর মুসলমানদের পুনঃশিক্ষা শিবিরে বন্দী রাখা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জ্বালিয়ে দেওয়া, ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ করা কিংবা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন—সবই আসলে একই স্ক্রিপ্টের ভিন্ন সংস্করণ।
বিশ্বরাজনীতির এই মুদ্রা বাজারে ভারত আজ অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। মোদির নেতৃত্বে সেখানে ইসলামবিদ্বেষ আর কেবল সামাজিক প্রবণতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (ঈঅঅ) এবং জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (ঘজঈ) মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন করার এক পরিকল্পিত প্রকল্প। বুলডোজার এখন রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে—যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় ধর্মের পরিচয়ের ভিত্তিতে। আর সেই রাষ্ট্রকেই পশ্চিমা দুনিয়া গণতন্ত্রের অংশীদার হিসেবে বরণ করে। কারণ, ভারতের এই ইসলামবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা পশ্চিমাদের নিরাপত্তাভিত্তিক মুসলিম-ভয় ন্যারেটিভের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
গণতন্ত্রের মুখোশ পরে যে স্বৈরাচার তার নাগরিকদের বিভক্ত করে শাসন করে, তার কাছে ইসলামবিদ্বেষ এক অমূল্য হাতিয়ার। এটি একই সঙ্গে জনমত প্রভাবিত করে, জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দেয় অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে, আর রাষ্ট্রের সহিংসতাকে ‘নিরাপত্তা অভিযানে’র ভাষায় ঢেকে ফেলে। হান্না অ্যারেন্ট একে বলেছিলেন “বুরোক্রেটিক হিউম্যানলেসনেস”—যেখানে নীতি ও মানবতা আলাদা হয়ে যায়। ভারতের বর্তমান শাসন সেই তত্ত্বের জীবন্ত উদাহরণ। ফিলিস্তিনে যেমন বোমা ফেলার সময় কেউ মানবাধিকার নিয়ে ভাবে না, দিল্লিতেও মুসলমানের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় ‘আইনের শাসন’কে উদ্ধৃত করা হয়।
ইসলামবিদ্বেষের শক্তি এখানেই—এটি ংরসঁষঃধহবড়ঁংষু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুই স্তরেই কাজ করে। জাতীয় স্তরে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে সংহত করে; আন্তর্জাতিক স্তরে এটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য’-এর ছদ্মবেশে বৈশ্বিক ক্ষমতার বৈধতা জোগায়। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তাদের সামরিক শিল্পকে সচল রাখতে চায়; তাদের জন্য স্থায়ী এক ‘শত্রু-চিত্র’ দরকার। মুসলমান সেই চিত্রের সবচেয়ে সহজ প্রতীক। এভাবেই ইসলামবিদ্বেষ পরিণত হয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিনিয়োগে—একটি ভবধৎ বপড়হড়সু, যেখানে মানবিক বেদনা পরিণত হয় ব্যবসার পুঁজিতে।
অনেকেই মনে করেন, “ইসলামবিদ্বেষ” শব্দটি অতিরঞ্জিত। তারা বলেন, এটি ধর্মীয় সমালোচনাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে। কিন্তু বাস্তবতা তার চেয়ে গভীর। এখানে ধর্ম নয়, মানুষই টার্গেট। মাহমুদ মামদানি যেমন বলেছিলেন, “ভালো মুসলমান” ও “খারাপ মুসলমান” বিভাজনটা বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং শাসনের কৌশল। কোন মুসলমান রাষ্ট্রের নাগরিক হবে, আর কাকে শত্রু বা সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হবে, সেটিই ঠিক করে দেয় ক্ষমতার ভারসাম্য।
এই ভারসাম্যের মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করে নিয়ন্ত্রণের এক নতুন আর্কিটেকচার। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, মিডিয়া প্রচারণা, আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতি—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ এক শাসনযন্ত্র। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নীতির টেবিল পর্যন্ত মুসলমান পরিচয়কে ব্যবহার করা হয় সন্দেহের প্রতীকে। ফলাফল—একটি স্থায়ী ভয়ের সংস্কৃতি, যেখানে মুসলমান মানেই সম্ভাব্য অপরাধী।
ইসলামবিদ্বেষের এই রাজনৈতিক অর্থনীতি কেবল মুসলমানদের সমস্যা নয়; এটি মানবতার সংকট। কারণ, যে রাষ্ট্র এক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা বৈধ করে তোলে, সে রাষ্ট্র কালক্রমে নিজের ভেতরেও নৈতিক পতন ঘটায়। ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষের যেভাবে পুনর্জাগরণ ঘটেছে, সেটি আসলে পশ্চিমা গণতন্ত্রের আত্মবিরোধিতা। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো সকল মানুষের সমান মর্যাদা; কিন্তু যখন সেই গণতন্ত্রই নির্দিষ্ট একটি ধর্ম বা জাতিকে ‘ঝুঁকি’ হিসেবে দেখে, তখন সেটি গণতন্ত্র থাকে না, থাকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য।
এ কারণেই ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল মুসলমানদের দায়িত্ব নয়; এটি মানবতার দায়িত্ব। যদি ইসলামবিদ্বেষ হয় ক্ষমতার মুদ্রা, তবে এর প্রতিরোধ হতে হবে এক বিকল্প মানবিক অর্থনীতির মধ্য দিয়ে—যেখানে শোকের শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না, মৃত্যু বা নিপীড়নের কোনো জাতি থাকবে না। ফিলিস্তিনকে কাশ্মীরের সঙ্গে, শিনজিয়াংকে রোহিঙ্গা শিবিরের সঙ্গে, প্যারিসের শহরতলিকে দিল্লির বস্তির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এডওয়ার্ড সাইদ যেমন বলেছিলেন, “মানুষের দুর্ভোগ অবিচ্ছিন্ন; মুসলমানদের দুর্ভোগ কম ট্র্যাজেডি নয়।”
আজ যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো গণহত্যার চিত্র দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তখন ইতিহাস লিখে রাখছে এক ভয়াবহ সত্য—নৈতিকতার বাজারেও এখন মুদ্রা চলছে ইসলামবিদ্বেষের নামে। এই বাজারে সত্য বিক্রি হয়, মানবতা দেউলিয়া হয়, আর রাষ্ট্রের সহিংসতা পরিণত হয় বৈধতাপ্রাপ্ত পণ্যে। আমাদের সময়ের এই পরিহাসই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর: শান্তির নামেই এখন যুদ্ধ চলে, ন্যায়বিচারের নামে হয় দমন, আর গণতন্ত্রের ছায়াতলে জন্ম নেয় নতুন স্বৈরাচার।
তবু আশার জায়গা আছে। কারণ প্রতিটি মিথ্যা ন্যারেটিভেরই বিপরীতে জন্ম নেয় সত্যের ভাষা। ইসলামবিদ্বেষের এই বৈশ্বিক প্রোপাগান্ডাকে মোকাবিলা করতে হলে দরকার নতুন এক মানবিক জোট—যেখানে মুসলমান ও অমুসলমান একসঙ্গে দাঁড়াবে রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। মিডিয়ার মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায়, রাস্তায় ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এই প্রতিরোধকে ছড়িয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলামবিদ্বেষের মূল শত্রু ইসলাম নয়, বরং মানবতার প্রতি সম্মান।
যতদিন পর্যন্ত আমরা এই সত্য উচ্চারণে সাহসী না হব, ততদিন গাজার শিশুর কান্না, কাশ্মীরের বন্দুকের আওয়াজ, কিংবা দিল্লির বুলডোজারের গর্জন—সবই আমাদের সভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি হয়ে থাকবে। ইসলামবিদ্বেষকে রুখতে হলে রাষ্ট্র নয়, মানুষকে কেন্দ্রে আনতে হবে। আর মানবতাই যদি হয় সবচেয়ে বড় ধর্ম, তবে তার সবচেয়ে বড় ফরজ আজ এই—ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
এসএম হাসানুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, রংপুর।
Smhashanuzzaman@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত