
অক্ষর দ্বারা শব্দ, শব্দের ব্যবহারে বাক্য আর বাক্যের অর্থ অনর্থ মিলে এই রচনার কাল সূর্যাস্তের অল্প পূর্বের। তখন পাড়ার বড় বাবুদের ঘরে, বারান্দায়, উঠোনে প্রদীপ স্থাপিত হয়েছে। মেঝো বাবুদের গৃহে সন্ধ্যা দীপ জ্বলছে। ছোট বাবুদের গৃহিণীরা সংসার ছেড়ে দেশান্তরী হওয়ার বক্তৃতা পাঠ সমাপ্ত হলে বাতিখানা হাতের মুঠোয় বন্দি করে বেরিয়েছে তৈল কর্জ করতে।
হর্ষর মা একমুঠো খড় দিয়ে অপেক্ষাকৃত চিকন বেণী পাকিয়ে চন্দ্রিকাদের বাড়ি থেকে তা জ্বালিয়ে নিয়ে এসেছে এবং অত্যন্ত দক্ষতার সহিত দোরগোড়ায় ঝুলিয়েছে! এটাই সন্ধ্যাবাতি। বড়, মেঝো কিম্বা ছোট বাবুদের কাতারে হর্ষর মা পড়ে না। মূলত সমাজের তলানিতে যাদের বসবাস তাদের কোন বাটখারায় জায়গা হয় না।
বহুজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্রমান্বয়ে কালী কিশোর রায় চৌধুরী, কাশী কিশোর রায় চৌধুরী, যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, শৌরিন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর জমিদারির পাঠ ফুরালে রামগোপালপুর রাজবাড়িটি পরিত্যক্ত আবরণে আবৃত হয়। এরও এক যুগ পরে রাজবাড়ির সীমানা প্রাচীরের পশ্চিম তীরের বহিরাংশে একটা ছোট আকৃতির শনের ঘরে অন্ধ স্বামী আর কন্যাকে নিয়ে বাস করতে আরম্ভ করলো হর্ষর মা। অদৃষ্ট তার নানান খেলা দেখিয়ে যখন ক্লান্ত তখন তিন সদস্যের এই পরিবারটির বিনা বিজ্ঞপ্তিতে জায়গা মিললো রাজবাড়ির দেয়ালের ওপাড়ে। এটা কারো নিজস্ব বা ব্যক্তিগত সম্পদ না হওয়ায় হর্ষর মায়ের থাকতে বাধা পড়লো না। রাজকর্তারা কভু ফিরবেন না সুতরাং একরকম নিশ্চিন্তেই আস্তানা গেড়েছে হর্ষর মা। রাষ্ট্রের কর্তাদের নজর পড়লে এখান থেকে উঠে যেতে হবে তা অবশ্য হর্ষর মা অন্তরের এক কোনে বন্দি করতে ভুল করেনি তবে আদৌ এমন হবে কিনা তাতে তার যথেষ্ট সন্দেহ! যাই হোক, হর্ষর মা অনিশ্চিত ভাগ্যে এটাকে উত্তম মেনে নিয়ে অন্য কোথাও অতিউত্তম খুঁজতে আগ্রহ করলো না। জীবনে তো শুধু বাসস্থানের চাহিদা মিটলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না, খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজনও পড়ে!
চন্দ্রিকার বাবা, হর্ষর মায়ের এমন উদ্যোগ এর পরামর্শদাতা এবং ঘর নির্মাণের সরঞ্জামাদীর যোগানদাতা। বিনা স্বার্থচিন্তার লোক চন্দ্রিকার বাবা নয়, হর্ষর মা তিনবেলা পেটেভাতে তার বাড়িতে কাজ করবে রাজি হওয়ায় এমন কাজে জড়িত হয়েছে। বাড়িতে আরো দুটি প্রাণী রয়েছে বলে তাদের জন্যও খাবার বরাদ্দ করবে মত দিয়েছে। এই সুত্রে খাঁ বাড়ি থেকে প্রাপ্ত খাবার তিন ভাগ করে খেয়ে কারোর ই প্রশান্তি মিলে না। অন্য কোন উপায়ের খোঁজ না থাকায় হর্ষ কিংবা হর্ষর মায়ের জীবন চালনা মুশকিল না হলেও হর্ষর পিতার ঢের অভিযোগ রয়েছে। এই কারনে হর্ষর মা প্রায়ই ভাবে যদি একজনের খাদ্য হজম হলে তা উদ্ধার করে অন্যজনের গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকতো তবে নিশ্চিন্তে দিনযাপনে বিঘ্ন ঘটতো না! স্বামীর অভিযোগ শ্রবণ করতে হতো না।
বস্ত্রের বেলায়। হর্ষর পিতার দুখানা জীর্ণ লুঙ্গি, একই অংকের ছেঁড়া হাতাওয়ালা গেঞ্জি আর শীতকালে ব্যবহার উপযোগী একটি মোটা কাপড়ের চাদর রয়েছে। হর্ষর একটি জামা। হর্ষর মায়ের দুটি শাড়ি যার একটি নিজের দখলে অন্যটি কন্যার সহিত ভাগাভাগি করে লজ্জা নিবারণের বন্দোবস্ত করতে বাধ্য হয়। এ ক্ষেত্রে এই তিনটি প্রাণীর কারোর ই দুঃখ নেই! যুক্তি হলো, সুখ নেই তাই দুঃখ নেই।
এদের রাত জাগার প্রয়োজনাভাব থাকায় সন্ধ্যাতেই ঘুমের আয়োজন করে। হর্ষ ঘরের এক কোনে ছোট্ট বাঁশের তৈরী মাচাটায় ঘুমিয়েছে। খাঁ সাহেবের দয়ায় যে চৌকিটা মিলেছে তাতে স্বামীর সঙ্গে শুয়েছে হর্ষর মা। স্বামী চক্ষু খুলে দেখতে পায় না তাই বেণীতে আগুন জ্বালিয়ে সন্ধ্যাবাতি তৈরীতে তার কোন নালিশ নাই। এতক্ষন কাত হয়ে মুখোমুখি ছিল দুজন, এই ভাবনাটা মস্তিষ্কে আসতেই একটা উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে উল্টো দিক ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো হর্ষর মা।
সকাল হয়েছে কিন্তু সূর্যের উদয় হয়নি। হর্ষ তার মাকে জিজ্ঞাসা করে।
-কাল যাওয়ার বেলায় রাস্তা ভুল করেনি তো?
হর্ষ সূর্যের কথা বলে। মা বুঝতে পারে কিন্তু উত্তর জানা নেই। হর্ষর পিতার চক্ষু দর্শনের ক্ষমতা চিরতরে বিলীন হওয়ার সাথে তার মায়ের জীবনের সূর্য ডুবে গিয়েছে। এখন পৃথিবীর সূর্য উদয় অথবা অস্ত যাওয়ায় সংবাদ রাখা নিস্ফল ছাড়া অন্য কি?
বেলা বাড়লে কালো মেঘের আকাশ হতে বৃষ্টির ঢল নামলো এবং কিছুমাত্র বিলম্বের পড় প্রকৃতি ফর্সা হয়ে উঠলো। বর্ষার পূর্বে খাঁ সাহেবের করুণায় ঘরটা মেরামত হয়েছিল বিধায় অন্দরে জল পড়লো না। অন্ধ পিতাকে একা ঘরে ফেলে রাজবাড়িতে টইটই করে ঘুরে বেড়াতে কন্যাকে বারংবার বারন করে হর্ষর মা খাঁ বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
রাজবাড়ির অধিকাংশ দেয়ালে লতাপাতা জন্মেছে। কিছুকিছু স্থানের মসৃণ প্রলেপ নষ্ট হয়েছে। ইট গুলো নিজে থেকেই খুলে পড়ছে। দরজা-জানালা খুয়া যেতে গিয়ে থেমে রয়েছে। কিছু যায়গা অরণ্য সমতুল্য। হর্ষ তার পিতাকে নিয়ে তাদের কুঁড়েঘরের দরজা ঘেসে প্রাচীর ভাঙ্গা দুয়ার অতিক্রম করে সিংহ তোরণের সামনে এসে দাঁড়ালো। এখানেই মাস দুয়েক আগে চন্দ্রিকার সাথে তার মিত্র সম্পর্কের গিঁট তৈরী হয়েছিল। চন্দ্রিকার সময়জ্ঞান ভালো হওয়ায় আজও সময়মত উপস্থিত হয়েছে। প্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত সাগরদীঘির কারুকার্যময় সান বাধাঁনো পুকুর ঘাটে পিতাকে আসন পেতে দিয়ে চন্দ্রিকাকে নিয়ে তিনতলা বিশিষ্ট প্রবেশদ্বার হয়ে বিভিন্ন ভবন, চিড়িয়াখানার অবশিষ্ট অংশ, মৃত রঙ্গম এর আকৃতি, উপসনালয়, বাগান বাড়ি ঘুরে দেখলো। নতুন নতুন কারুকার্যের আবিষ্কার করতে সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে এমন ভাবে প্রায়সই দুজনে ঘুরে বেড়ায়।
মুহূর্তটা বর্ষার বিকাল বেলা। পুকুরের জল, ধরিত্রী আর গগনের মসৃন রং এ প্রকৃতি হয়ে উঠেছে মলিন ও কোমল। মৃদু বাতাশে কচুরীপানা গুলো জলতরঙ্গের সাথে তাল রেখে রেখে পুকুরের কূলে এসে জমা হচ্ছে। এ বেলায় এমন দৃশ্যের সাক্ষী হলো হর্ষ আর চন্দ্রিকা। হর্ষ পিতার পাশে আর তার অতি নিকটে বসেছে চন্দ্রিকা। পিতা ও কন্যার কথোপকথন এর ধরণ উপলদ্ধি করে তাদের বন্ধুত্বে শক্তিশালী খুঁটি দ্বারা আঘাত পেয়ে গোধূলী বেলায় ছোট পায়ে বাড়ি ফিরছে চন্দ্রিকা।
হর্ষ যখন জন্মিল তখন তার পিতা খুশি হয়ে আনন্দের ভাবার্থ নাম রাখলো। বিপরীতে চন্দ্রিকার বাবা কন্যা জন্মদানের দায় শীতলা বাণুর উপর চাপিয়ে দেড় যুগের কাছাকাছি সময়ে এসেও মেয়েকে স্নেহ করলো না। এই অট্টালিকা আর হর্ষদের কুঁড়েঘরের বিস্তর তফাত চিন্তা করতে করতে চন্দ্রিকা সিঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠছে এমন সময় খাঁ সাহেব এর হুঙ্কার শুনে সে স্থির দাঁড়ালো।
খাঁ সাহেবের দুহিতা চন্দ্রিকা। কন্যা অবেলায় বাড়ির বাহিরে থাকলে বিপদ হতে পারে সন্দেহ করে নিজের সম্মান রক্ষার্থে উক্ত পথে বেড়া নির্মাণ করলো। শীতলা বাণু স্বামীর এই সিদ্ধান্তে সহমত পোষন করে কাল থেকে হর্ষ খাঁ বাড়িতে এসে চন্দ্রিকার খেলার সাথি হবে এই মতামত ব্যক্ত করলো। খাঁ সাহেব স্ত্রীর সহিত মত বজায় রেখে হর্ষর মাকে ডেকে রায় জানিয়ে আপনার কক্ষে প্রবেশ করলো।
হর্ষর মা অন্ধ স্বামীর একাকিত্বের ভাবনা মগজে ন্যস্ত করে বাড়ি ফিরলো। খাঁঁ সাহেবের হুকুমের বাহিরে যাওয়া চলে না সুতরাং তনয়ার নিকট স্বীয় কাঁধের ফরমাস হস্তান্তর করলো।
চন্দ্রিকা, হর্ষর পোশাক সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং বারংবার সখিকে নিজের বস্ত্র দান এর উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ব্যর্থ হয়েছে। হর্ষ এতদিন বাড়ির ত্রিসীমানায় বন্দি ছিল এখন তার মুক্ত পথে অতিরিক্ত বস্ত্রের প্রয়োজন পড়বে চিন্তা করে হর্ষর মায়ের হাতে পুর্ণাঙ্গ দুটি পোশাক দিয়ে চন্দ্রিকা বলল।
-মিত্রের জন্য পাঠাইলাম।
আনন্দের জলে আঁখি ভাসিয়ে সকাল বেলার খাবার সহ হর্ষর মা কুঠিরে পেীঁছালো। কন্যা তখন তার পিতার দৈনন্দিন সকল কাজ শেষ করে খাঁঁ বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুরানো পোশাক তার জন্য নতুন হল কিন্তু গ্রহন করলো না। হর্ষর মা দু চার বার মেয়েকে বুঝিয়ে হতাশ হয়ে বস্ত্রের পুটলিটা উপযুক্ত স্থানে উঠিয়ে রাখলো। বিনা অনুমতিতে এমন কর্ম করায় চন্দ্রিকার উপর রোষপূর্ণ গা নিয়ে খাঁঁ বাড়িতে হাজির হল হর্ষ। সখির মিষ্টি কথায় হর্ষর প্রাণ গললো এবং এই ধারা বজায় রেখে তাদের দিন চলতে থাকলো।
সপ্তাহ দুই পার হলে এক সন্ধ্যায় হর্ষর মা বাড়িতে এসে কন্যার হাতে অন্তর্বাস দেখে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। কিছু সময়ের জন্য সে ভুলে গিয়েছিল তার স্বামীর চোখে দেখবার ক্ষমতা নেই। মনে পড়লে চিন্তার মোড় ঘুরে ভাবনায় আসলো, কন্যা ডাগর হয়েছে! বিবাহের সময় হয়েছে! খুঁজে বাহির করলো, পনের বছর পূর্বে এক শীতের সকালে হর্ষ পৃথীবিতে এসেছিল। এরপর কেমন করে এই বৎসর গুলো পার করলো তাই ভাবতে ভাবতে ঘুমের ঘরে প্রবেশ করলো।
কন্যার প্রতি খাঁঁ সাহেবের স্নেহ বেড়েছে লক্ষ্য করে শীতলা বাণু স্বামীর প্রতি বেশ সন্তুষ্ট, যার দরুন আজকাল কর্তার প্রতি যত্নাদি বাড়িয়েছে। সরল পথে যে সুক্ষ কাটা লুকিয়ে লুকিয়ে উঁকি দেয় তা শীতলা বাণুর অভিজ্ঞতার অর্ন্তভুক্ত তাইতো হর্ষর প্রতি স্বামীর কুদৃষ্টি দ্রুতই তার নজর বন্দি হয়েছে। সমস্যা সমাধানের সহজ পথের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনতিবিলম্বে খাঁঁ বাড়িতে হর্ষের প্রবশে নিষেধ ঘোষণা করার সিদ্বান্ত বুদ্ধিতে নিশ্চিত করলো শীতলা বাণু।
গাঢ় সম্পর্ক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বিধায় সংযমি ভাব নির্লজ্জ হয়ে উঠে। এদের বেলায়ও তাই হলো। হর্ষ লজ্জার আবরণ মুখমন্ডল হতে অপসারণ করে চন্দ্রিকাকে বলল।
-সখি, বন্ধন চিরিবার সময় হয়েছে।
চন্দ্রিকার হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে যায়। কি এমন অন্যায় সে করেছে যে কারণে হর্ষ তাকে ছেড়ে যাওয়ার গর্জন তুললো ? কি অপরাধে তাদের স্বাধের সম্পর্ক বিলীন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে ? কোন কারনে তাকে অসহায় করবার ফন্দি আঁটছে হর্ষ ?
অনেক ঘুরিয়ে পেচিয়ে অবশেষে রহস্য উন্মোচন করে হর্ষ।
-তোর বাবা আমায় স্পর্শ করতে চায়।
মুহূর্তেই চন্দ্রিকা রেগে অগ্নি হয়ে উঠে। কন্যা সমতুল্য নারীর প্রতি অশুভদৃষ্টি তার পিতা আরোপ করতে পারে না, এ সে বিশ্বাস করবে না। পিতার উপর মিথ্যা রটনা রটিয়ে সম্মান হানির ধান্দা কোন অবস্থাতেই চন্দ্রিকা গ্রহণ করবে না। এতক্ষনে তার বন্ধুত্ব ধরে রাখার হৃদয় আকুতি ধ্বংসের গান গাইতে শুরু করলো। অকথ্য, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে হষকে এক প্রকার ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বাহির করে দিল।
প্রকৃতি প্রচন্ড রকমের রেগে রয়েছে। ঝড়ো হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, হর্ষর হৃদয় আর চক্ষুর রুপ একই। বারবার তার পিতার কথা মনে করলো হর্ষ। তার পিতা অন্ধ কিন্তু জ্ঞান বুদ্ধি সতেজ। চন্দ্রিকার দৃষ্টিশক্তি সচল কিন্তু দেখতে পায় না! বুদ্ধি তীক্ষœ কিন্তু এই মুহূর্তে হর্ষর নিকট সে প্রতিবন্ধী।
খাঁঁ বাড়ির শেষ প্রান্তের ঘরটায় অর্থাৎ মুল ফটক এর কাছাকাছি ঘরটা অতিথিদের আপ্যায়ন কাজে ব্যবহৃত হয়। বারান্দা দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে হঠাৎ হেঁচকা টানে ঐ ঘরে বন্দি হলো হর্ষ। নিজেকে যখন আবিষ্কার করলো তখন সে খাঁঁ সাহেবের বাহুতে বন্দি।
কর্ম সম্পাদন হলে অনুনয় বিনয় করে খাঁঁ সাহেব হর্ষকে বুঝালো, সময়মত তার ঋণ পরিশোধ করবে। মোটা অংকের অর্থ প্রদান করবে এমনকি হর্ষর মায়ের নামে জমি লিখে দিবে। হর্ষ যেন মুখ না খুলে সাবধান করে তাকে বিদায় দিল।
ঘর থেকে বের হয়ে হর্ষ উল্টো দিকে চললো। চন্দ্রিকার কক্ষদারে এসে আকুল আবেদন করলো, অন্তত শেষবারের জন্য হলেও একবার যেন চক্ষু মেলে হর্ষকে দেখে।
হর্ষকে তাড়িয়ে না দিয়ে ভুল সংশোধন করে নতুন পথ তৈরীর চিন্তাটা কোথায় লুকিয়েছিল! তার দুঃখ করতে করতে সখির বিরহে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল চন্দ্রিকা। এমন সময়ে হর্ষ ফিরে আসায় আনন্দে প্রায় আত্মহারা চন্দ্রিকা দরজা খুলে জীর্ন মানব মুর্তি দেখে আতংকে আঁতকে উঠলো। পরিপাটি হর্ষর এলোমেলো কেশ, নখের আঁচড় কাটা ললাট ও গলা, ছেঁড়া জামার উৎস খুঁজতে গিয়ে বারান্দায় কাঁপা দেহে পিতার অবস্থান লক্ষ্য করলো চন্দ্রিকা। কোন সন্দেহ নেই এ কাজ তার পিতাই করেছে, পিতার অঙ্গভঙ্গি আর আবহাওয়ায় উত্তর করলো। এতকাল পরে পিতার স্নেহ পেয়ে সে ভুলে গিয়েছিল খাঁঁ সাহেবের সত্যিকারের রুপ।
হর্ষর সমস্ত দেহ কাঁপছিল, চন্দ্রিকা কাছে এসে তাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলে দ্রুত পিছিয়ে গেল সে। নিজ কুঠিরে ফিরে যেতে পা বাড়িয়ে কিয়ৎক্ষণ এর জন্য থামলো এবং ভাঙ্গাস্বরে বলল।
-পাপের দেহে তোমার হাত পরুক তা আমি চাইনি সখি।
কোন মায়ায় হর্ষকে আটকানো যায়? কোন কিছুতেই না, কোন মোহ ই না। হর্ষ চলে গেলে চন্দ্রিকা তার মায়ের নিকট এসে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে বসলো। মা তার এক উত্তরে সমস্ত আলাপের সমাপ্তি ঘোষনা করলো।
-চন্দ্রিকা চাঁদের মতই সুন্দর।
চন্দ্রিকা থামলো না, বস্ত্র দ্বারা আবৃত দেহটা চোখের পলকেই অর্ধ মুক্ত করলো অর্থাৎ পরিহিত শাড়িটা খুলে মেঝেতে রাখলো। মধুর হেসে মাকে প্রশ্ন করলো।
-আমায় আকর্ষণীয় লাগে কি?
মা বুঝলো, কন্যা বড় হয়েছে তাই বুঝি বুঝাতে চাইছে! মিষ্টি হেসেই সন্তুষ্টজনক উত্তর করলো। হর্ষর মা এখানেই ছিল সেও শরমের চাদরে নিজেকে ঢেকে শীতলা বাণুর মতে মত দিল। চন্দ্রিকা, শাড়িটাকে পূর্বের স্থানে যায়গা করে দিয়ে মাকে লক্ষ্য করে বলল।
-মিত্রের বেদনার অংশী হতে চললাম।
অল্প সময় পর খাঁঁ সাহেব কন্যাকে আবিষ্কার করলেন, মুলফটক এর নিকট যে বড় কাঁঠাল গাছটা রয়েছে তার ডালে। শাড়ির বাঁধনে চন্দ্রিকা ঝুলছে।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত