ঢাকা, বাংলাদেশ। , রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
তাজা খবর
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার বাংলাদেশ ব্যাংকে ১০৮ সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ

ক্ষমতা, কৌশল ও অবিশ্বাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

এস এম রায়হান মিয়া :
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:০৩:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৪০৩ বার পঠিত

বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আজ এক অনন্ত প্রতারণার রণক্ষেত্র। এখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব সময়ের সীমা অতিক্রম করে না; বরং প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি জোট, প্রতিটি চুক্তি যেন কেবল নির্দিষ্ট কৌশলগত প্রয়োজনে গঠিত এবং স্বার্থের ক্ষণস্থায়ী সমীকরণের ভেতরেই বিলীন হয়ে যায়। রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব বা শত্রুতার কোনো ধারণা যে বাস্তবে টেকে না, তা এ দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে। একদল ক্ষমতা থেকে পতিত হতেই অন্য দল তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, এবং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মিত্রতার ইতিহাসও পুনর্লিখিত হয়। এ এক অদ্ভুত রাজনীতি, যেখানে বিশ্বাস শব্দটি যেন অভিধান থেকে নির্বাসিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের আগমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। ক্ষমতার লাগামহীন ব্যবহার, প্রশাসনিক পক্ষপাত, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যুগ পেরিয়ে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল—এবার হয়তো সত্যিকার অর্থে একটি সুশাসনমুখী, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল ঠিক বিপরীত চিত্র। অবিশ্বাসের বীজ যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত, তা এই সরকারের অগ্রযাত্রাকেও অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢেকে দিয়েছে। একদিকে সরকার বলছে তারা নিরপেক্ষ, অন্যদিকে দলগুলো বলছে সরকার নিরপেক্ষ নয়; আবার দলগুলো একে অপরের ওপরও আঙুল তুলছে—কে কতটা আন্তরিক, কে কতটা ষড়যন্ত্রমূলক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বরাবরই ‘বিশ্বাস’ নামক মানসিক কাঠামোকে গ্রহণ করতে পারেনি। এখানে নীতির চেয়ে কৌশল গুরুত্বপূর্ণ, আদর্শের চেয়ে হিসাব প্রাধান্য পায়, আর প্রতিশ্রুতির চেয়ে অবস্থান দ্রুত পাল্টানো হয়। ফলে রাজনীতি পরিণত হয়েছে এক অনন্ত সন্দেহের যাত্রায়, যেখানে সবাই সবাইকে ভীতির চোখে দেখে, সবাই মনে করে অন্যজন তাকে প্রতারিত করবে। এই ভয়, এই অবিশ্বাস, এই সন্দেহ—সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন মনোবিজ্ঞানের এক অসুস্থ প্রতিচ্ছবি।
জুলাই সনদ—যা অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে—সেটিও এখন রাজনৈতিক কৌশলের প্রতীক হয়ে গেছে। ২৪টি দল স্বাক্ষর করলেও, সনদের আত্মা কোথাও হারিয়ে গেছে দলীয় স্বার্থের অন্ধকারে। সনদে লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি, কারণ স্বাক্ষরকারীরা কেউই নিজের ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। ঐক্যের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিভেদের অগণিত রেখা। প্রতিটি দল অন্য দলের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান; কেউই চায় না অন্য কেউ লাভবান হোক। এর ফলে ঐক্য নামের ধারণাটিই পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক অভিনয়-অঙ্গনে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার বলেছেন, “নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে”—এই বক্তব্যে তিনি স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে চাইলেও বাস্তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। দলগুলোর ভেতরকার পারস্পরিক অবিশ্বাস এত গভীর যে কোনো আশ্বাসই এখন বিশ্বাসে রূপ নিতে পারছে না। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—প্রতিটি দলই নিজের অবস্থান থেকে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এক দল বলে, সরকারের ভেতরে প্রতিপক্ষ দলের অনুগত উপদেষ্টা রয়েছে; আরেক দল বলে, প্রশাসনে পক্ষপাত চলছে। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি পক্ষ মনে করে ক্ষমতার কেন্দ্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মানসিকতা কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই জটিল করছে না, বরং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিএনপি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আলোচনায়। তাদের বিস্তৃত সংগঠন, শক্তিশালী তৃণমূল এবং আন্দোলন পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাদের নির্বাচনে এগিয়ে রাখার কথা। কিন্তু তাদের বড় শত্রু বাইরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিজেদের ভেতরের বিভাজন। স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থী বাছাইয়ে দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা আজ মারাত্মকভাবে পরীক্ষার মুখে। দলটি যদি এই ভেতরের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, বাস্তব ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। কারণ রাজনীতির ইতিহাস প্রমাণ করেছে—বৃহৎ জনপ্রিয়তা সবসময় নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করে না; সাফল্য আসে সংগঠিত ঐক্য থেকে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো কিন্তু কৌশলী খেলোয়াড়, আবারও দৃশ্যপটে ফিরে এসেছে নতুন রূপে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জামায়াত কখনো স্থায়ী মিত্রের প্রতি অনুগত ছিল না; বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে তারা সবসময় নিজের অবস্থান বদলেছে। একসময় বিএনপির ছায়ায় থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে, আবার সুবিধা পেলেই সেই ছায়া থেকে সরে গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছে। এখনো তারা সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে। জামায়াত জানে, জনগণের একাংশ এখনো তাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা করেনি। তাই তারা কৌশলগতভাবে আত্মসমালোচনার মুখোশ পরেছে। জামায়াত আমিরের “ক্ষমা প্রার্থনা” মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ ভোটারের সন্দেহ হ্রাস করা। কিন্তু এ ক্ষমা কতটা আন্তরিক, তা নিয়েই প্রশ্ন। একই সঙ্গে জামায়াতের আরেকটি কৌশল হলো বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করা। ইসলামপন্থী ছোট দলগুলোকে নিজের প্রভাবে টেনে এনে তারা চায় বিএনপিকে একা করে ফেলতে, যাতে নির্বাচনী জোট দুর্বল হয় এবং ভোটের মাঠে বিভাজন তৈরি হয়।
জামায়াতের এই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি বরাবরই ঠান্ডা মাথার। তারা জানে, গণভোট, আইন সংশোধন, কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার মতো ইস্যুগুলো জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিভ্রান্তি মানে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তা মানে ভোটার উদাসীনতা। ভোটার উপস্থিতি যত কমবে, জামায়াতের সংগঠিত ভোট তত বেশি কার্যকর হবে। এই হিসাব নিখুঁত, তবে বিপজ্জনক—কারণ এটি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন মানুষ ভোট দিতে আগ্রহ হারায়, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে নতুন দল এনসিপি—জুলাই আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে জন্ম নেওয়া—রাজনীতিতে নতুন রক্ত আনবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা এখনো দলীয় কোন্দল, প্রতীকের সংকট ও নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জর্জরিত। শাপলা প্রতীক নিয়ে তাদের অনমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে, তারা এখনো মতাদর্শের চেয়ে প্রতীকের রাজনীতিতে বন্দি। জামায়াতের সঙ্গে প্রাথমিক ঐক্য গড়ে তোলা সত্ত্বেও, পরবর্তীতে সেই সম্পর্কের দ্রুত ভাঙন দেখিয়েছে যে, নতুন দলগুলোও পুরোনো রাজনীতির রোগে আক্রান্ত—অবিশ্বাস ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা।
এনসিপি নিজেকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও, তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং স্পষ্ট নীতিগত অবস্থানের অভাব তাদের রাজনীতিকে অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। তারা এখনো কোনো গণমুখী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি; বরং তারা এক প্রকার প্রতীকনির্ভর জনপ্রিয়তা খুঁজছে, যা গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তিকে ক্ষয় করে দেয়।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এই রাজনৈতিক বিভাজন, এই অবিশ্বাস, এই শত্রুমিত্রের অন্তহীন খেলায় দেশের গণতন্ত্র কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রবণতা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো “অবিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।” দলগুলো যেমন পরস্পরকে সন্দেহ করে, তেমনি জনগণও সন্দেহ করতে শুরু করেছে দলগুলোকে। মানুষের মনে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে এক ধরনের রাজনৈতিক নৈরাশ্য—তারা মনে করছে, ক্ষমতার পালাবদল যেভাবেই হোক না কেন, পরিবর্তন আসবে না। এই মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক সংকেত। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণের আস্থা। যখন জনগণ রাজনীতিকদের ওপর বিশ্বাস হারায়, তখন গণতন্ত্র কাগজের ধারণায় পরিণত হয়। আর এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনীতিকে ফিরতে হবে নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতি সেই পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছে। দলগুলো এখন জনগণের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার দালাল গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। একদল অন্য দলের পতনের অপেক্ষায়, আর জনগণ নীরবে তাকিয়ে থাকে কে কাকে পরাস্ত করে। এই নীরবতা গণতন্ত্রের মৃত্যুর আরেক নাম।
ধর্মীয় অনুভূতিও এখন রাজনীতির হাতিয়ার। জামায়াতের ধর্মভিত্তিক প্রচার, বিএনপির মধ্যপন্থী অবস্থান, এনসিপির ইসলামপন্থী আবহ—সব মিলিয়ে ধর্ম এখন আর মূল্যবোধ নয়, বরং ভোটের সমীকরণের অংশ। নীতির জায়গা নিয়েছে ধর্মীয় কৌশল, আর নৈতিকতার জায়গা দখল করেছে সুযোগবাদিতা। এই প্রবণতা কেবল রাজনীতিকদের নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। জনগণকে বিশ্বাস করানো যে, নির্বাচন সত্যিই নিরপেক্ষ হবে, ফলাফল প্রভাবিত হবে না, প্রশাসন কোনো দলের অনুগত নয়—এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে হবে কার্যকর কর্মের মাধ্যমে। কেবল বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সত্যিই একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে—অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র টিকে না। নির্বাচন বর্জনের হুমকি কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে।রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্র হারায় তার আদর্শিক ভিত্তি। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সেই বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্ষমতার লোভ, অন্যদিকে ভয়াবহ অবিশ্বাস—এই দুইয়ের সংঘাতে নষ্ট হচ্ছে গণতন্ত্রের শিকড়। দলগুলো যদি এখনই আত্মসমালোচনায় না ফেরে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠবে, যেখানে বিশ্বাস নামক শব্দটি ইতিহাসের বিষয় হয়ে যাবে।
অবিশ্বাসের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাকে ধ্বংস করে? ইতিহাস বলে, অবিশ্বাস ধ্বংস করে সবাইকে। যিনি প্রতিপক্ষকে সন্দেহ করেন, তিনিও নিরাপদ থাকেন না; কারণ অবিশ্বাস সংক্রমিত হয়। যেমন ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়, তেমনি অবিশ্বাসও শেষ পর্যন্ত তার উৎসকে গ্রাস করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই চক্রটি এখন পূর্ণবৃত্তে পৌঁছেছে। যারা একসময় প্রতিপক্ষকে “অবিশ্বাসযোগ্য” বলেছিল, আজ তারাই অন্য কারও অবিশ্বাসের শিকার। এই চক্র ভাঙতে না পারলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল কল্পনা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই আস্থা পুনর্গঠনের ওপর। দলগুলোকে বুঝতে হবে—রাজনীতি শত্রুমিত্রের খেলা নয়, বরং জাতির সম্মিলিত অগ্রযাত্রার প্রকল্প। ভিন্ন মত মানেই শত্রু নয়, ভিন্ন অবস্থান মানেই দেশবিরোধিতা নয়। যে দিন এই মানসিকতা রাজনীতিতে ফিরে আসবে, সে দিনই গণতন্ত্র সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারবে।
এখন সময় এসেছে রাজনীতির ভাষা পরিবর্তনের। সময় এসেছে অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে সহাবস্থানের সেতু গড়ে তোলার। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে দেখা গেছে, যারা পরস্পরের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত থেকেছে তারা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিও যদি সেই পথে হাঁটে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু হারানো গণতন্ত্রের গল্পই শুনবে।
বিশ্বাস, স্বচ্ছতা, সহযোগিতা—এই তিনটি শব্দ এখন বাংলাদেশের রাজনীতির পুনর্জন্মের চাবিকাঠি। দলগুলো যদি এই তিন শব্দের মর্ম উপলব্ধি না করে, তবে যত নির্বাচনই হোক না কেন, ফল একই থাকবে—অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু নেই, স্থায়ী মিত্রও নেই—এটা সত্য; কিন্তু যদি কোনো কিছু স্থায়ী হয়, সেটি হওয়া উচিত বিশ্বাস। কারণ বিশ্বাসই একমাত্র শক্তি, যা ভিন্নতাকে ঐক্যে রূপ দিতে পারে।বাংলাদেশের রাজনীতিকে তাই এখন এক নতুন নৈতিক দিগন্তে পৌঁছাতে হবে। যেখানে ক্ষমতা নয়, আস্থা হবে ভিত্তি; শত্রুতা নয়, সহযোগিতা হবে সংস্কৃতি। যদি এই পরিবর্তন সম্ভব হয়, তবে হয়তো আবারও রাজনীতির অভিধানে “বিশ্বাস” শব্দটি ফিরে আসবে। আর যদি না আসে, তবে ইতিহাসে লেখা থাকবে—এই দেশের রাজনীতি একদিন নিজেরাই নিজেদের অবিশ্বাসে ডুবে গিয়েছিল।

এসএম রায়হান মিয়া, কলাম লেখক গাইবান্ধা সদর গাইবান্ধা।

raihansm63@gmail.com

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

ক্ষমতা, কৌশল ও অবিশ্বাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:০৩:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আজ এক অনন্ত প্রতারণার রণক্ষেত্র। এখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব সময়ের সীমা অতিক্রম করে না; বরং প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি জোট, প্রতিটি চুক্তি যেন কেবল নির্দিষ্ট কৌশলগত প্রয়োজনে গঠিত এবং স্বার্থের ক্ষণস্থায়ী সমীকরণের ভেতরেই বিলীন হয়ে যায়। রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব বা শত্রুতার কোনো ধারণা যে বাস্তবে টেকে না, তা এ দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে। একদল ক্ষমতা থেকে পতিত হতেই অন্য দল তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, এবং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মিত্রতার ইতিহাসও পুনর্লিখিত হয়। এ এক অদ্ভুত রাজনীতি, যেখানে বিশ্বাস শব্দটি যেন অভিধান থেকে নির্বাসিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের আগমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। ক্ষমতার লাগামহীন ব্যবহার, প্রশাসনিক পক্ষপাত, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যুগ পেরিয়ে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল—এবার হয়তো সত্যিকার অর্থে একটি সুশাসনমুখী, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল ঠিক বিপরীত চিত্র। অবিশ্বাসের বীজ যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত, তা এই সরকারের অগ্রযাত্রাকেও অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢেকে দিয়েছে। একদিকে সরকার বলছে তারা নিরপেক্ষ, অন্যদিকে দলগুলো বলছে সরকার নিরপেক্ষ নয়; আবার দলগুলো একে অপরের ওপরও আঙুল তুলছে—কে কতটা আন্তরিক, কে কতটা ষড়যন্ত্রমূলক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বরাবরই ‘বিশ্বাস’ নামক মানসিক কাঠামোকে গ্রহণ করতে পারেনি। এখানে নীতির চেয়ে কৌশল গুরুত্বপূর্ণ, আদর্শের চেয়ে হিসাব প্রাধান্য পায়, আর প্রতিশ্রুতির চেয়ে অবস্থান দ্রুত পাল্টানো হয়। ফলে রাজনীতি পরিণত হয়েছে এক অনন্ত সন্দেহের যাত্রায়, যেখানে সবাই সবাইকে ভীতির চোখে দেখে, সবাই মনে করে অন্যজন তাকে প্রতারিত করবে। এই ভয়, এই অবিশ্বাস, এই সন্দেহ—সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন মনোবিজ্ঞানের এক অসুস্থ প্রতিচ্ছবি।
জুলাই সনদ—যা অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে—সেটিও এখন রাজনৈতিক কৌশলের প্রতীক হয়ে গেছে। ২৪টি দল স্বাক্ষর করলেও, সনদের আত্মা কোথাও হারিয়ে গেছে দলীয় স্বার্থের অন্ধকারে। সনদে লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি, কারণ স্বাক্ষরকারীরা কেউই নিজের ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। ঐক্যের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিভেদের অগণিত রেখা। প্রতিটি দল অন্য দলের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান; কেউই চায় না অন্য কেউ লাভবান হোক। এর ফলে ঐক্য নামের ধারণাটিই পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক অভিনয়-অঙ্গনে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার বলেছেন, “নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে”—এই বক্তব্যে তিনি স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে চাইলেও বাস্তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। দলগুলোর ভেতরকার পারস্পরিক অবিশ্বাস এত গভীর যে কোনো আশ্বাসই এখন বিশ্বাসে রূপ নিতে পারছে না। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—প্রতিটি দলই নিজের অবস্থান থেকে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এক দল বলে, সরকারের ভেতরে প্রতিপক্ষ দলের অনুগত উপদেষ্টা রয়েছে; আরেক দল বলে, প্রশাসনে পক্ষপাত চলছে। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি পক্ষ মনে করে ক্ষমতার কেন্দ্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মানসিকতা কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই জটিল করছে না, বরং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিএনপি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আলোচনায়। তাদের বিস্তৃত সংগঠন, শক্তিশালী তৃণমূল এবং আন্দোলন পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাদের নির্বাচনে এগিয়ে রাখার কথা। কিন্তু তাদের বড় শত্রু বাইরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিজেদের ভেতরের বিভাজন। স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থী বাছাইয়ে দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা আজ মারাত্মকভাবে পরীক্ষার মুখে। দলটি যদি এই ভেতরের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, বাস্তব ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। কারণ রাজনীতির ইতিহাস প্রমাণ করেছে—বৃহৎ জনপ্রিয়তা সবসময় নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করে না; সাফল্য আসে সংগঠিত ঐক্য থেকে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো কিন্তু কৌশলী খেলোয়াড়, আবারও দৃশ্যপটে ফিরে এসেছে নতুন রূপে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জামায়াত কখনো স্থায়ী মিত্রের প্রতি অনুগত ছিল না; বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে তারা সবসময় নিজের অবস্থান বদলেছে। একসময় বিএনপির ছায়ায় থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে, আবার সুবিধা পেলেই সেই ছায়া থেকে সরে গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছে। এখনো তারা সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে। জামায়াত জানে, জনগণের একাংশ এখনো তাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা করেনি। তাই তারা কৌশলগতভাবে আত্মসমালোচনার মুখোশ পরেছে। জামায়াত আমিরের “ক্ষমা প্রার্থনা” মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ ভোটারের সন্দেহ হ্রাস করা। কিন্তু এ ক্ষমা কতটা আন্তরিক, তা নিয়েই প্রশ্ন। একই সঙ্গে জামায়াতের আরেকটি কৌশল হলো বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করা। ইসলামপন্থী ছোট দলগুলোকে নিজের প্রভাবে টেনে এনে তারা চায় বিএনপিকে একা করে ফেলতে, যাতে নির্বাচনী জোট দুর্বল হয় এবং ভোটের মাঠে বিভাজন তৈরি হয়।
জামায়াতের এই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি বরাবরই ঠান্ডা মাথার। তারা জানে, গণভোট, আইন সংশোধন, কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার মতো ইস্যুগুলো জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিভ্রান্তি মানে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তা মানে ভোটার উদাসীনতা। ভোটার উপস্থিতি যত কমবে, জামায়াতের সংগঠিত ভোট তত বেশি কার্যকর হবে। এই হিসাব নিখুঁত, তবে বিপজ্জনক—কারণ এটি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন মানুষ ভোট দিতে আগ্রহ হারায়, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে নতুন দল এনসিপি—জুলাই আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে জন্ম নেওয়া—রাজনীতিতে নতুন রক্ত আনবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা এখনো দলীয় কোন্দল, প্রতীকের সংকট ও নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জর্জরিত। শাপলা প্রতীক নিয়ে তাদের অনমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে, তারা এখনো মতাদর্শের চেয়ে প্রতীকের রাজনীতিতে বন্দি। জামায়াতের সঙ্গে প্রাথমিক ঐক্য গড়ে তোলা সত্ত্বেও, পরবর্তীতে সেই সম্পর্কের দ্রুত ভাঙন দেখিয়েছে যে, নতুন দলগুলোও পুরোনো রাজনীতির রোগে আক্রান্ত—অবিশ্বাস ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা।
এনসিপি নিজেকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও, তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং স্পষ্ট নীতিগত অবস্থানের অভাব তাদের রাজনীতিকে অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। তারা এখনো কোনো গণমুখী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি; বরং তারা এক প্রকার প্রতীকনির্ভর জনপ্রিয়তা খুঁজছে, যা গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তিকে ক্ষয় করে দেয়।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এই রাজনৈতিক বিভাজন, এই অবিশ্বাস, এই শত্রুমিত্রের অন্তহীন খেলায় দেশের গণতন্ত্র কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রবণতা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো “অবিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।” দলগুলো যেমন পরস্পরকে সন্দেহ করে, তেমনি জনগণও সন্দেহ করতে শুরু করেছে দলগুলোকে। মানুষের মনে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে এক ধরনের রাজনৈতিক নৈরাশ্য—তারা মনে করছে, ক্ষমতার পালাবদল যেভাবেই হোক না কেন, পরিবর্তন আসবে না। এই মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক সংকেত। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণের আস্থা। যখন জনগণ রাজনীতিকদের ওপর বিশ্বাস হারায়, তখন গণতন্ত্র কাগজের ধারণায় পরিণত হয়। আর এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনীতিকে ফিরতে হবে নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতি সেই পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছে। দলগুলো এখন জনগণের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার দালাল গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। একদল অন্য দলের পতনের অপেক্ষায়, আর জনগণ নীরবে তাকিয়ে থাকে কে কাকে পরাস্ত করে। এই নীরবতা গণতন্ত্রের মৃত্যুর আরেক নাম।
ধর্মীয় অনুভূতিও এখন রাজনীতির হাতিয়ার। জামায়াতের ধর্মভিত্তিক প্রচার, বিএনপির মধ্যপন্থী অবস্থান, এনসিপির ইসলামপন্থী আবহ—সব মিলিয়ে ধর্ম এখন আর মূল্যবোধ নয়, বরং ভোটের সমীকরণের অংশ। নীতির জায়গা নিয়েছে ধর্মীয় কৌশল, আর নৈতিকতার জায়গা দখল করেছে সুযোগবাদিতা। এই প্রবণতা কেবল রাজনীতিকদের নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। জনগণকে বিশ্বাস করানো যে, নির্বাচন সত্যিই নিরপেক্ষ হবে, ফলাফল প্রভাবিত হবে না, প্রশাসন কোনো দলের অনুগত নয়—এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে হবে কার্যকর কর্মের মাধ্যমে। কেবল বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সত্যিই একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে—অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র টিকে না। নির্বাচন বর্জনের হুমকি কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে।রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্র হারায় তার আদর্শিক ভিত্তি। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সেই বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্ষমতার লোভ, অন্যদিকে ভয়াবহ অবিশ্বাস—এই দুইয়ের সংঘাতে নষ্ট হচ্ছে গণতন্ত্রের শিকড়। দলগুলো যদি এখনই আত্মসমালোচনায় না ফেরে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠবে, যেখানে বিশ্বাস নামক শব্দটি ইতিহাসের বিষয় হয়ে যাবে।
অবিশ্বাসের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাকে ধ্বংস করে? ইতিহাস বলে, অবিশ্বাস ধ্বংস করে সবাইকে। যিনি প্রতিপক্ষকে সন্দেহ করেন, তিনিও নিরাপদ থাকেন না; কারণ অবিশ্বাস সংক্রমিত হয়। যেমন ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়, তেমনি অবিশ্বাসও শেষ পর্যন্ত তার উৎসকে গ্রাস করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই চক্রটি এখন পূর্ণবৃত্তে পৌঁছেছে। যারা একসময় প্রতিপক্ষকে “অবিশ্বাসযোগ্য” বলেছিল, আজ তারাই অন্য কারও অবিশ্বাসের শিকার। এই চক্র ভাঙতে না পারলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল কল্পনা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই আস্থা পুনর্গঠনের ওপর। দলগুলোকে বুঝতে হবে—রাজনীতি শত্রুমিত্রের খেলা নয়, বরং জাতির সম্মিলিত অগ্রযাত্রার প্রকল্প। ভিন্ন মত মানেই শত্রু নয়, ভিন্ন অবস্থান মানেই দেশবিরোধিতা নয়। যে দিন এই মানসিকতা রাজনীতিতে ফিরে আসবে, সে দিনই গণতন্ত্র সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারবে।
এখন সময় এসেছে রাজনীতির ভাষা পরিবর্তনের। সময় এসেছে অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে সহাবস্থানের সেতু গড়ে তোলার। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে দেখা গেছে, যারা পরস্পরের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত থেকেছে তারা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিও যদি সেই পথে হাঁটে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু হারানো গণতন্ত্রের গল্পই শুনবে।
বিশ্বাস, স্বচ্ছতা, সহযোগিতা—এই তিনটি শব্দ এখন বাংলাদেশের রাজনীতির পুনর্জন্মের চাবিকাঠি। দলগুলো যদি এই তিন শব্দের মর্ম উপলব্ধি না করে, তবে যত নির্বাচনই হোক না কেন, ফল একই থাকবে—অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু নেই, স্থায়ী মিত্রও নেই—এটা সত্য; কিন্তু যদি কোনো কিছু স্থায়ী হয়, সেটি হওয়া উচিত বিশ্বাস। কারণ বিশ্বাসই একমাত্র শক্তি, যা ভিন্নতাকে ঐক্যে রূপ দিতে পারে।বাংলাদেশের রাজনীতিকে তাই এখন এক নতুন নৈতিক দিগন্তে পৌঁছাতে হবে। যেখানে ক্ষমতা নয়, আস্থা হবে ভিত্তি; শত্রুতা নয়, সহযোগিতা হবে সংস্কৃতি। যদি এই পরিবর্তন সম্ভব হয়, তবে হয়তো আবারও রাজনীতির অভিধানে “বিশ্বাস” শব্দটি ফিরে আসবে। আর যদি না আসে, তবে ইতিহাসে লেখা থাকবে—এই দেশের রাজনীতি একদিন নিজেরাই নিজেদের অবিশ্বাসে ডুবে গিয়েছিল।

এসএম রায়হান মিয়া, কলাম লেখক গাইবান্ধা সদর গাইবান্ধা।

raihansm63@gmail.com