

|| বোরহান উদ্দীন ||
© ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ, এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতা—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ায় জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন সফল হলেও পরবর্তী সময়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—এই আন্দোলনের প্রাপ্তি কি সত্যিকার অর্থে জনমানুষের? নাকি নেতৃত্বের মধ্যে পুনরায় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
আজ যে আস্থা-সঙ্কট পুরো রাজনীতিকে গ্রাস করেছে, তার শিকড় রয়েছে এই প্রশ্নগুলোর গভীরে।
© আস্থা সংকট: আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে আন্দোলননির্ভর। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা জনগণের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ তৈরি করেছে— যাঁরা আন্দোলন পরিচালনা করেন, তাঁরা কি সত্যিই জনকল্যাণের লক্ষ্যে সংগ্রাম করেন, নাকি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার জন্য আন্দোলনকে ব্যবহার করেন?
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ, দল গঠন, ক্ষমতায় আসার প্রচেষ্টা—সবই জনগণের একাংশকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব যখন নিজেই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে, তখন জনতার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- “পরবর্তীতে কোনও আন্দোলন কি বিশ্বাসযোগ্য থাকবে?”
© জনগণ কি ভবিষ্যতে আবার আন্দোলনে নামবে?
এ প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। জনগণ প্রতারিত হলে ফিরে আসতে দেরি হয়—এটি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের পূর্বনির্ধারিত বাস্তবতা। কিন্তু একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, জীবনের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক টিকে থাকা, ন্যায়বিচারের অধিকার- এসব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন জনগণ আবারও রাস্তায় নামার সাহস সঞ্চয় করে।
অতএব বলা যায়, ভবিষ্যতে যদি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বা অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে জনগণ আবার আন্দোলনে ফিরতে পারে, তবে এবার তাদের বিশ্বাস হবে আরও সতর্ক, আরও শর্তসাপেক্ষ।
© ভবিষ্যৎ সরকার কি আন্দোলনের শক্তিকে ভয় পাবে?
এখানেই মূল সংকট। গণ–অভ্যুত্থান যেকোনো সরকারকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, গণশক্তিকে অবমূল্যায়ন করলে পতন অনিবার্য। সুশাসন ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতি অর্জন অসম্ভব। কিন্তু যদি ভবিষ্যতের সরকার মনে করে— “জনগণ একবার প্রতারিত হয়েছে, তাই তারা আর আন্দোলনে আসবে না”— তাহলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই আত্মতুষ্টি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
© ক্ষমতার রাজনীতি নাকি জনতার রাজনীতি?
৫ আগস্টের পর যাঁরা রাজনীতিতে যুক্ত হলেন, তাঁদের প্রতি জনগণের অবিশ্বাসের বড় কারণ একটি— আন্দোলনের চরিত্র এবং রাজনৈতিক চরিত্র আলাদা হওয়া উচিত; কিন্তু বাংলাদেশে তা প্রায়ই মিলে যায়। যেখানে আন্দোলনের নৈতিক শক্তি ক্ষমতার রাজনীতির হাতে চলে যায়, সেখানে মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে তাই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ-
১. স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা
আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং রাজনৈতিক অবস্থান কী—এটি পরিষ্কার করতে হবে।
২. জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা
ক্ষমতায় গেলে জনগণের প্রতি জবাবদিহি থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. নৈতিক নেতৃত্ব
শুধু আন্দোলনের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি নয়-দীর্ঘমেয়াদে তা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
© ভবিষ্যতের পথ: আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া কোনও স্থিতি নেই
গণতন্ত্র শুধুমাত্র নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের নাম নয়; এটি একটি বিশ্বাসের ব্যবস্থা। এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে, আন্দোলন দুর্বল হয়, রাজনৈতিক দলগুলো অকার্যকর হয়, রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। আজ বাংলাদেশ সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন না হলে ভবিষ্যতের কোনও আন্দোলনই শক্তিশালী হবে না এবং কোনও সরকারও দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে না।
© ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থান একটি পরিবর্তনের সূচনা ছিল; কিন্তু সেই পরিবর্তনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন:
রাজনৈতিক নৈতিকতা, নেতৃত্বের স্বচ্ছতা, জনগণের প্রতি সম্মান ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। জনগণ ভবিষ্যতে আন্দোলনে নামবে কিনা, বা সরকার সুশাসনে পথে হাঁটবে কিনা-এ সবকিছু নির্ভর করছে আস্থা পুনর্গঠনের উপর। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই আস্থা অর্জনে আন্তরিক না হবে, ততক্ষণ গণতন্ত্রও যেমন দুর্বল থাকবে, তেমনি রাষ্ট্রও ঝুঁকির মুখে থাকবে।
-লেখক: সাংবাদিক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত