
প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৫, ২০২৬, ২:০৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ৮, ২০২৫, ৫:১৫ পি.এম
পরিবেশ ও বায়ু দূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে খুলনা নগরীর ১৫ লক্ষ মানুষ!

বিপ্লব সাহা, খুলনা ব্যুরো: আলোচিতভাবে বিশ্বের অন্যতম বায়ু দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর এক নাম্বরে থাকার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসলেও কোন দিক থেকে পিছিয়ে নেই খুলনা শহর। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সকল মৌসুমে বায়ু ও পরিবেশ দূষণের দিক থেকে দুর্ভোগে ৬৪ টি জেলার মধ্যে এগিয়ে রয়েছে খুলনা শহর। বিশেষ করে খুলনা শহরাঞ্চলের ভুক্তভোগীদের কথা পরিবেশ সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি শীতের শুষ্ক মৌসুমে খুলনা শহরের বাতাস প্রতিদিনই ধুলাদূষণে ভারী হয়ে উঠছে। সড়ক নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানার ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে প্রতিনিয়ত দূষণের মাত্রা বাড়ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০২৭ সালের মধ্যে খুলনাকে একটি স্বাস্থ্যকর শহরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবুও বায়ুর মান উদ্বেগজনকভাবে খারাপ অবস্থায় রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি শুধু বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যকেই নয়, তাদের জীবন-জীবিকাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে খুলনার বাতাস ছিল পুরোপুরি অস্বাস্থ্যকর। গতকাল রোববার বেলা ৩টার দিকে খুলনার বাতাসের মান ছিল ১৬০। এই মানে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব অনুভূত হয়। আর সংবেদনশীলরা (শিশু, হাঁপানিতে আক্রান্ত এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা) আরও গুরুতর প্রভাব অনুভব করেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তবে মঙ্গল ও বুধবার বাতাস মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিলো। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) বা পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয় এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো ভূমিকা রাখছে না। নগরবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে খুলনা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মাসের পর মাস শহরের রাস্তাগুলো কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। ফলে রাস্তাজুড়ে জমে থাকা ধুলা পরিবেশ দূষণের মাত্রা ভয়াবহ বাড়িয়ে তুলেছে। কেসিসির ৮২৩ কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্প, ৬০৭ কোটি টাকার রাস্তা উন্নয়ন কার্যক্রম এবং খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২৫৯ কোটি টাকার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পসহ অন্যান্য সংস্থার অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে এ সমস্যাকে তীব্রতর করেছে। দীর্ঘমেয়াদি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব প্রকল্প শহরজুড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত শিল্প কার্যক্রম, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং নির্গমণ নিয়ন্ত্রণের অভাবে ক্রমবর্ধমান মোটরযানের সংখ্যা। এসব কারণ খুলনার বায়ুর গুণমানকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। খুলনার খালিশপুরের বাসিন্দা অজয় সরকার একজন সেলুনের মালিক। তার পরিবারে এর আগে কোনো অ্যাজমার রোগী ছিল না; কিন্তু তিনি হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ধুলার মধ্যে বসবাস করার কারণে আমার এই রোগ হয়েছে। যার কারণে আমার জীবিকাতেও আঘাত লেগেছে।’ একইভাবে শহরের খালিশপুর, নেভি চেকপোস্ট, জোড়া গেট, জয়বাংলা মোড়, জিরো পয়েন্ট, সোনাডাঙ্গা এবং অন্যান্যসহ একাধিক ওয়ার্ডজুড়ে একাধিক বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে ধুলা সহ্য করে বসবাস করছেন। খুলনা শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বাইপাস রোড। সেখান থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার গণপরিবহন খুলনা শহরের বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ করে। ওই সড়কটি দীর্ঘ এক যুগ ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় থাকার কারণে সেখানে প্রতিনিয়ত বাতাস দূষিত থাকে। একই ভাবে ১৩ বছর ধরে নির্মাণাধীন শিপইয়ার্ড সড়কের অবস্থাও একই। সময়মতো প্রকল্প শেষ করতে না পারায় ঠিকাদার ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলির সমালোচনা খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘তারা রাস্তার উপর নির্মাণ সামগ্রী ফেলে দেয়, যা আরও দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ওয়াসা, কেসিসি এবং কেডিএকে অবশ্যই তাদের সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ শেষ করতে হবে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলনার বায়ুর গুণমান প্রায়ই অস্বাস্থ্যকর মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়। শহরে সবুজ স্থানের অভাব এবং নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলে রাখার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে শহরবাসীকে প্রতিনিয়ত ধূলিকণার দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ধূলিকণার সংস্পর্শে থাকার কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের প্রভাষক সাধন চন্দ্র স্বর্ণকার বলেন, ‘বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এ সংকট মোকাবিলা করার জন্য, সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যার মধ্যে রয়েছে পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, গণপরিবহন বর্ধিতকরণ এবং সচেতনতা প্রচারাভিযান।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল আজিজ বলেন, ‘সড়কের ধুলা নিবারণের জন্য কেসিসি পানির ট্যাংক দিয়ে সজ্জিত দুটি আধুনিক রোড-সুইপিং ট্রাক ব্যবহার করে। নিয়মিত ধুলো পরিষ্কার করার জন্য আমাদের আরও সুইপিং মেশিনের প্রয়োজন। এছাড়া, বাড়ির মালিকরা অসতর্কতার সাথে রাস্তায় বালু এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ করে, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে রাখার ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ হচ্ছে এর প্রতিকার হিসাবে প্রতিটি নাগরিকেরই সচেতন অবস্থায় থাকা কর্তব্য।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত