প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ১১:০৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ১১, ২০২৬, ১০:১৫ এ.এম

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়; এটি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই সত্যকে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রমাণ করেছেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন, বরং ত্যাগ, মানবিকতা এবং গণসংযোগের মাধ্যমে নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক ও জননেতার মর্যাদা অর্জন করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে তিনি দলের নেতৃত্বে নতুন যুগের সূচনা করেছেন।
তার রাজনৈতিক যাত্রাপথকে সহজভাবে বোঝা যায় তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যাওয়ার ধারাবাহিকতায়। ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হতে থাকে। এর আগে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
সেখানে তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার, কার্ল মার্কসসহ বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক ও দার্শনিকদের চিন্তাধারা অধ্যয়ন করেন। এই শিক্ষাজীবন তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বের প্রজ্ঞাকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে তিনটি প্রধান স্তম্ভ—নির্বাচন, আন্দোলন এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগ। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদ করে তিনি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হন। তাঁকে এবং তাঁর মাকে একাধিকবার গৃহবন্দী করা হলেও তিনি কখনো ভীত হননি। বরং এই পরিস্থিতি তাঁকে আরও দৃঢ় করে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংযুক্ত করেছে।
১৯৯০-এর আন্দোলনের সময় সরাসরি রাজপথে অংশগ্রহণ করে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে—নেতৃত্ব মানে শুধু পদ বা ক্ষমতা নয়, বরং দায়িত্ব নেওয়া এবং সংকটের সময়ে জনগণের পাশে থাকা।
তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন চালু করা। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং দলীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সূচনা। অন্যান্য জেলা ইউনিটগুলোও এই প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করে। এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক দলের ভিত মজবুত করে, সদস্যদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার মানসিকতা তৈরি করে।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকায় একটি গবেষণা ও নীতিনির্ধারণমূলক অফিস স্থাপন করেন তিনি। এখানে স্থানীয় সমস্যা, সুশাসন এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে বিএনপি ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—দলের প্রধানের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ করেননি। বরং দলকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, তার নেতৃত্ব ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, সংগঠন ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়।
২০০২ সালে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশব্যাপী গণসংযোগ শুরু করেন। যুবদল, ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে নেতাকর্মীদের কথা শোনেন, মতামত নেন এবং সংগঠনের দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। এই সময় থেকেই তিনি কেবল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন, বরং দক্ষ সংগঠক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিতি পান। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠন-দক্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধ মিলিয়ে তিনি দলের ভেতরে নতুন জীবন সঞ্চার করেন।
২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত সরকারের সময় গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ আঠারো মাস কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালে মুক্তি পান। এরপর যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার জন্য যান। এই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়নি। দেশে ফিরে আবারও দলের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০০৯ সালের বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ৮৪টি মামলা করা হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালে সব মামলা থেকে খালাস পান। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে লাখো মানুষ তাঁকে গণসংবর্ধনা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, জনগণ তার নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁর গুরুত্বকে স্বীকৃত করেছে।
তারেক রহমান শুধু নেতা নয়, মানবিকতার প্রতীকও। কঠিন সময়ে দলের নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারদের পাশে দাঁড়ানো, বসতভিটা নির্মাণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিবারগুলোর মধ্যে মানবিকতার সংস্কৃতি স্থাপন করেছেন। এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক নেতা হওয়া মানে শুধু নীতি প্রণয়ন নয়; মানবিক দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি একটি কল্যাণমূলক, জনবান্ধব রাষ্ট্রগঠনের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। ৩১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড এবং হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের সামাজিক নীতি ও জনকল্যাণের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্ব শূন্য হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি এখন দলের নেতৃত্বে—এক নতুন সময়ের প্রত্যাশা নিয়ে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং কর্মপরিকল্পনা মূলত জনগণের কল্যাণ, গণতন্ত্রের শক্তি এবং নেতৃত্বের দায়িত্বের উপর কেন্দ্রীভূত। তিনি বারবার বলেছেন, রাজনীতি মানে জনগণের সেবা, ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়। নেতার দায়িত্ব জনগণের পাশে দাঁড়ানো, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধারাবাহিক কর্মসূচি তাকে কেবল দলের নয়, দেশেরও একজন উল্লেখযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব—জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান—একমাত্র উদাহরণ যেখানে ক্রান্তিকালীন সময়ে দেশের নেতৃত্ব জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হয়েছে। তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের জন্য আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। দেশে ফিরে তিনি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন।
তার যাত্রাপথ প্রমাণ করে, রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তানও যদি নিজের ত্যাগ, শ্রম এবং দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কাজ করে, তবে কেবল পরিবার নয়, জনগণও তার নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেয়। বর্তমান সময়ে দেশের যুবসমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।আর তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ, সংগঠন ও দেশকে শক্তিশালী করা। দীর্ঘ সময়ের কঠোর পরিশ্রম, সংগঠন এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় তিনি কেবল বিএনপির নয়, দেশেরও একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।তাঁর উদাহরণ দেখাচ্ছে—নেতৃত্বের সত্যিকারের মানদণ্ড হলো ক্ষমতা নয়, বরং জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকা এবং নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের সাহস দেখানো। রাজনৈতিক ইতিহাসের এই অধ্যায় নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়, যে নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তি নয়, জনগণের স্বার্থ ও উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হতে হবে।
লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি