প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ১১:০৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ২০, ২০২৬, ২:৪৭ পি.এম
![]()
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা, জঙ্গল ছলিমপুর এলাকা, চট্টগ্রাম জেলা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। বিশেষ অভিযানে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্মম মৃত্যু এবং অন্য তিন জন সদস্যের অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রশ্ন ওঠে—এই অঞ্চলে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কতটা কার্যকর, আর কতটা কাগুজে?
জঙ্গল ছলিমপুর বহুদিন ধরেই একটি আতঙ্কের নাম। পাহাড়ি এই জনপদে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অপরাধের এক সমান্তরাল জগৎ। এখানে আইন চলে না সংবিধানের বিধানে, চলে শক্তির শাসনে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার রং বদলেছে, কিন্তু অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য থেকে গেছে। কেবল মুখ বদলেছে, কাঠামো বদলায়নি। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এখানকার সাধারণ মানুষ—আলীনগর, ছলিমপুর বাজার ও লিংক রোড এলাকার বাসিন্দারা, যাদের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দী। তারা জানে না কখন বা কোথা থেকে হামলা হবে, কখন তাদের প্রাপ্য অধিকার হরণ হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ধর্মীয় স্থাপনার অপব্যবহার। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে সহিংসতা আহ্বান করা শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটি ধর্মীয় মূল্যবোধেরও চরম অবমাননা। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া যে কোনো সভ্য সমাজের জন্য ভয়ংকর সংকেত। এ ধরনের ঘটনা সমাজে ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে—সীতাকুণ্ড থানার অধীনে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান মানেই বড় ঝুঁকি। মুহূর্তের মধ্যে শত শত সশস্ত্র মানুষ সংঘবদ্ধ হতে পারছে। এর অর্থ, এখানে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত বড় শক্তি কীভাবে এতদিন কার্যকর নজরদারির বাইরে রইল? কার অবহেলা, কার নীরব প্রশ্রয়ে এই সন্ত্রাসী বলয় গড়ে উঠেছে—এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নয়, সমগ্র প্রশাসনের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা।
জঙ্গল ছলিমপুরের সংকট কেবল অস্ত্রধারী সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাস জমি দখল, পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। পরিবেশ ধ্বংস করে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ভূমিধস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। এই অবৈধ অর্থনীতিই সন্ত্রাসকে অর্থ, আশ্রয় ও জনবল জোগান দিয়েছে।
এখানে অপরাধ ও রাজনীতির সম্পর্কও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারে রাজনৈতিক পরিচয় বহুবার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ বদলালেও অপরাধের চরিত্র বদলায়নি। এতে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে, গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয়েছে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমন পরিবেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তারা যদি সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নিত, সাধারণ মানুষ এত ভয়ভীতি ও অনিরাপত্তার মধ্যে থাকত না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তার মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। যারা মনে করে পাহাড়ের ভেতরে বসে তারা আইনের ঊর্ধ্বে, এই ঘটনা তাদের সেই দুঃসাহসেরই বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র যদি এই চ্যালেঞ্জের জবাব সময়মতো, দৃঢ় ও ন্যায়সংগতভাবে না দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তবে এটাও সত্য, শুধু অভিযানের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনও জরুরি। বহু মানুষ ভয়, জোর কিংবা জীবিকার তাগিদে সন্ত্রাসী কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা, শিক্ষা ও সামাজিক পুনর্বাসনের পথ তৈরি না করলে এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
এক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি অফিস এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে, খাস জমি উদ্ধার করতে হবে এবং অবৈধ অর্থনীতির মূল উৎসগুলো চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দখলদারি ও অনিয়মের পেছনে যেসব প্রভাবশালী শক্তি কাজ করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। স্থানীয় সমাজকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পৃক্ত করা, যৌথ উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, এগুলো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অসম্ভব। জনগণ যদি দেখবে যে অপরাধীরাই কখনো শাস্তিহীন থাকে, তাহলে তারা অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করবে।
এই প্রসঙ্গে, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক কমিটি সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তারা নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে সচেতনতা বৃদ্ধি, যুবসমাজকে সন্ত্রাস থেকে দূরে রাখার জন্য শিক্ষা এবং স্থানীয় সংঘর্ষ মোকাবেলায় সহযোগিতা করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের শাসনের দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করা। নিয়মিত টহল, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া জোরদার না হলে সাধারণ মানুষের ভয় কাটবে না। মানুষ যখন দেখবে অপরাধের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী, তখনই তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।
জঙ্গল ছলিমপুর আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না তুলে ধরেছে। সীতাকুণ্ড থানা, চট্টগ্রাম জেলা—এখানেই দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র যখন সময়মতো শক্ত অবস্থান নেয় না, সেখানে গড়ে ওঠে অঘোষিত রাজ্য। শুধু ছলিমপুর নয়, এর মতো পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য পাহাড়ি ও দূরদূরান্ত অঞ্চলেও বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার। প্রয়োজন শক্তি প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও মানবিক শাসন। জঙ্গল ছলিমপুরকে আর কোনো সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য হতে দেওয়া যায় না। এটি শুধু একটি এলাকার প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন।
অতএব, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই এখনই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। শুধু শাস্তি প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, পুনর্বাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ। এভাবেই জঙ্গল ছলিমপুরের মতো এলাকার প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।