
পিরোজপুর অফিস :: বরিশাল বিভাগের নদীবেষ্টিত জেলা পিরোজপুর। ঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। দক্ষিণাঞ্চলের এই জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে। জেলার অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা মৎস্য ও কৃষিনির্ভর হলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া তেমনভাবে লাগেনি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলার তিনটি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ২-৩টি দল ও কয়েকজন শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯২ হাজার ১৭৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭০৮ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬৯ জন। ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯ হাজার ২৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪ হাজার ৩১১ জন, নারী ২ লাখ ৪ হাজার ৯৭৯ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৪ জন। মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-৩ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২২ হাজার ৪৪ জন, নারী ১ লাখ ১৯ হাজার ৩১৫ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ জন। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে পুরোদমে। সকাল থেকে সন্ধ্যা-চায়ের দোকান, হাট-বাজার, গ্রাম-মহল্লা সর্বত্রই ভোটের আলোচনা। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাও ঘরে বসে নেই; ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
পিরোজপুর-১ : দক্ষিণাঞ্চলের আলোচিত এই আসনটি এবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন। অপরদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রয়াত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী। জোট রাজনীতির কারণে অতীতে এই আসন বিএনপিকে কখনো জামায়াত, কখনো জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। ফলে এবার তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নিজ দলের প্রার্থী চাওয়ার প্রবল দাবি ছিল। প্রথমে সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দারকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি সরে দাঁড়ান। পরে অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিএনপির তৃণমূলে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এই আসনের জয়-পরাজয় অনেকটাই নির্ভর করছে নাজিরপুর উপজেলার ভোটের ওপর। প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ভোটারের এই উপজেলায় প্রায় ৪৫ শতাংশ হিন্দু ভোটার রয়েছেন। অতীতে এই ভোটব্যাংক আওয়ামী লীগের দিকে গেলেও এবার তাদের অনুপস্থিতিতে ভোট কোন দিকে যাবে-তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি কৌতূহল। পিরোজপুর সদর ও পৌর এলাকায় অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনের নিজস্ব বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। তার পিতা দানবীর হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সামাজিকভাবেও তিনি এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে ইন্দুরকানী উপজেলায় জামায়াত প্রার্থী মাসুদ সাঈদীর পৈতৃক নিবাস এবং ব্যক্তিগত প্রভাব শক্তিশালী। ফলে এই আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই এখন সমানে সমান বলে মনে করছেন ভোটাররা।
পিরোজপুর-২ : ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেছারাবাদ নিয়ে গঠিত এই আসনে শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় জামায়াত প্রার্থী শামীম সাঈদী। দীর্ঘদিন ধরে একক প্রার্থী হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকায় জামায়াত এখানে সংগঠনিকভাবে এগিয়ে রয়েছে। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী মরহুম নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের পুত্র আহম্মদ সোহেল মঞ্জু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে নামার পর সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নির্বাচন না করলেও তার দুই চাচাতো ভাই স্বতন্ত্র ও জেপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
পিরোজপুর-৩ : মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ত্যাগী নেতা মো. রুহুল আমিন দুলাল। এলাকাজুড়ে তার জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মো. রুস্তম আলী ফরাজী। এছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থীও আলোচনায় রয়েছেন। অতীতের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে এবং এবারও রুহুল আমিন দুলালকে এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় ভোটাররা। পিরোজপুরের তিনটি আসনেই এবার হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। উন্নয়ন, জনসংযোগ ও ব্যক্তিগত ইমেজ-এই তিন বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ভোটার ও বিশ্লেষকরা।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত