অপু দাস, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: উত্তরাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৫৫০ শয্যা থেকে সম্প্রসারিত হয়ে ১২০০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকায় হাসপাতালটির সক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা, করিডর এমনকি সিঁড়ির পাশেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং সীমিত আইসিইউ সুবিধা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ৫৮টি ওয়ার্ডে ১২০০ শয্যার বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে আরও প্রায় ৭ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। কিন্তু এই বিপুল রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। ফলে একদিকে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে চিকিৎসকদের ওপর তৈরি হচ্ছে চরম চাপ।
জরুরি বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম হাসপাতাল হওয়ায় আশপাশের একাধিক জেলা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে ছুটে আসেন। ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, শয্যা ও জনবল বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার চাহিদা জানানো হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
বর্তমানে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ২৮৩ জন, ইন্টার্ন চিকিৎসক ২২০ জন এবং নার্স প্রায় ১২০০ জন। কিন্তু হাসপাতালের বর্তমান পরিধি ও রোগীর চাপ বিবেচনায় এই জনবল অপ্রতুল। ১৯৫৮ সালে ৫৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির শয্যা সংখ্যা বাড়লেও জনবল সেই পুরোনো কাঠামোতেই আটকে আছে।
ভর্তি হওয়া রোগীদের দুর্ভোগও চরমে পৌঁছেছে। অনেক রোগী বেড না পেয়ে মেঝে বা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকের দেখা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে দুর্বল রোগীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থা শিশু বিভাগে। তিনটি ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে ৫০০-এর বেশি শিশু ভর্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি বেডে ৩ থেকে ৫ জন শিশুকে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে মেঝে বা বারান্দায় অবস্থান করছেন। রাজশাহী ছাড়াও নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, জয়পুরহাট, কুষ্টিয়া ও ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীদের ভিড়ে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।
নার্সদের ভাষ্য, এভাবে গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়ায় সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
আইসিইউ সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে মোট ৪০টি আইসিইউ বেড রয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি। ভেন্টিলেটর আছে ৩৫টি। অথচ প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ জন গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউর অপেক্ষায় থাকে। কোনো বেড খালি হলেই নতুন রোগী ভর্তি করা সম্ভব হয়।
গত ১০ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটরের অভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
এদিকে, ২০২৩ সালে হাসপাতালের উত্তর-পশ্চিম পাশে টিবি হাসপাতালের কাছে ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মিত হলেও সেটি এখনো চালু হয়নি। নতুন ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে থাকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভেন্টিলেটর সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শিগগিরই হাসপাতালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত সম্পদ নিয়ে অতিরিক্ত রোগী সামাল দিতে গিয়ে তারা চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নতুন আইসিইউ সুবিধা চালু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে শয্যা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে এই হাসপাতালকে আবারও মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

