
মিথুশিলাক মুরমু----
Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics (BANBEIS)- এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি বিদ্যালয় এবং বাকীগুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে| আর ২১ হাজার ০৮৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬৯৩টি সরকারি এবং বাকীগুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত| রয়েছে জুনিয়র হাইস্কুল— ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা হয় এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৩৬৯টি| ব্যানবেইস-এর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ২,৭৮,৫১৮ জন| বাংলাদেশে ক্যাথলিক-প্রটেষ্ট্যাণ্টদের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী প্রাইমারি, জুনিয়র এবং হাইস্কুলের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৫০টি অধিক হতে পারে| এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খ্রিষ্টধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষা যথাযথভাবে অধ্যায়ন করা হলেও সরকারি-বেসরকারিভাবে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে খ্রিষ্টধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষার কোনো শিক্ষক নেই বললেই চলে|
মুঠো ফোনে কথা হচ্ছিল— বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার পাস্টর বিমল ত্রিপুরা’র সাথে| পাশ^বর্তী ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক খ্রিষ্টিয়ান শিক্ষার্থী বিভিন্ন শ্রেণীতে অধ্যয়ন করছে| অত্যন্ত উদ্বিগ্নের সাথে বলছিলেন, এখানে কোনো খ্রিষ্টিয়ান ধর্মের শিক্ষক নেই, ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা ‘খ্রিষ্টধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষা’ তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত কেউ-ই সঠিকভাবে পড়ার সুযোগ পায় না| আমরা একই চিত্র অবলোকন করেছি, রাজশাহী’র গোদাগাড়ী থানার গোমা উচ্চ বিদ্যালয়; জয়পুরহাটে অবস্থিত খঞ্জনপুর মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জের ˆবরচুনা হাইস্কুল এবং মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতেও| খ্রিষ্টিয়ান ছেলেমেয়েরা শ্রেণী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় বিশেষত এসএসসি পরীক্ষায় উক্ত সাবজেক্টে সন্তোষজনক মার্কস& নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে না| জিপিএ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সাবজেক্টি বেশ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়| জেনেছি— শিক্ষার্থীরা শ্রেণী ভেদে কখনো অন্য ধর্মের শিক্ষক কিংবা কখনো ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত থেকে থাকে কর্তৃপক্ষ| আশ্চর্য হয়েছি যে, কোথাও কোথাও খ্রিষ্টান ছেলেমেয়েদেরকে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করা হয় এবং আমাদের শিক্ষার্থীরা সেটি গ্রহণ করে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন| নিজ ধর্ম ব্যতিত অন্য ধর্ম অধ্যয়ন ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণে সুদুরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে বলে খ্রিষ্টিয়ান বিশ্লেষকগণ মনে করেন| যেমন—
১. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রণীত ‘খ্রিষ্টধর্ম ও ˆনতিক’ শিক্ষা ৩য় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সরকার কর্তৃক ¯^ীকৃত ও অনুমোদিত| তাহলে কেন খ্রিষ্টান শিক্ষার্থীদের অন্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করতে হচ্ছে! এটি নিঃসন্দেহে গর্হিত অপরাধ|
২. খ্রিষ্টান ছেলেমেয়েরা ক্রমশঃই নিজ ব্যতিত অন্য ধর্মপুস্তক অধ্যয়ন করতে করতে সেই ধর্মের প্রতি অনুরক্ত ও আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং পরবর্তীকালে সেই ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি;
৩. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে অধ্যয়ন করতে করতে এক সময় নিজ¯^ ধর্ম থেকে সেই ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি এবং ধর্মতাত্ত্বিক দিকগুলো তাদের কাছে গ্রাহ্যণীয় হয়ে ওঠে|
৪. একজনের দেখাদেখি বিদ্যালয়ের অন্য খ্রিষ্টান শিক্ষাথীরাও উৎসাহিত ও উজ্জীবিত হয়ে থাকে| এটি আমাদের কাম্য নয়|
একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করেছি, বিশেষত বান্দরবান লামা এবং নওগাঁ ধামুইরহাট পাইলট হাইস্কুল কিংবা খঞ্জনপুর মিশন বালিকা বিদ্যালয়ের সাথে| কখনো কখনো অল্প সংখ্যক খ্রিষ্টান শিক্ষার্থী থাকায় প্রধান শিক্ষক চাহিদাপত্র শিক্ষা বোর্ডগুলোতে প্রেরণ করতে পারেন না কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ শিক্ষার্থী থাকার পরও কেন শিক্ষকের চাহিদাপত্র দাখিল করছেন না, এটি আমাদের বোধগম্য নয়| অপরদিকে অন্তত দুটি বিদ্যালয়ে জেনেছি, যেখানে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী না হয়েও ‘খ্রিষ্টান ধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষা’র শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করে চলেছেন| তথ্যানুযায়ী, প্রত্যেককে ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) কর্তৃক তালিকাবদ্ধ হয়ে চাহিদা দেওয়া বিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ প্রদান করা হয়ে থাকে| সহকারী শিক্ষক (ধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষা) খ্রিষ্টান ধর্মের ক্ষেত্রে (¯^ীয় ধর্মের):
ক. থিওলজিক্যাল কোর্স সম্পন্নকরণসহ স্নাতক ডিগ্রি ও বিএড ডিগ্রি;
খ. থিওলজিক্যাল কোর্স সম্পন্নকরণসহ স্নাতক ডিগ্রি
গ. সমগ্র শিক্ষা জীবনে ১ (এক)টির বেশি ৩য় বিভাগ/শ্রেণী/সমমান গ্রহণযোগ্য হবে না|
মাধ্যমিক কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনষ্টিটিউট দাখিল ভোকেশনাল মাদরাসা’র ক্ষেত্রে অবলোকন করেছি— খ্রিষ্টধর্মের ক্ষেত্রে থিওলজিক্যাল কোর্স সম্পন্নকরণসহ ২য় শ্রেণীর স্নাতক ডিগ্রি| সমগ্র শিক্ষা জীবনে যে কোনো ১টি ৩য় শ্রেণী/সমমান গ্রহণযোগ্য হবে|
অনুমিত হয় যে, দু’জন শিক্ষক কোথাও না কোথাও থেকে থিওলজিক্যাল কোর্সের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে খ্রিষ্টধর্ম ও ˆনতিক শিক্ষার ক্লাস পরিচালনা করছেন, এটি আমাদের সমগ্র খ্রিষ্টান সমাজের সাথে প্রতারণার সামিল|
আমরা সর্বত্রই পারমর্শ দিয়ে আসছি যে, কোনো বিদ্যালয়ে খ্রিষ্টান শিক্ষার্থী থাকলে অবশ্যই অবশ্যই প্রধান শিক্ষকের সাথে সংলাপ করে শিক্ষার্থীদের নিজ¯^ ধর্ম অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা| এক্ষেত্রে স্থানীয় পালক কিংবা অভিভাবকদেরকেও যথাসম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়াতে হতে পারে| যেমন— প্রয়োজনে পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ করা, পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও খাতা দেখা; আবার নিজ মণ্ডলীতে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও হতে পারে| অর্থাৎ প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর নিজ¯^ ধর্ম পড়ার অধিকার রয়েছে, এটি আমাদের সাংবিধানিক অধিকার| আমাদের পবিত্র সংবিধানে বর্ণিত রয়েছে— ৪১. (২) ‘কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির নিজ¯^ ধর্ম-সংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ কিংবা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না|’ একই সঙ্গে ‘ধর্ম প্রভৃতি কারণে ˆবষম্য’ শীর্ষক অনুচ্ছেদ ২৮.৩ বলা হয়েছে— ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না|’
১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| তবে নিয়োগের যোগ্যতা ও সনদ নিয়ে একটি জটিলতা রয়েছে| আশা করছি এটি কাটিয়ে শিগগিরই আমরা এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হবো| ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি|’ আমরা বিশ^াস করি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মশিক্ষক জটিলতা নিরসনে সরকার দ্রুত ও কার্যকারী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন|
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত