প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২৫, ২০২৬, ১২:১১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১৭, ২০২৬, ২:২২ পি.এম

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
গ্রীষ্ম এলেই দেশের বাজারগুলো রঙিন হয়ে ওঠে আম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা মৌসুমি ফলে। প্রকৃতির এই দান মানুষের কাছে যেমন আনন্দের, তেমনি পুষ্টির অন্যতম উৎসও বটে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আনন্দের মৌসুম ধীরে ধীরে আতঙ্কের মৌসুমে পরিণত হচ্ছে। কারণ মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বাজার ভরে যাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে চকচকে হলুদ আম ও টকটকে লালচে লিচুতে, যার বড় একটি অংশই কৃত্রিম রাসায়নিক প্রয়োগে পাকানো। বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে এসব ফলে মিশে থাকছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ী ও কেমিক্যাল সিন্ডিকেট অপরিপক্ব ফলকে দ্রুত বাজারজাত করতে ব্যবহার করছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন, ক্ষতিকর হরমোন ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক। ফলে মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে নীরব বিষ।
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় বিপুল পরিমাণ কেমিক্যালযুক্ত আম জব্দ হওয়ার ঘটনা আবারও স্পষ্ট করেছে যে, দেশে বিষাক্ত ফল বাণিজ্যের ভয়াবহতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিচ্ছিন্ন অভিযানে মাঝে মধ্যে কিছু ফল জব্দ হলেও বাস্তবতা হলো—এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই সংগঠিতভাবে সক্রিয় রয়েছে। মৌসুমের আগেই বাজারে ফল আনার প্রতিযোগিতা যেন এখন এক ধরনের অবৈধ অর্থনৈতিক দৌড়ে পরিণত হয়েছে। আর সেই প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফল পাকাতে ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইড মূলত শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক উপাদান, যা খাদ্যে ব্যবহারের কোনো সুযোগই নেই। এটি মানবদেহে প্রবেশ করলে পেটে তীব্র জ্বালাপোড়া, বমি, ডায়রিয়া, মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে অপরিপক্ব লিচু ও রাসায়নিকযুক্ত ফল শিশুদের শরীরে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, এসব ফল এনসেফালোপ্যাথির মতো জটিল মস্তিষ্কজনিত রোগের কারণ হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। অথচ এত বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের পরও বাজারে বিষাক্ত ফলের অবাধ বিচরণ প্রমাণ করে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা রয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিষ বাণিজ্যের খবর প্রতিবছর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বা প্রশাসনিক অভিযান কিছু সময়ের জন্য আলোচনায় এলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাময়িক ও লোকদেখানো উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে আড়ালে গিয়ে পরে আবারও একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান আর হয় না। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তৎপরতার ঘাটতি এখানে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
প্রকৃতপক্ষে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; প্রয়োজন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। যারা মানুষের জীবনের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, উচ্চ অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়াতে হবে। কোন জেলায় কখন কোন ফল প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহের উপযোগী হবে, সেই মৌসুমি ক্যালেন্ডার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। মৌসুমের আগেই বাজারে ফল এলে তার উৎস ও গুণগত মান যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তবে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রঙ, অতিরিক্ত চকচকে ত্বক কিংবা মৌসুমের অনেক আগেই বাজারে আসা ফল সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ভোক্তার চাহিদাই অনেক সময় এই অবৈধ ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। মানুষ যদি সচেতনভাবে প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফল কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম ফল বাজারজাত করার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
এখন সময় এসেছে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বিষাক্ত ফলের এই ভয়াবহ বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি বিভাগ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে নিরাপদ ফল উৎপাদনে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ প্রদান, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। ফলের মৌসুম, যা হওয়া উচিত ছিল সুস্বাস্থ্য ও আনন্দের প্রতীক, সেটিই পরিণত হবে মানুষের জীবনের জন্য এক নীরব মৃত্যুফাঁদে। জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এই বিষাক্ত ষড়যন্ত্র বন্ধে এখনই কঠোর, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।