
অনিয়ম রোধে মিড ডে মিল কর্মসূচিতে মায়েদের যুক্ত করে ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত
নাগরিকভাবনা ডেস্ক:
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ফিডিংয়ে (মিড-ডে মিল) পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি ও নষ্ট-দুর্গন্ধযুক্ত সেদ্ধ ডিম বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। এসব নিম্নমানের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অতি লোভের খেসারত দিতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। এ রকম অবস্থায় শিক্ষার্থীদের খাদ্যনিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ কমিটিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য এবং তিন জন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
সোমবার রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি সভা করে করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সেখানেই তিনি এই সিদ্ধান্তসহ কিছু নির্দেশনা দেন। জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি নরসিংদী শহরের বাসাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে মিড-ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার দেওয়ার বিষয়টি নিজের চোখে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ বানরুটিতে গন্ধ সন্দেহজনক হওয়ায় দুটি স্যাম্পল ঢাকার ল্যাবে টেস্টের জন্য নিয়ে যায়। পরীক্ষায় খাবারে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে বলে জানা গেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পের ফিডিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়ম পাওয়া গেলে বিভাগীয় মামলাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে সরকার। শনিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনাটি জারি করা হয়। এদিকে গতকালের সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘মিড-ডে মিল’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি বা মানহীনতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্ব। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সভায় এ নিয়ে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ‘মিড-ডে মিল’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনুমোদিত নমুনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্যাকেজিং কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে না। সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহকারী চালক এবং জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হতে হবে এবং সরবরাহের সময় বাধ্যতামূলকভাবে পরিচয় যাচাই করা হবে।
খাদ্যের মান যাচাইয়ের নির্দেশনা: মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, খাদ্যগ্রহণ ও বিতরণের পূর্বে সরবরাহকারী কর্তৃক সরবরাহ করা খাদ্যের মান ও পরিমাণ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে; নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে (কল অব কার্যাদেশ অনুযায়ী) খাদ্য গ্রহণ ও বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে; খাদ্যদ্রব্যের ধরন অনুযায়ী বিদ্যালয় পর্যায়ে উপযুক্ত সংরক্ষণ ও বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্যের গুণমান বজায় থাকে; বিশেষ করে বানরুটি তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত কি না পরীক্ষা করতে হবে; প্যাকেজিং অক্ষত, ছিঁড়ে যাওয়া বা আর্দ্রতা মুক্ত এবং পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধমুক্ত হতে হবে। প্যাকেটের গায়ে উত্পাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজন (১২০ গ্রাম) উল্লেখ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে; ডিম ফাটা, দুর্গন্ধযুক্ত ও পিচ্ছিলতা বা দৃশ্যমান দূষণ আছে কি না দেখতে হবে; কলা দাগ বা পোকামুক্ত হতে হবে, বেশি পাকা বা পচা কলা গ্রহণ বা বিতরণ করা যাবে না। এছাড়া ইউএইচটি মিল্ক ও ফটিফাইড বিস্কুটের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং অক্ষত, প্যাকেটের গায়ে উত্পাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজন উল্লেখ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে; সরবরাহ করা খাদ্য সামগ্রী যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে এবং কোনোক্রমেই নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ খাবার সরবরাহকারীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা যাবে না। এ বিষয়ে কোনো ধরনের গাফেলতি, শৈথিল্য ও অনিয়ম পাওয়া গেলে বিভাগীয় মামলা ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিম্নমানের ত্রুটিপূর্ণ খাবার সরবরাহ করলে তা গ্রহণ না করে তাত্ক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
খাবার বুঝে নেওয়ার সময় নাক দিয়ে স্মেল নিতে হবে: জানা গেছে, এ সমস্যা উত্তরণে প্রাথমিকের মিড-ডে মিলে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার মধ্যে মিড-ডে মিলে ড্রাই ফ্রুটস যুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন বেশি পুষ্টি পায় সেজন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট কমিটি মিড-ডে মিলের খাবার বুঝে নেবে। বিশেষ করে হেডমাস্টার (প্রধান শিক্ষক) খাবার বুঝে নেবে। খাবার নেওয়ার সময় নাক দিয়ে স্মেল (গন্ধ) নিলেই খাবার ভালো না খারাপ সেটি বোঝা যাবে।’
বর্তমানে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত খাবার পাচ্ছে: জানা গেছে, শিশুদের অপুষ্টি ও ক্ষুধা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতিতে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করে সরকার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত খাবার পাচ্ছে। বর্তমানে সপ্তাহে ছয় দিন (শনি থেকে বৃহস্পতিবার) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হচ্ছে। খাবারগুলো রুটিন অনুযায়ী বিতরণ করা হচ্ছে। রুটিন অনুযায়ী শনি, রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার বানরুটি ও সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়। সোমবার বানরুটি ও ইউএইচটি দুধ এবং মঙ্গলবার দেওয়া হয় ফর্টিফায়েড বিস্কিট ও কলা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি ডিম ১৪ টাকা, কলা ১০ টাকা, বানরুটি ২৫ টাকা, দুধ ২৯ টাকা এবং বিস্কিট প্রতি প্যাকেট ১৯ টাকা করে ধরা হয়েছে। সেই হিসেবে এক জন শিক্ষার্থীর পেছনে প্রতিদিন ২৯ থেকে ৫৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শংকরবাটি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের খাবার খেয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঐ দিন শিক্ষার্থীদের খাবারের আইটেম ছিল পাউরুটি, দুধ, কলা ও ডিম। খাবার গ্রহণের কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। মাদারীপুর সদর উপজেলার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের খাবার খেয়ে কয়েক জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। বরগুনার আমতলীতে পচা কলা, ডিম ও রুটি সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।
সমস্যার মূলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত এজেন্টের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ: স্থানীয় পর্যায়ে খাবার সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত এজেন্টরা নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দাম দিয়ে নিম্নমানের রুটি কেনা, আগেভাগে ডিম সেদ্ধ করে রাখার কারণে খাবার নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের হাতে কাঁচা বা পচা কলাও দেওয়া হচ্ছে। দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ জন এবং শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫ জন। জানা গেছে, তিন বছরের জন্য মিড-ডে মিল কর্মসূচির প্রাক্বলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর থেকে আরো ৩৪৮ উপজেলায় এই কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত