
’’ প্রখর রোদে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাছের ছায়ায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রিকশাচালক আতাউর রহমান। এমন সময় চোখে পড়ে তাঁর বিশ্রাম নেওয়ার জায়গার কাছেই এসে থেমেছে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) সাশ্রয় মূল্যে পণ্য বিক্রির একটি ট্রাক। দ্রুত ট্রাকটির কাছে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে সারিতে দাঁড়ান তিনি। কিছুক্ষণ পর ট্রাকের এক বিক্রয় প্রতিনিধি অপেক্ষমাণ লোকজনের হাতে টোকেন বিতরণ করেন। আতাউরের টোকেন নম্বর ২৭। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে আওরঙ্গজেব সড়কে টিসিবির পণ্য বিক্রির সারিতে দাঁড়ান রিকশাচালক আতাউর। পণ্য কেনার সুযোগ পান দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। মাঝে সারিতে তাঁর সামনে ও পেছনে থাকা দুজনকে বলে টিসিবির পণ্য কেনা এক যাত্রীকে কাছের তাজমহল রোডে দ্রুত নামিয়ে দিয়ে আসেন তিনি।
পণ্য কিনতে পেরে স্বস্তির কথা জানিয়ে আতাউর বলেন, ‘রিকশায় যাত্রী কথায় কথায় নিজের সংসারের গল্পও শোনালেন আতাউর। বলেন, ‘এহানে (ঢাকায়) বউ-জামাই মিইলা দুই বুড়াবুড়ি থাহি। মাইয়া দুইডা বিয়া দিছি। ছোটডা এইবার মাস্টার্স
আতাউর জানান, স্ত্রী বিউটি বেগম একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। সেই বাসার মালিকই নিজের ভবনের ছাদে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আতাউর বলেন, ‘আমগো বউ-জামাইরে মালিক আটতলার ছাদে থাকতে দিছে। আবার বউরে কাজের জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেয়। আমিও ওই বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি ঝাড়ু দিই, আমারে আরও দুই হাজার টাকা দেয়। বাসাভাড়া লাগে না, শুধু বিদ্যুৎ বিল দিই।’
আতাউর রহমান থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায়। প্যাডেলচালিত রিকশা চালিয়েই চলে তাঁর সংসার। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে শ্যামলী এবার স্নাতকোত্তরের শেষ পরীক্ষা দিয়েছেন। মেয়েটি গ্রামের বাড়িতে বড় ভাইয়ের কাছে থাকেন।
আতাউর জানান, সকাল ৮টায় রিকশা নিয়ে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত টানা রিকশা চালিয়ে ৩৩০ টাকা রোজগার হয়েছে। অনেক গরম, তাই আজকে আর রিকশা চালাবেন না। তিনি বলেন, ‘যা আয় করছি সেখান থেকে রিকশামালিককে ১২০ টাকা জমা দিতে হবে।’
রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের ওই সড়কে গিয়ে টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী ও পুরুষের দুটি পৃথক সারি দেখা যায়। দুটি সারিই লম্বা ছিল। ওই সময় নারীদের সারিতে ৬৩ জন ও পুরুষদের সারিতে ৪২ জনকে পণ্য কেনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
নারীদের সারির সামনের দিকে থেমে থেমে বিশৃঙ্খলা হচ্ছিল। শৃঙ্খলা নিশ্চিতে টিসিবির পরিবেশকের পক্ষ থেকে টোকেন দেওয়ার পরেও কে কার আগে কিনবেন—এ নিয়ে ঠেলা-ধাক্কা হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে বয়স্ক ও অসুস্থ নারী এবং শিশুসন্তান কোলে নিয়ে আসা মায়েদের সারিতে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা ছিল না। এমন অনেকেই সারির সামনের দিকে এসে পণ্য কেনার জন্য বিক্রয়কর্মীদের অনুরোধ করছিলেন। তবে পুরুষদের সারিতে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।
বিশৃঙ্খলার মধ্যে নারীদের সারিতে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা ছিল না সত্তরোর্ধ্ব নারী তাহিদা বেগমের। বয়স্ক এই নারী হাঁটেন একটি লাঠিতে ভর করে কিছুটা খুঁড়িয়ে। বিক্রয়কর্মীরা এই নারীর কাছে সারিতে দাঁড়ানো এবং টোকেন ছাড়াই পণ্য বিক্রি করেন। তবে টিসিবির ট্রাক থেকে কেনা পণ্য (ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল) নিয়ে সড়ক থেকে ফুটপাতে উঠতে পারছিলেন না তিনি। সাহায্য নিলেন পাশে থাকা অন্য একজনের।
মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ভাসানী মোড় এলাকায় মেয়ের সঙ্গে থাকেন জানিয়ে তাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি কিছু করি না, আমি বাসাবাড়িতেও কাজ করতে পারি না। ছেলে নাই; স্বামী নাই আমার। মাইনষের কাছে চাইয়া-লইয়া খাই। আমার কিডনির সমস্যা আছে।’
কথা বলে জানা গেল, সকালে মোহাম্মদপুরের একটি হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করাতে মিরপুর থেকে মেয়ের সঙ্গে এসেছিলেন এই নারী। ফেরার সময় টিসিবির ট্রাক দেখতে পেয়ে মেয়ে তাঁকে সারিতে দাঁড় করিয়ে বাসায় চলে যান। ঘরে ছোট তিন সন্তানকে রেখে আসায়, মেয়ে আর দেরি করেননি বলে জানান এই নারী।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির লক্ষ্যে ১১ মে দেশব্যাপী টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলবে ১০ দিন। ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। আজ ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানে সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি।
টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ব্যক্তি এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল ও দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে পারেন। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ১৪০ টাকা ও দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তিনটি পণ্যের এই প্যাকেজ কিনতে ৪৮০ টাকা লাগে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন ৩৯০ টাকা। এ ছাড়া মোটা দানার মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯০-১১৫ টাকা আর প্রতি কেজি চিনি ১০৫-১১০ টাকায় বিক্রি হয়।
চিনি ও মসুর ডালের সর্বনিম্ন দাম ধরলেও ওই তিন পণ্য খোলাবাজার থেকে কিনতে ৬৭৫ টাকা লাগে। সীমিত আয়ের মানুষ টিসিবির ট্রাক সেল থেকে এ তিনটি পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে ১৯৫ টাকা কমে কিনতে পারছেন।
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত