
মো. শামীম মিয়া:
একটি সভ্য সমাজকে যাচাই করার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো—সেই সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে| কারণ শিশুরা শুধু পরিবারের সদস্য নয়; তারা একটি জাতির ভবিষ্যৎ, আগামী দিনের ¯^প্ন ও মানবিকতার প্রতীক| কিন্তু যখন সেই শিশুরাই নৃশংসতার শিকার হয়, যখন তাদের ছোট্ট দেহ খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় উদ্ধার হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজের ভেতরে ভয়াবহ এক অন্ধকার জন্ম নিয়েছে| রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে| এই ঘটনা আমাদের সামনে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা উন্মোচন করেছে—আমরা ক্রমেই এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মানুষের ভেতরের পশুত্ব সভ্যতার মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে| রামিসা সকালে স্কুলের পোশাক পরে বের হয়েছিল| একটি শিশুর দিনের সবচেয়ে বড় চিন্তা থাকে স্কুল, খেলাধুলা আর ছোট ছোট ¯^প্ন নিয়ে| কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হলো প্রতিবেশীর ঘরের খাটের নিচে এবং শৌচাগার থেকে| এই দৃশ্য কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি| সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই অপরাধ ঘটেছে সেই মানুষের হাতে, যাদের পরিবার বিশ্বাস করত| বাঙালি সমাজে “প্রতিবেশী” শব্দটি একসময় আত্মীয়তারই আরেক নাম ছিল| গ্রামের মানুষ শহরে এলেও পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকে আপন মনে করত| বিপদে-আপদে প্রতিবেশীই আগে ছুটে আসত| কিন্তু আজ সেই আস্থার জায়গা ভয় ও সন্দেহে পূর্ণ হয়ে গেছে| আমরা এখন এমন এক নগরসভ্যতায় বাস করছি, যেখানে পাশের দরজার মানুষটি রক্ষক নাকি ভক্ষক—তা বোঝার উপায় নেই|
এই বিশ্বাসের সংকট শুধু সামাজিক দূরত্বের ফল নয়; এটি ˆনতিক পতনেরও প্রতিফলন| যখন সমাজে মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন পরিবার সন্তানকে শুধু প্রতিযোগিতা শেখায় কিন্তু মূল্যবোধ শেখায় না, তখন মানুষের ভেতরে বিবেকের মৃত্যু ঘটে| প্রযুক্তির যুগে তথ্যের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু ˆনতিকতার বিস্তার ঘটেনি| বরং অনিয়ন্ত্রিত পর্নোগ্রাফি, সহিংস বিনোদন এবং বিকৃত সামাজিক সংস্কৃতি অনেকের মনোজগতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে| শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক মহামারিতে রূপ নিচ্ছে| অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের অপরাধ হঠাৎ করে জন্ম নেয় না| দীর্ঘদিনের বিকৃত মানসিকতা, ˆনতিক অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণ পরিবেশ মিলেই এমন নৃশংসতার জন্ম দেয়| একজন মানুষ কতটা অমানবিক হলে একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করতে পারে, তারপর ঠান্ডা মাথায় তার দেহ টুকরো করতে পারে! আরও আতঙ্কের বিষয় হলো, অপরাধীর স্ত্রীও লাশ গুমের চেষ্টায় সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে| অর্থাৎ, অপরাধ এখন কেবল ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়; অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক প্রশ্রয়ও পাচ্ছে| তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর দিক হলো—রামিসার বাবার আর্তনাদ| তিনি বলেছেন, “আমার মেয়ের হত্যার বিচার হবে না|” একজন সন্তানহারা পিতার এই কথার মধ্যে শুধু শোক নেই; আছে রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি ভয়াবহ অনাস্থা| এই অনাস্থা হঠাৎ জন্ম নেয়নি| বছরের পর বছর ধরে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে, সেটিই সাধারণ মানুষকে এমন হতাশ করে তুলেছে| বাংলাদেশে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড বছরের পর বছর ঝুলে আছে| ত্বকী হত্যা, তনু হত্যা, সাগর-রুনি হত্যাসহ অসংখ্য মামলার বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি| প্রতিবারই আমরা দেখি—ঘটনার পর তীব্র গণমাধ্যম চাপ ˆতরি হয়, প্রশাসন সক্রিয় হয়, মিছিল হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত হয়| কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়| মামলার ফাইল ধুলো জমে পড়ে থাকে, সাক্ষীরা দুর্বল হয়ে পড়ে, আর বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়| এই বাস্তবতা অপরাধীদের মনে ভয় নয়, বরং সাহস ˆতরি করে|
যখন একজন অপরাধী জানে যে আইনের ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক প্রভাব বা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তখন তার ভেতরের ভয় কমে যায়| বিচারহীনতা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়; এটি ভবিষ্যতের আরও অপরাধের জন্ম দেয়| পল্লবীর সোহেল রানারা তখনই জন্ম নেয়, যখন পূর্ববর্তী অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না|
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল মেট্রোরেল, উড়ালসেতু বা বড় বড় স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়| একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন একজন মা নিশ্চিন্তে তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারেন| কিন্তু আজ অভিভাবকেরা আতঙ্কে থাকেন—সন্তান নিরাপদে বাসায় ফিরবে তো? এই ভয় কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না| এই দায় শুধু প্রশাসনের নয়; সমাজেরও| পরিবারে সন্তানদের ˆনতিক শিক্ষা কতটা দেওয়া হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিকতা শেখানো হচ্ছে, নাকি শুধু পরীক্ষার ন¤^র শেখানো হচ্ছে? সমাজ কি অপরাধকে ঘৃণা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সহ্য করতে শিখে গেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অনেক সময় ভয়াবহ ঘটনাগুলোকে কয়েক দিনের “ট্রেন্ড” বানিয়ে ফেলি, তারপর ভুলে যাই| কিন্তু একটি পরিবার সেই শোক কখনো ভুলতে পারে না| শিশু সুরক্ষায় আমাদের আইনি কাঠামো আরও কঠোর ও কার্যকর করা জরুরি| শুধু আইন থাকলেই হবে না; দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে| শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালনা করা প্রয়োজন| সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে| একইসাথে সমাজে ˆনতিক পুনর্জাগরণও জরুরি| পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে| সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আবার মানবিক হতে হবে| কারণ আইন ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু মানবিকতা মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখে| একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন মানুষ কেবল আইনের ভয়ে নয়, বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়| রামিসা আজ আর ফিরবে না| তার ছোট্ট স্কুলব্যাগ, বই আর অসমাপ্ত ¯^প্নগুলো হয়তো এখনো ঘরের এক কোণে পড়ে আছে| কিন্তু এই শিশুর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়| যদি এই ঘটনারও বিচার বিল¤ি^ত হয়, যদি অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পায়, তবে রামিসার বাবার সেই হতাশ বাক্য—“বিচার হবে না”—আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক চরম লজ্জার প্রতীক হয়ে থাকবে| আজ প্রয়োজন শুধু শোক প্রকাশ নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক জাগরণ| কারণ আমরা আর কোনো রামিসার খণ্ডিত লাশ দেখতে চাই না| আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিশুর হাসি নিরাপদ থাকবে, যেখানে প্রতিবেশী মানে আবারও আস্থা হবে, আর যেখানে একজন বাবা বুক চাপড়ে বলতে বাধ্য হবেন না—“আমার সন্তানের বিচার হবে না|”
মোঃ শামীম মিয়া, শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা|
shamimmiabd94@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত