প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৩, ২০২৬, ১১:৫৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ১, ২০২৬, ৪:০৫ পি.এম
আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে বুয়েট: উপমহাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা থেকে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের পথে
বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রগঠন, শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অন্যতম।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ব্যাপী পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রকৌশলী তৈরির কারখানা হিসেবেই নয়, বরং একটি জাতির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং উন্নয়ন-দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বর্তমানের বুয়েট যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তন, উপনিবেশিক যুগের শিক্ষানীতি, দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা, পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার এক অনন্য ইতিহাস।
বুয়েটের শিকড় অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় উনিশ শতকের শেষভাগের ঢাকা শহরে। সে সময় ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলে প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ঔপনিবেশিক প্রশাসন প্রধানত তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে সীমিত পরিসরে প্রযুক্তিগত জনবল তৈরি করতে আগ্রহী ছিল। বাংলার নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেলপথ, সড়ক, সেতু এবং সরকারি স্থাপনার সম্প্রসারণের ফলে দক্ষ সার্ভেয়ার, ড্রাফটসম্যান এবং কারিগরি কর্মীর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে ১৮৭৬ সালে ঢাকার নিকটে একটি সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য সুপরিচিত নবাব পরিবার এবং বিশেষত নবাব স্যার খাজা আহসানউল্লাহর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নতুন রূপায়ণ করা হয়। ১৯০৮ সালে এটি ‘আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এই নামকরণ ছিল শুধু একজন দানবীরের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়; বরং বাংলার মুসলিম সমাজে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারের এক প্রতীকী পদক্ষেপ। সে সময় উপমহাদেশে আধুনিক প্রকৌশল শিক্ষা সীমিত পরিসরে বিস্তৃত হচ্ছিল। কলকাতা, রূড়কি ও শিবপুরের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল পূর্ববঙ্গের প্রযুক্তিগত শিক্ষার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাক্রম ছিল মূলত ব্যবহারিক ও কারিগরি প্রকৃতির। সার্ভেয়িং, নির্মাণকৌশল, ড্রয়িং এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন ও আধুনিক প্রকৌশল জ্ঞানের বিস্তারের কারণে পাঠক্রমেরও পরিবর্তন ঘটে। প্রকৌশল শিক্ষা ধীরে ধীরে কেবল কারিগরি দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার রূপ লাভ করে। এই পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি বৃহত্তর একাডেমিক রূপান্তরের দিকে অগ্রসর হয়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত বিভাগের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশে পরিণত হলে উচ্চশিক্ষা কাঠামোতেও নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক, শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দক্ষ প্রকৌশলীর চাহিদা বাড়তে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলকে উন্নীত করে ‘আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি তখনকার নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সময়কাল ছিল প্রতিষ্ঠানটির এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর পর্ব। এ সময়ে সিভিল, মেকানিক্যাল এবং ইলেকট্রিক্যাল প্রকৌশল শিক্ষার ভিত্তি আরও সুসংহত হয়। শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতা বৃদ্ধি, গবেষণার প্রাথমিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মানের পাঠক্রম প্রবর্তনের মাধ্যমে কলেজটি দ্রুত উপমহাদেশের অন্যতম সম্ভ্রান্ত প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে শুরু করে। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনা, নদীশাসন প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নগরায়ণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী অধ্যায় সূচিত হয়। সে বছর এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে এবং নামকরণ করা হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী কলেজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদা লাভের ফলে নতুন বিভাগ, গবেষণাগার এবং উচ্চতর ডিগ্রি কার্যক্রম চালুর সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত গবেষণার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে থাকে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন একটি রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা, তেমনি বুয়েটের ইতিহাসেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, অনেকে শহীদ হন, আবার কেউ কেউ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’ বা বুয়েট। এই নামের মধ্যেই প্রতিফলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত আত্মপরিচয় এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বুয়েটের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সড়ক, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানা পুনর্নির্মাণে বুয়েটের প্রকৌশলীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী দশকগুলোতে দেশের প্রায় প্রতিটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বুয়েটের শিক্ষক, গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়। নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, নগর পরিকল্পনা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্পায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বুয়েট একটি জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করেছে।
বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত গবেষণার বিকাশেও বুয়েটের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। পরিবেশ প্রকৌশল, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমিকম্প প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নগর পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণায় বুয়েট আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি অর্জন করেছে। দেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের শিল্পখাতের বিকাশেও বুয়েটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, নির্মাণ শিল্প এবং উৎপাদন খাতের উন্নয়নে তাদের অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বুয়েটের গ্র্যাজুয়েটরা নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
বুয়েটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর একাডেমিক সংস্কৃতি। কঠোর ভর্তি প্রতিযোগিতা, উচ্চমানের শিক্ষাক্রম, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং মেধাকেন্দ্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে বুয়েট কেবল প্রকৌশলী তৈরি করে না; এটি প্রযুক্তিগত নেতৃত্বও গড়ে তোলে।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে, তখন বুয়েটও তার শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং টেকসই উন্নয়নভিত্তিক গবেষণায় ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারিত্ব এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে বুয়েটে রূপান্তরের এই দীর্ঘ ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানের বিবর্তনের কোন গল্প নয়; বরং এটি বাংলার সমাজে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিকাশের ইতিহাস। এটি উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে উত্তরণের ইতিহাস। এটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার ইতিহাস। সর্বোপরি, এটি এমন এক জাতির অগ্রযাত্রার ইতিহাস, যে জাতি জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বুয়েট বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতীক। এর শতবর্ষব্যাপী উত্তরাধিকার প্রমাণ করে যে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষাদানের মাধ্যমে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের দিকনির্দেশনা প্রদান করেও ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে। আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ছোট্ট পরিসর থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের পথচলায়ও বুয়েট নিঃসন্দেহে তার অগ্রণী ভূমিকা অব্যাহত রাখবে আশা রাখি।