প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ১০:৫৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৩, ২০২৬, ২:৫৬ পি.এম

১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত ভারত বিভাগ পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় নির্দেশ করে। এটি ছিল কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং উপমহাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ঔপনিবেশিক কৌশল, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিল প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ। ইতিহাসে এটি ‘থ্রি জুন প্ল্যান’ বা ‘মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান’ নামে অধিক পরিচিত।
এই পরিকল্পনার মাধ্যমেই ব্রিটিশ ভারতকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। একই সাথে এটি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়, যার প্রভাব আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় পরিচয় এবং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর গভীরভাবে বিদ্যমান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ভারত শাসন অব্যাহত রাখা ব্রিটেনের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছিল। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ, শ্রমিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপ ব্রিটিশ সরকারকে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করে। একই সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল।
ভারত বিভাগের পটভূমি বুঝতে হলে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির বিকাশের দিকে নজর দিতে হয়। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা উত্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই দাবিকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করেন। অপরদিকে কংগ্রেস নেতৃত্ব, বিশেষত জওহরলাল নেহরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেল, একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মুসলিম আসনগুলোতে ব্যাপক বিজয় অর্জন করলে পাকিস্তান দাবির রাজনৈতিক বৈধতা আরও শক্তিশালী হয়।
ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারতকে একটি শিথিল ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছিল। প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ই এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে এর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ফলে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়। একই সময়ে কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় এবং সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতি ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় যে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে একটি রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।
১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এর কিছুদিন পর লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মার্চ মাসে ভারতে এসে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। মাউন্টব্যাটেন উপলব্ধি করেন যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ফলে তিনি এমন একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেন, যা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যে পরিকল্পনা ঘোষণা করে, তার মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতকে দুটি ডোমিনিয়নে বিভক্ত করা হবে—ভারত ও পাকিস্তান। পাঞ্জাব এবং বাংলা প্রদেশের আইনসভাগুলোকে পৃথকভাবে ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয় যে তারা বিভক্ত হবে কি না। যদি বিভাজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আলাদা প্রশাসনিক এককে পরিণত হবে। একইভাবে আসামের সিলেট জেলায় গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয় যে অঞ্চলটি আসামের সঙ্গে থাকবে নাকি পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হবে।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও গণভোটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেখানে জনগণকে ভারত অথবা পাকিস্তানের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ব্রিটিশ ভারতের দেশীয় রাজ্যসমূহের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এসব রাজ্যকে জানানো হয় যে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটবে এবং তারা ভারত অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যদিও বাস্তবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ সীমিত ছিল।
এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সীমান্ত নির্ধারণের জন্য পৃথক কমিশন গঠন। ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে পাঞ্জাব ও বাংলার জন্য দুটি বাউন্ডারি কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের কাজ ছিল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সীমান্ত নির্ধারণ করা। কিন্তু বাস্তবে জনসংখ্যা, অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক বিবেচনাসহ নানা বিষয় সীমান্ত নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছিল। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া পরবর্তীকালে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
৩ জুন পরিকল্পনা ছিল মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে ব্রিটিশ সরকারের আত্মসমর্পণ। ব্রিটিশ প্রশাসন উপলব্ধি করেছিল যে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত রক্ষা করা আর সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তারা দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিল। তবে সমালোচকদের মতে, পরিকল্পনাটি অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল এবং সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
পরিকল্পনা ঘোষণার পর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ই এটি গ্রহণ করে। কংগ্রেস নেতৃত্ব অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিভাজন মেনে নেয়, কারণ তাদের মতে এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এড়ানোর একমাত্র কার্যকর পথ। অন্যদিকে মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের কারণে পরিকল্পনাটিকে স্বাগত জানায়। জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
৩ জুন পরিকল্পনার সরাসরি ফলাফল ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন প্রণয়ন। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট জুলাই মাসে এই আইন পাস করে এবং ১৫ আগস্ট ভারতের ও ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা কার্যকর হয়। কিন্তু স্বাধীনতার এই অর্জনের সঙ্গে যুক্ত ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণঅভিবাসন ও মানবিক বিপর্যয়। সীমান্তের দুই পাশে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ স্থানান্তরে বাধ্য হয় এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় কয়েক লাখ থেকে প্রায় এক মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রগঠনের দৃষ্টিকোণ থেকে ৩ জুন পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ায় দুটি পৃথক জাতীয় প্রকল্পের সূচনা করে। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য পরবর্তীকালে নতুন সংকটের জন্ম দেয়, যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৩ জুন পরিকল্পনা এক দ্বৈত উত্তরাধিকার বহন করে। একদিকে এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ব্যাপক সহিংসতা, উদ্বাস্তু সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক বিরোধের জন্ম দেয়। বিশেষত কাশ্মীর প্রশ্ন, সীমান্ত বিরোধ এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তরাধিকার আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে।
সর্বোপরি, ১৯৪৭ সালের ৩ জুন পরিকল্পনা ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক রূপরেখা নয়; এটি ছিল উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরের এক জটিল রাজনৈতিক দলিল। এর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেমন ত্বরান্বিত হয়েছিল, তেমনি নতুন রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক ভিত্তি, সীমান্ত ও জাতীয় পরিচয়ের কাঠামোও নির্ধারিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে তাই ৩ জুন পরিকল্পনা এক অনিবার্য অধ্যায়, যা স্বাধীনতার আনন্দ ও বিভাজনের বেদনা উভয়কেই সমানভাবে ধারণ করে আছে।
ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।