প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৮, ২০২৬, ৮:৪৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৭, ২০২৬, ১১:১১ এ.এম

রাজু আহমেদ, রাজবাড়ী: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে আবারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস পদ্মায় পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনায় এখনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের একটি বাস দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাট পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। এখন পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাস থেকে যাত্রী নামানো অবস্থায় ছিল বলে মনে হচ্ছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র্যা ম্প ভেঙে একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে গেছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনায় আগে থেকেই বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়ায় বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। নদী থেকে বাসের চালক ও সহকারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, বাসটি ৭ নম্বর ঘাটে থাকা ‘কবরী’ নামের ফেরির কনভেনশন পকেট দিয়ে প্রবেশ করছিল। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের ধাক্কায় ফেরির বিপরীত পাশের র্যাকম্প ভেঙে যায় এবং বাসটি সরাসরি নদীতে পড়ে ডুবে যায়।
স্থানীয় প্রশাসন আগেই নির্দেশ দিয়েছিল, ফেরিতে ওঠার আগে বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দিতে হবে। সেই নির্দেশনা মেনে যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেয়ায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে বাসটির চালক ও সহকারী (হেলপার) নদীতে পড়ে যান। পরে তাদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ডুবুরিরা। পুরো উদ্ধার কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করছেন বিআইডব্লিউটিএ-এর মেম্বার (ইঞ্জিনিয়ারিং), যিনি বর্তমানে দৌলতদিয়ায় অবস্থান করছেন।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’বেলা ১২ টার দিকে ডুবে যাওয়া বাসটিকে উদ্ধার করে। বাসের ভিতরে থাকা যাত্রী মালামাল গুলো গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস নিজে দাড়িয়ে থেকে যাত্রীদের বুঝিয়ে দেন।
এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক বারেক শেখ বলেন, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনে ৩৭ জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া বাসের তত্ত্বাবধায়ক, সহকারী, চালকসহ মোট ৪০ জনের মতো ছিলেন। বাসটি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরিতে ওঠার চেষ্টাকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আরেকটি ফেরির র্যােমে আঘাত করে। এ সময় র্যালম ভেঙে বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটির যাত্রীরা ঘাটে নেমে গিয়েছিলেন। শুধু চালক ও তার সহকারী বাসে ছিলেন। পরে তাদের উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
বাস চালক মো: ঝন্টু আলী বলেন, আমি বাস নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে সকাল সাত টার সময় রওনা দিয়ে দৌলতদিয়া আসি সাড়ে নয় টার সময়। ঘাটে আসার পর গোয়ালন্দ নৌপুলিশ ও প্রসাশনের লোক জন ফেরী তে ওঠার আগে গাড়ী থেকে সব যাত্রী নামিয়ে দিতে বলে ,সব যাত্রী নামিয়ে দেয়ার পর আমি যখন বাস নিয়ে ফেরীতে উঠি তখন আমার গারীর ব্রেক কাজ করছিল না তখন আমি আমার হেলপার শাকিব হোসেন কে বলি গাড়ী ব্রেক ফেল হইছেছ তুই লাফ দে , ও গাড়ী থেকে লাফ দেয় আর আমি গাড়ী নিয়ে ফেরীর রেলিং ভেঙ্গে নদী পড়ে যায়। আমি গাড়ীর জানালা দিয়ে বের হয়ে সাঁতার দিয়ে উঠি। আল্লাহ আমাকে নতুন করে জীবন দিয়েছে।
বাসটির যাত্রী বিজিবির সদর দপ্তরের নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, মাঝেমধ্যে এই পরিবহনে ঢাকা আসা-যাওয়া করি, কিন্তু কখনো বাস থেকে ঘাটে নামিনি। বাসটি ঘাটে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের নামার আহ্বান জানায়। আমি নামতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে নৌ পুলিশ আমাদের জোর করে নামিয়ে দেয়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি ফেরির র্যারম ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন। নয়তো গত ঈদের মতো এতগুলো মানুষের প্রাণ চলে যেত।
বাসের এক নারী যাত্রী বলেন, আমি কুষ্টিয়া থেকে বাসে উঠেছি। গারী ভরা যাত্রী ছিল ঘাঠে এসে ফেরী তে উঠার আগে বাস থেকে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়া হয়।আমি লাষ্ট বাস থেকে নামছি আমার পরে কেউ বাসে ছিল না। বাসে শুধু হেলপার আর ড্রাইভার ছিল। বাসটি নন এসি ছিল। কুষ্টিয়া থেকে বাসটি সকাল সাত টায় ছাড়ে।
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, বাসটি সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘাটে পৌঁছানোর পর আমরা হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের নিচে নেমে যাওয়ার আহ্বান জানাই। পরে পুলিশ এসে আমাদের সহযোগিতা করে। এরপর মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি করবী ফেরির র্যা ম ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, সবাইকে সচেতন হতে হবে। আজকের সচেতনতার কারণেই এতগুলো প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। আমরা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করব । তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এ ঘটনায় হতাহত হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ সফলভাবে বাসটি উদ্ধার করেছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা:শরিফুল ইসলাম বলেন, আহত ড্রাইভার ও হেলপার কে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তাদের বড় কোন ক্ষতি হয়নি। হেলপার গাড়ী থেকে লাফ দেয়ায় একটু ব্যাথা পেয়েছে। ড্রাইভার পানিতে পড়ে একটু পানি খেয়েছিল কিন্তু আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি এখন তাদের বড় কোন সমস্যা নেই তারা বাড়ী যেতে পারবে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ৩ নম্বর পল্টুন থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ‘সৌহার্দ্য পরিবহনে’র একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।