
মোঃ শামীম মিয়া ------
রাষ্ট্র যখন আধুনিকতার মহাসড়কে পা বাড়ায়, তখন তার নাগরিকেরা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ¯^স্তিতে ভোগেন| আমরা ধরে নিই, প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের জীবনকে আরও শৃঙ্খলিত, ¯^চ্ছ এবং নিরাপদ করবে| অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’ (AI Camera) সংযোজনের খবরটি যখন চাউর হলো, সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল তাকে ¯^াগত জানিয়েছিল| সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, মানবীয় দুর্নীতির অবসান এবং ঘুস-বাণিজ্যের অবসান ঘটানোর জন্য এটি ছিল একটি ˆবপ্লবিক পদক্ষেপ| কিন্তু এই ¯^স্তির আয়ুষ্কাল যে এতটা সংক্ষিপ্ত হবে, তা হয়তো রাষ্ট্র বা নাগরিক—কেউই ভাবেনি| বিজ্ঞানের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী, প্রযুক্তির যেমন আলো আছে, তেমনি রয়েছে এক অন্ধকার চোরাগলির অপচ্ছায়া| এআই ক্যামেরা চালু হওয়ার সংবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের এক বিশাল অংশের নাগরিকের মুঠোফোনে হানা দিতে শুরু করেছে এক অভিনব আপদ| “এআই ক্যামেরায় আপনার গাড়ির ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, এত টাকা জরিমানা নিম্নোক্ত লিংকে ক্লিক করে পরিশোধ করুন”—এমন বার্তা বা এসএমএস (SMS) দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অত্যন্ত চতুর, সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন সাইবার অপরাধী চক্র| এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল রূপান্তর, ডেটা নিরাপত্তা এবং নাগরিক মনস্তত্ত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত| স্মিশিং: যখন আতঙ্কই অপরাধীদের প্রধান অস্ত্র সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এই অপরাধটিকে বলা হয় ‘স্মিশিং’ (Smishing), যা মূলত এসএমএস (SMS) এবং ফিশিং (Phishing) -এর একটি মারাত্মক মেলবন্ধন| অপরাধীরা এখানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করছে না, তারা মানুষের মনস্তত্ত্বকে খুব নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করছে|আমাদের সমাজে ‘মামলা’ বা ‘আইনি জটিলতা’ শব্দ দুটি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের তীব্র ভীতি ও অ¯^স্তি ˆতরি করে| একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী যখন হঠাৎ মেসেজ পান যে তার অজান্তে তার গাড়ির নামে মামলা হয়েছে এবং দ্রুত টাকা না দিলে লাইসেন্স বাতিল বা বড় ধরণের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা সাময়িকভাবে লোপ পায়| অপরাধীরা ঠিক এই ‘আতঙ্কের মুহূর্তটি’ (Window of Panic) ব্যবহার করে| তারা মেসেজের নিচে যে শর্ট লিংক বা ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়ের লিংক যুক্ত করে দেয়, আতঙ্কিত নাগরিক নিজের অজান্তেই সেখানে ক্লিক করেন| সেখানে গিয়ে বিকাশ, রকেট, নগদ বা কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে যখনই তিনি টাকা স্থানান্তর করেন, তখনই তিনি পাতানো ফাঁদে পা দেন| অনেক ক্ষেত্রে শুধু জরিমানার টাকা কেটেই ক্ষান্ত হয় না এই চক্রটি; ওটিপি (OTP) বা পিন (PIN) হাতিয়ে নিয়ে পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়ার নজিরও মিলছে| অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিখুঁত ‘ডিজিটাল ডাকাতি’|
ডেটাবেজের শুভঙ্করের ফাঁক: তথ্য পাচার হচ্ছে কোথায়? এই পুরো অপরাধ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার এবং রহস্যময় দিকটি হলো—তথ্যপ্রাপ্তি| একটি অপরাধী চক্র কীভাবে জানল যে নির্দিষ্ট একটি মোবাইল ন¤^রের বিপরীতে অমুক ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিবন্ধিত রয়েছে? এখানে দুটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণ সামনে আসে, যা রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই| রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের নিরাপত্তাহীনতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নাগরিকদের যে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্যের (মোবাইল ন¤^র, জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির চেসিস ন¤^র) ডেটাবেজ রয়েছে, তা কি আসলেই নিরাপদ? অতীতেও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের ডেটা ফাঁসের খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি| এই ক্ষেত্রেও কি কোনো অসাধু চক্র বা হ্যাকার গোষ্ঠী সেই তথ্য অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি| নির্বিচার আক্রমণ (Brute Force/Random Attack): যদি ডেটা ফাঁস নাও হয়ে থাকে, তবে অপরাধীরা হয়তো লটারির মতো নির্বিচারে হাজার হাজার ন¤^রে এই বার্তা পাঠাচ্ছে| আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ মোটরসাইকেল ও গাড়ি রয়েছে| ফলে প্রতি এক হাজার মেসেজের মধ্যে যদি পঞ্চাশ জন গাড়ির মালিকও এই ফাঁদে পা দেন, তবেই অপরাধীদের উদ্দেশ্য সফল| যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের এই উন্মুক্ততা প্রমাণ করে যে, আমরা ‘স্মার্ট’ হওয়ার স্লোগান দিলেও আমাদের ডিজিটাল দেয়ালগুলো কতটা নড়বড়ে| প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা এবং সামাজিক সচেতনতার খরা ডিজিটাল অপরাধের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতাও কম দায়ী নয়| যখন একটি নতুন প্রযুক্তি (যেমন এআই ক্যামেরা) সড়ক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন তার অনুষঙ্গ হিসেবে নাগরিকদের সচেতন করার যে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন ছিল, তা উধাও| বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ থেকে কেন শুরুতেই জোর গলায় বলা হলো না যে—"সরকারি কোনো মামলার মেসেজ কোনো সাধারণ ১১ ডিজিটের মোবাইল ন¤^র থেকে যাবে না এবং কোনো মেসেজে সরাসরি পেমেন্ট লিংক দেওয়া থাকবে না"? এই স্পষ্ট বার্তার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতারক আর সরকারের পার্থক্য করতে পারছে না| এর পাশাপাশি আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রযুক্তিগত শিক্ষার হার (Digital Literacy) অত্যন্ত শোচনীয়| আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখেছি, ইন্টারনেট ডেটা কিনতে শিখেছি, কিন্তু ‘সাইবার হাইজিন’ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতা শিখিনি| একটি অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে যে ডোমেইন নেম চেক করতে হয় (যেমন ..com-এর জায়গায় .xyz ev .top থাকা মানেই সেটি ভুয়া), এই সাধারণ জ্ঞানটুকু দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই| অপরাধীরা নাগরিকদের এই সরলতা বা অজ্ঞতারই চূড়ান্ত ফায়দা তুলছে| রাষ্ট্রের স্মার্টনেস বনাম অপরাধীদের চাতুর্য আমরা যখন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার ¯^প্ন দেখছি, তখন এই ধরণের সাইবার ক্রাইম পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর জনগণের আস্থা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট| রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকেরা প্রযুক্তির যেকোনো নতুন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবেন| আজ যদি এআই ক্যামেরার নাম করে টাকা ডাকাতি হয়, তবে কাল হয়তো ই-পাসপোর্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা স্মার্ট এনআইডি কার্ডের নাম করেও একই কাজ হবে| অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের চাতুর্য এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটাচ্ছে, অথচ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাইবার ইউনিটগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল| এই চক্রগুলোকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মোবাইল ন¤^র বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করে ধরা সম্ভব নয়, কারণ তারা ভুয়া বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে| এদের ধরতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আন্তর্জাতিক মানের সাইবার ফরেনসিক ল্যাব| উত্তরণের পথ: তিন স্তরের প্রতিরোধ এই সর্বগ্রাসী ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—এই তিন পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে| প্রথমত, কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে অনতিবিল¤ে^ এই চক্রের আইপি অ্যাড্রেস এবং ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়েগুলো চিহ্নিত করে ডোমেইনগুলো ব্লক করতে হবে| এই চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই সাহস না পায়| দ্বিতীয়ত, ডেটা অডিট ও তথ্য অধিকারের সুরক্ষা: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের ডেটাবেজ অবিল¤ে^ একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ¯^াধীন আইটি টিম দ্বারা 'সিকিউরিটি অডিট' করা উচিত| নাগরিকদের তথ্য চুরির সাথে যদি ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকেন, তবে তাকে কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনতে হবে| তৃতীয়ত, গণসচেতনতার মহাবিপ্লব: টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্প ও ট্রাফিক সিগন্যালে বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে| মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, ট্রাফিক মামলার ˆবধ মেসেজ কেবল নির্দিষ্ট 'Masking' (যেমন: DMP বা BRTA) নামেই আসবে এবং মামলার সত্যতা যাচাইয়ের একমাত্র স্থান হলো সরকারের নিজ¯^ অফিশিয়াল পোর্টাল| শেষ কথা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরার ব্যবহার যুগের দাবি এবং একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ| এর সুফল দেশের মানুষ পাক—সেটিই কাম্য| কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে যদি একদল সাইবার অপরাধী সাধারণ মানুষের পকেট কাটার মহোৎসবে মেতে ওঠে এবং রাষ্ট্র যদি তা নির্বিকার চিত্তে চেয়ে চেয়ে দেখে, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক| প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য, শোষণের জন্য নয়| ডিজিটাল অপরাধীদের চেয়ে রাষ্ট্রকে সবসময় দুই কদম এগিয়ে থাকতে হবে| সরকার যদি দ্রুত এই ‘এআই ক্যামেরা’র ভুয়া মামলার প্রতারক চক্রকে দমনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ সাধারণ মানুষের কাছে এক মূর্তিমান অভিশাপ ও আতঙ্কের কারণ হয়েই থাকবে| আমরা একটি নিরাপদ সড়ক যেমন চাই, তেমনি একটি নিরাপদ এবং সাইবার-শত্রুমুক্ত ডিজিটাল পরিবেশও আমাদের নাগরিক অধিকার|
মোঃ শামীম মিয়া শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ জুমারবাড়ী সাঘাটা গাইবান্ধা|
shamimmiabd94@gmail.com
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত