
শেখ রিফান আহমেদ : বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরকারি সেবা পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একটি দেশ যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, ততই তার উন্নয়ন, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলছে। বাংলাদেশও এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, অনলাইন লেনদেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশের মানুষের জীবনকে সহজ করেছে।
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্যের অনিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি যেমন মানুষের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, তেমনি অপরাধীদের হাতেও তৈরি করেছে নতুন ধরনের অপরাধের সুযোগ।
বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধ এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, ব্যাংকিং তথ্য, পাসওয়ার্ড, ছবি বা গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি করে অনেকেই ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষ অসচেতনতার কারণে প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন। ভুয়া লিংকে ক্লিক করা, অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো ফাইল খোলা, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার কারণে সাইবার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ডিজিটাল সমাজে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানলেই হবে না, নিরাপদ ব্যবহারের জ্ঞানও অর্জন করতে হবে। একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু কঠোর আইন বা অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, প্রযুক্তি ব্যবহারে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহারকারীদের বুঝতে হবে, অনলাইনের প্রতিটি কার্যক্রমেরই প্রভাব রয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হালনাগাদ করা এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। তাই তাদের শুধু প্রযুক্তির সুবিধা নয়, এর ঝুঁকি ও নিরাপদ ব্যবহারের নিয়মও শেখাতে হবে। সচেতন নাগরিক তৈরি হলে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ অনেক সহজ হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি শুধু সেই প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিও জরুরি। অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, তাই সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়, এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর ফলাফল। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা গেলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এবং বৈশ্বিক বাজারে অংশগ্রহণ আরও সহজ হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আইন, প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতা এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ নিরাপদ প্রযুক্তিই পারে একটি আধুনিক, দক্ষ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।
-লেখক : সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা
দৈনিক ‘নাগরিক ভাবনা’র অনলাইন পোর্টালটি ঢাকা হতে শেখ রিফান আহমেদ-এর সম্পাদনায় পরিচালিত।
হটলাইন: 09649-230220 ও 01915-708187, ইমেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@নাগরিক ভাবনা কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত