প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৬, ২০২৬, ৩:৪৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ২৫, ২০২৬, ৯:৫৬ এ.এম

সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে মাদক সমস্যা থাকলেও বর্তমানে এর বিস্তার স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের আগ্রাসন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি শুধু একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্র—সবখানেই মাদকের ছায়া ক্রমশ ঘন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনের শিথিল প্রয়োগ, পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয়, সামাজিক মূল্যবোধের অবনতি এবং বেকারত্বের মতো নানা কারণ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
একসময় পরিবার ছিল সন্তানের প্রথম শিক্ষালয়। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে পারিবারিক যোগাযোগ ও মানসিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক তরুণ-তরুণী একাকীত্ব ও হতাশার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ী চক্র তাদের নেশার জগতে টেনে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে। কোনো জাতিকে দুর্বল করে দিতে সবসময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; তরুণ প্রজন্মকে মাদকের জালে আটকে ফেললেই একটি দেশের কর্মশক্তি, সৃজনশীলতা ও নৈতিক ভিত্তি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
মাদকাসক্তির ভয়াবহ প্রভাব দেশের অপরাধ প্রবণতাতেও স্পষ্ট। নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জুয়া, পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী-শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রও মনে করে, সংঘটিত অপরাধের একটি বড় অংশের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদকের ছোবল এখন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। যে বয়সে একজন তরুণের স্বপ্ন দেখার কথা দেশ গড়ার, সেই বয়সেই অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে নেশার অন্ধকার গহ্বরে। ফলে পরিবারগুলো যেমন অসহায় হয়ে পড়ছে, তেমনি রাষ্ট্রও হারাচ্ছে তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—মাদক কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না? তাদের মতে, মাদক ব্যবসার পেছনে সমাজের একটি প্রভাবশালী চক্র, রাজনৈতিক গডফাদার এবং প্রশাসনের অসাধু কিছু সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে। এসব কারণে মাদকবিরোধী অনেক অভিযান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং কার্যক্রম চালু করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।
একই সঙ্গে যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের শুধুমাত্র অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তি হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। পর্যাপ্ত সরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ—এই তিন শক্তির সমন্বয় ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ সফল করা সম্ভব নয়। কঠোর আইন প্রয়োগ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে দেশকে এই ভয়াবহ মাদক মহামারি থেকে রক্ষা করতে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মাদকের এই বিষবৃক্ষ আরও বিস্তৃত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।